অনলাইন শপিং: আমরা কতটুকু প্রস্তুত?


Published: 2020-06-04 09:46:38 BdST, Updated: 2020-07-06 05:46:03 BdST

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল: তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসার ও সীমাহীন উৎকর্ষতায় সারা বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আদান প্রদান, টেলি-যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটন, শিল্প, বিনোদন, ধর্ম-কর্ম, রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে এর সুফল পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষের জানার আগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন জানালা উম্মোচিত হয়েছে। অনলাইন সংযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক, স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপকে সংগী করে সব শ্রেণীর এবং সব বয়সের মানুষ, পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানাবিধ তথ্য উপাত্ত গ্রহণ ও বিতরণের ফলে নিজেরা উপকৃত হচ্ছে।

সমান্তরালভাবে অন্যদেরকে ও সমৃদ্ধ করছে। এর ধারাবাহিকতায় ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ই-কমার্সের অংশ হিসেবে ১৯৭৯ সালে মাইকেল এলড্রিচের হাত ধরে অনলাইন শপিংয়ের গোড়াপত্তন ঘটে। মুলত মোবাইল ডিভাইস বা কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে দ্রব্যাদি কেনাবেচা এবং এর আদেশ গ্রহণ ও প্রদান করার প্রক্রিয়া হলো অনলাইন শপিং। কিন্ত তার প্রতি গ্রাহকের আস্থা, সেবার মান, আধুনিক জীবনে নানামুখী ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা থাকার কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তে এর বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তা বাড়ছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য সংস্থা আন্কডটের তথ্যানুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে ই-কমার্সের বাজার পৃথিবীব্যাপী দুই লাখ কোটি ডলারের ও বেশি।

একক দেশ হিসেবে অনলাইন শপিংয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন এবং আমাদের প্রতিবেশী ভারতও দাপটের সাথে সেরা দশে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে দুই হাজার সালের দিকে মুন্সিজি ডট কমের মাধ্যমে অনলাইন শপিং এর যাত্রা শুরু হয়। ক্রেতার মানের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দূর্বলতা, নেটওয়ার্কজনীত সমস্যা, গ্রাহকের আস্থাহীনতা ইত্যাকার নানাবিধ কারণে এ খাত ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত তেমন সুবিধা করতে পারেনি।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মোবাইল ব্যাংকিং এর অনুমোদন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ চালু এবং বিকাশের মাধ্যমে পণ্যের মুল্য পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় নতুন করে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ২০১০ সালের পর আজকের ডিল ডট কম, রকমারী ডট কম, এখনই ডট কম এবং বিক্রয় ডট কমের মাধ্যমে দেশীয় বিনিয়োগ আসায় এখাতের প্রসার ও সম্প্রসারণের দিগন্ত উম্মোচিত হয়।

এদেশে পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রসাধনী, চাল-ডাল, বইপত্র, চিকিৎসা এমনকি কাঁচামাল খাতেও অনলাইন শপিং কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটেছে। এ ব্যবসায় সাধারণত তরুণ, মহিলা এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের আনাগোনাই বেশী। বাংলাদেশে এ পেশার ডালপালা গজানোর যে প্রভাবকগুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে তা আদ্যোপান্ত চর্চা করলে সহজেই অনুমেয় হয় যে, পুঁজি বিনিয়োগ এবং সততা ও বিশ্বস্ততার মুলধন, এক্ষেত্রে অফিস বা শোরুমের প্রয়োজন হয়না। এমনকি সার্ভিস চার্জ ও বেতনভুক্ত জনবলের উপস্থিতি না ঘটিয়ে বাসায় বসে ল্যাপটপ বা মোবাইলে পেইজ বা ওয়েব পোর্টাল ব্যবহার করে ও অনায়াসেই ব্যবসা পরিচালনা করা যায়।

এ খাতের প্রসার এখন সময়ের দাবী। করোনায় বদলে যাওয়া পৃথিবীতে ব্যবসা বাণিজ্যে টিকে থাকতে হলে অনলাইন শপিংয়ের বিকল্প নেই। তাইতো দেখা যাচ্ছে রাতারাতি অসংখ্য পোর্টাল, ফেইসবুক পেইজ এবং অ্যাপস এ ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা থেকে বাঁচার জন্য আইসোলেশন, লকডাউন,সামাজিক দূরত্ব এবং হোম কোয়ারেন্টাইন এর মত প্রতিরোধমুলক ব্যবহার কারনেই সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতের ভরা যৌবন চলছে।

মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবি, একক পরিবারের সদস্যরা এমনকি শিক্ষার্রা সময় বাঁচানো, যানজট এড়াতে, যাতায়তের খরচ থেকে মুক্তি পেতে এবং অনেক বিকল্প থেকে পণ্য বাছাইয়ের সুযোগ থাকায় অনলাইন শপিং এর দিকে ঝুঁকছে। জাতীয় পোর্টাল বা পেইজের চেয়ে অঞ্চল ভিত্তিক সাইটগুলোর জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে। কারণ তারা পণ্যের গুণগত মান এবং সময়মত সরবরাহের মাধ্যমে ভোক্তাকে আকৃষ্ট করতে পারছে।

ঢাকা কেন্দ্রীক সাইটগুলো বড়বড় শহরগুলোতে প্রি-পেমেন্টকৃত পণ্য সরবরাহে গাফিলতি করছে এবং জবাবদিহিতা না থাকায় গ্রাহকের ই-মেইলের উত্তর দেয়না এবং গ্রাহক সেবার ফোন গুলো প্রায়শই বন্ধ করে রাখে, ফলে আস্থার সংকট দেখা দেয়। অন্যদিকে দেখা যায়, রাতারাতি এ খাত থেকে মুনাফা তুলে নেওয়ার নিমিত্তে ভুইফোঁড় প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি নানা নামে পেইজ বা পের্টার চালু করে ক্রেতা সাধারনকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচেছ।

এমনকি প্রতিষ্ঠিত সাইটগুলোর পণ্যের নিম্মমান, মূল্য পরিশোধ পদ্ধতির জটিলতা, পণ্য পেতে দেরী হওয়া, প্রি-পেমেন্ট এ পণ্য সরবরাহে গড়িমসি এবং জবাবদিহিতার অভাবে গ্রাহক মনে আস্থার সংকট প্রকট হচেছ। এ খাত সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতার অভাব করোনাকালে ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করছে।

অনলাইন শপিং এর ব্যাপারে অধিকার সংরক্ষন আস্থা তৈরী এবং সেবাদানকারীদের নিয়ন্ত্রন ইত্যকার বিষয়ে সমন্নয়হীনতা দেখা যায়। যদিও ২০১৮ সালে জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা প্রণীত হয়েছে এবং এর ধারা ১.২ ও ২.২.৫ ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা সর্বমহলে আস্থা অর্জন ও বিক্রেতার স্বার্থ রক্ষার কথা রয়েছে। তথাপি ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভাবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকিসহ ক্রেতারা নানাভাবে হয়রানি হচ্ছে।

বর্তমানে এদেশের জনসংখ্যার শতকরা পয়ষট্রি শতাংশের বয়স পয়ত্রিশের এর নীচে, পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে, ক্রেতারা বেশীরভাগই তরুণ এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আনাগোনা ও বেশী, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এসব প্রভাবককে আমলে নিয়ে সুন্দর পরিকল্পনা ও কার্যকর কর্মপন্থা গ্রহণ করে, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে এ খাতকে যদি জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়, তাহলে সরকার বিপুল পরিমান রাজস্ব আহরনের এদেশের পাশাপাশি অর্থনীতিতে নব দিগন্তের উম্মেষ ঘটবে। তবেই করোনা পরবর্তী বদলে যাওয়া পৃথিবীতে অনলাইন শপিং এর হাত ধরেই ডিজিটাল বাংলাদেশের রুপকল্পের স্বার্থকতার দেখা মিলবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেট,৩১১৪, বাংলাদেশ। Email: [email protected]

ঢাকা, ০৩ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।