টর্চার সেলের ছবি ভাইরাল, মুখ খুলেছেন স্ত্রী, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, প্রধান সহযোগী গ্রেপ্তার, ব্যাংক হিসাব জব্দ শাহেদের অন্যরকম জীবন, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা


Published: 2020-07-09 16:30:45 BdST, Updated: 2020-08-04 12:08:51 BdST

লাইভ প্রতিবেদকঃ বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি নাম রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম। প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে হুমকি দেয়ার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণাসহ নানা ধরনের অপকর্ম চালিয়ে গেছেন তিনি। ঢাকা শহরের বাইরে চলাচলের সময় পেয়েছেন পুলিশী নিরাপত্তা। এমনকি অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে এক কর্মচারীর পুরো পরিবারকে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শাহেদ করিম হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি এখন প্রধানমন্ত্রীর এপিএসের দায়িত্বে। আমার সাথে এগুলো করে কুলাইতে পারবা ভাইয়া বলোতো। যেহেতু আমি এখন একটা পজিশন হোল্ড করি, যদি চারটা থানায় তোমার নামে কইসা মামলা দেই ঠিক হবে জিনিসটা।’ ভুক্তভোগী আরিফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘এখন আপনি যদি মামলা দিতে চান দেন আপত্তি নেই।’

এক সময়ের ব্যক্তিগত কর্মচারী আরিফুর রহমান সোহাগকে ফোনে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছেন অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম।

শুধু'ই যে হুমকি দিয়েছেন তা কিন্তু নয়। ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় ২০১৭ সালে দায়েরকৃত এক মামলায় আসামি করা হয়েছিল সোহাগ ছাড়াও তার বৃদ্ধ বাবা-মা এবং তিন বোনকেও। কিন্তু শাহেদ করিম রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ায় বছরের পর বছর মামলার ঘানি টানছে এই পরিবার।

ভুক্তভোগী আরিফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘সাড়ে তিন বছর ধরে এই মামলায় আমি ঝুলছি।’ ভুক্তভোগী আরিফুর রহমান সোহাগের মা নূরজাহান বেগম জানান, '‘আমাদের নামে মামলা দিছে আমরা নাকি টাকা বইয়ে আনতে যাবার লাগছি।’

বিভিন্ন ভিডিও এবং স্থির চিত্রে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্ত শাহেদ করিম ঢাকার বাইরে গেলেই প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ স্কট ব্যবহার করেছিলেন। তার অফিস কক্ষের টর্চার সেলে নির্যাতনের স্থির চিত্রও প্রকাশ হচ্ছে এখন।

ভুক্তভোগী আরিফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘তার গাড়ি কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে মেয়ে কেলেঙ্কারি সবকিছুই আমি জানতাম। যার কারণে সে কখনোই আমাকে ছাড়তে চাই না। এছাড়াও আমাকে বলছে, আমি যদি কোথাও মুখ খুলি তাহলে আমাকে জানে মেরে ফেলবে।’

আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, গত কয়েক বছর ধরে নানা পরিচয়ে অপকর্ম করে আসছিলেন শাহেদ করিম। সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠায় তার বিষয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে সতর্কতাও জারি করা হয়েছিল।

দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা:

এদিকে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার পুলিশের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদফতরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রতারণা মামলার আসামি শাহেদের বিরুদ্ধে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিনি যেন দেশের বাইরে যেতে না পারেন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। এদিকে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদের প্রধান সহযোগী ও জনসংযোগ কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তার কাছে থেকে শাহেদ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

এর আগে নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়, উত্তরা ও মিরপুর শাখা একে একে সিলগালা করে দেয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে অভিযান শেষে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সেখানেও অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশ কিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এজন্য রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করা হয়েছে। এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সারোয়ার আলম আরও জানান, এ সব অপরাধ ও টাকার নিয়ন্ত্রণ চেয়ারম্যান শাহেব (রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ) নিজে করতেন অফিসে বসে। এই অপকর্মগুলো রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় থেকেই হতো বিধায়, এটি সিলগালা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের স্থানান্তর করে হাসপাতাল দুটিও সিলগালা করা হয়েছে। এর আগে সোমবার রাতেই মো. মোহাম্মদ শাহেদের মালিকানাধীন হাসপাতাল থেকে অননুমোদিত র‌্যাপিড টেস্টিং কিট ও একটি গাড়ি জব্দ করা হয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব একটি গণমাধ্যমকে বলেন, এমন একটি হাসপাতালকে চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। ক্ষমতাবানরা এর পেছনে থাকতে পারেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস (বিআইএইচএস) সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল। চিঠিও দিয়েছিল। টাকাপয়সাও চাওয়া হয়নি। তারপরও বিআইএইচএসকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। রশিদ-ই-মাহবুবের ধারণা, এমন পর্যায় থেকে এই সিদ্ধান্ত এসেছে, যা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের নেই।

কে ওই শাহেদ: সাতক্ষীরা সদরের কামালনগরে জন্ম নেওয়া শাহেদ নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভাগ্যের অন্বেষণে ঢাকায় চলে আসেন। মিরপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে মিরপুরের একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলতে এটুকুই। সাহেদ সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাফিয়া করিম (বর্তমানে মৃত) ব্যবসায়ী সিরাজুল করিমের ছেলে। দরিদ্র পরিবারের ছেলে শাহেদ প্রতারণা ও মানুষ ঠকিয়ে এখন শতকোটি টাকার মালিক।

এই সেই শাহেদ

 

সেই সময় বহুল আলোচিত ‘হাওয়া ভবনে’ও তার অবাধ যাতায়াত ছিল। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ২ বছর কারাভোগ করেন সাহেদ। ২০১১ সালে ধানম-ির ১৫ নম্বর সড়কে একটি এমএলএম কোম্পানি খোলেন তিনি, যার নাম ছিল বিডিএস ক্লিক ওয়ান। মূলত এই এমএলএম কোম্পানির মাধ্যমেই তার উত্থান শুরু। এমএলএম কোম্পানি খুলে ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তখন শাহেদ নিজেকে মেজর ইফতেখার করিম চৌধুরী নামে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয় দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় দুটি ও বরিশালে একটি মামলা রয়েছে। মামলার পর কয়েক বছর তিনি ভারতের বারাসাতে সপরিবারে আত্মগোপন করে থাকেন। পরে নানা কৌশলে মামলাগুলো থেকে জামিন নিয়ে দেশে ফিরে এসে নতুন কারবার শুরু করেন।

বিডিএস কুরিয়ার সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে অনেকের কাছ থেকে শাহেদ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি থানায় ৮ মামলা হয়েছে। মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক বিমানবন্দর শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা ঋণ নেন শাহেদ। সেখানে দাখিল করা নথিপত্রে নিজেকে কর্নেল (অব.) ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী পরিচয় দেন। এই ভুয়া পরিচয় দিয়ে কাগজপত্র দাখিল করায় তার বিরুদ্ধে আদালতে দুটি মামলা চলছে।

শাহেদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তোলা ছবি তার ফেইসবুকের কভার ফটো করেছেন। এ ছাড়া তার ফেইসবুকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতার এবং মন্ত্রী, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, আমলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার অসংখ্য ছবি রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ছবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধামকি দিতেন শাহেদ। শাহেদের উত্তরার রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় ছিল একটি টর্চার সেল। সেখানে বন্দুকধারী বডিগার্ড রাখতেন তিনি। অফিসে লাঠিসোঁটা রেখে লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করতেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শাহেদ উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের ৩৮ নম্বর বাড়িতে ২০১০ সালে স্থাপন করেন রিজেন্ট হাসপাতাল। মিরপুরের শাখাটি তারও আগের। যার কোনোটির বৈধ সনদ ছিল না। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতি না থাকার পরও চুক্তিভিত্তিক দালালের মাধ্যমে টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এনে লাখ টাকা আদায় করতেন। উত্তরা পশ্চিম থানার পাশে রয়েছে তার রিজেন্ট কলেজ ও ইউনিভার্সিটি, আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটি। যদিও এগুলোর সব কটির বৈধ সনদ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনুমোদনহীন আরকেসিএস মাইক্রোক্রেডিট ও কর্মসংস্থান সোসাইটির ১২টি শাখার মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্যের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এর আগেও তিনি উত্তরার ৪, ৭ ও ১৩ নম্বর সেক্টরে অফিস খুলে ভুয়া শিপিং ব্যবসা করেছেন। সেখানে বিনিয়োগের নামে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। কিছুদিন আগে তিনি একটি অস্ত্রের লাইসেন্সও নিয়েছেন।

২০০৯ সালে প্রতারণার অভিযোগে পুলিশ ও র‌্যাব শাহেদকে গ্রেপ্তার করেছিল। ওই মামলার কাগজপত্রে দেখা যায়, খুলনার একটি টেক্সটাইল মিলের জন্য দুই টনের ১০টি ও দেড় টনের ১৫টি এসি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিল শাহেদ করিমের প্রতিষ্ঠান। জিনিসপত্র নিয়ে ১৯ লাখ টাকার চেক দিয়েছিলেন রাইজিং শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি এবং রাইজিং রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম। অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি পাস হয়নি। ওই ঘটনায় মামলা করেছিল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি।

মুখ খুলেছেন স্ত্রী:

প্রতারণার সব কৌশলই রপ্ত করেছেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম। ছাড় দেননি নিজের পরিবারকেও। সময় সংবাদের সঙ্গে আলাপে শাহেদের স্ত্রীর মুখে উঠে আসে তার নানা অপকর্মের চিত্র। শাহেদের বিচারও দাবি করেন স্ত্রী সাদিয়া। তার বাড়ির মালিকের দাবি, বাসা ভাড়ার টাকা চাইতে গেলেও দেয়া হতো হুমকি। এদিকে, শাহেদের সহযোগীসহ দুইজনকে আটক করেছে র‌্যাব।

শাহেদের স্ত্রী

 

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ। প্রতারণাই যার মূল পেশা। রপ্ত করেছেন সব কৌশল। প্রায় ২ বছর ধরে শাহেদ পরিবারসহ থাকতেন ওল্ড ডিওএইচএসের ৯ নম্বর বাসায়। ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বাসাটি ভাড়া নিলেও অল্প কয়েকদিনেই বেরিয়ে আসে তার আসল রূপ। তার প্রতারণার কথা জানতে পেরে বেশ কয়েকবার তাকে নোটিশ দেয় বাসার মালিক। তিনি জানান, টাকা চাইতে গেলেই দেওয়া হতো হুমকি। টাকা সুটকেস নিয়ে ঘুরতেন তিনি।

বাড়িওয়ালা বলেন, ‘বাসাভাড়া আগেরজন দিত ৮০ হাজার টাকা। যাতে ভাড়া নেয় তাকে আমি ইচ্ছা করে ১ লাখ টাকা বাড়ি ভাড়া চেয়েছি তার কাছে।’ শাহেদের স্ত্রী সাদিয়া জানান, শাহেদের প্রতারণার শুরু হয় ২০০৮ থেকে। পরিবারের লোকদের সাথেও প্রতারণা করতো সে। এটা তার নেশায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতারকের বিচারও চান তিনি।

শাহেদের স্ত্রী সাদিয়া বলেন, 'কয়েকবার আমি তার কাছ থেকে চলেও গেছি। আমার পরিবারের কয়েকজনের সাথেও তার টাকা পয়সা নিয়ে গণ্ডগোল ছিলো। ওনার জন্য আমার পরিবারের অন্যরাও সমস্যায় আছে।' এদিকে শাহেদ যাতে বিদেশ যেতে না পারে সেজন্য ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শাহেদের প্রতিষ্ঠানের পিআরও ও তার ভায়রাকে আটক করেছে র‍্যাব।

প্রধান সহযোগী গ্রেপ্তার:

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদের প্রধান সহযোগী তারেক শিবলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। বুধবার দিবাগত রাতে রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল সারওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শাহেদ ও শিবলী

 

উল্লেখ্য, নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার নানা অভিযোগ ওঠে রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে। ফলে প্রধান কার‍্যালয়, উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

র‌্যাবের মামলার আসামি যারা: রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ (৪৮), ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ পারভেজ (৪০), হাসপাতাল কর্মচারী তরিকুল ইসলাম (৩৩), স্টাফ আবদুর রশিদ খান (২৯), স্টাফ শিমুল পারভেজ (২৫), কর্মচারী দীপায়ন বসু (৩২), আইটি বিশেষজ্ঞ মাহবুব (৩৩), আইটি বিশেষজ্ঞ সৈকত (২৯), সাহেদের ব্যক্তিগত সহকারী ও আইটি বিশেষজ্ঞ পলাশ (২৮), প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসান হাবীব (৪৫), এক্স-রে টেকনিশিয়ান আহসান হাবীব হাসান (৪৯), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হাকিম আলী (২৫), রিসিপশনিস্ট কামরুল ইসলাম (৩৫), রিজেন্ট গ্রুপের প্রজেক্ট অ্যাডমিন রাকিবুল ইসলাম ওরফে সুমন (৩৯), রিজেন্ট গ্রুপের এইচআর অ্যাডমিন (রিজেন্ট করপোরেট অফিস) অমিত বণিক (৩৩), গাড়িচালক আবদুস সালাম (২৫), প্রধান কার্যালয়ের হিসাব শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রশীদ খান জুয়েল (২৮)। আসামিদের মধ্যে ৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব জব্দ:

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ ওরফে শাহেদ করিমের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ৩০ দিনের জন্য দেশের সব ব্যাংককে এ নির্দেশনা পরিপালন করতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে দেশের সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এ নির্দেশনা দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে বলা হয়, রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহেদ এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য নামে ব্যবহৃত ব্যাংকের সব অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধকরণের নির্দেশ দেয়া হলো। আগামী ৩০ দিন অবরুদ্ধ থাকবে এসব ব্যাংক হিসাব। এর আগে বুধবার (৮ জুলাই) শাহেদের ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে শাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে র‍্যাব। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পুলিশের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন বিভাগকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়। এর আগে নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ ও করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রধান কার্যালয়, উত্তরা ও মিরপুর শাখা একে একে সিলগালা করে দেয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সেখানেও অনুমোদনহীন টেস্ট কিট ও বেশ কিছু ভুয়া রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এজন্য রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয় সিলগালা করা হয়েছে। এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সারোয়ার আলম আরও জানান, এ সব অপরাধ ও টাকার নিয়ন্ত্রণ চেয়ারম্যান শাহেব নিজে করতেন অফিসে বসে। এই অপকর্মগুলো রিজেন্টের প্রধান কার্যালয় থেকেই হতো বিধায়, এটি সিলগালা করা হয়েছে। পাশাপাশি রোগীদের স্থানান্তর করে হাসপাতাল দুটিও সিলগালা করা হয়েছে। সোমবার রাতেই মো. মোহাম্মদ শাহেদের মালিকানাধীন হাসপাতাল থেকে অননুমোদিত র‌্যাপিড টেস্টিং কিট ও একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এদিকে নানা অনিয়মের অভিযোগে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

টর্চার সেলের ছবি ভাইরাল:

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে ছিল প্রতারক শাহেদের টর্চার সেল। প্রতারণার নানা কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পর কেউ তার কাছে টাকা চাইতে গেলে ওই টর্চার সেলে চালানো হতো নির্যাতন। রিজেন্টে অভিযানের পর এমন নানা নির্যাতনের তথ্য বেরিয়ে আসছে। কথা বলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা।

যেন টর্চার সেল

 

শাহেদের নির্যাতনের শিকার লোকজন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। এমনই একজন জানান, তার কাছে টাকার জন্য গিয়ে ছিলাম। টাকা চাওয়া মাত্রই তার লোকজন আমার দুই হাত ধরে শাহেদের কক্ষে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে শাহেদ নিজেই আমাকে নির্যাতন করে। শাহেদ একজনকে নির্যাতন করছেন এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যদিও ওই ছবিটি কে বা কারা প্রকাশ করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঢাকা, ০৯ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।