ফেঁসে যেতে পারেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ ভিসি!


Published: 2019-09-23 16:13:17 BdST, Updated: 2019-10-18 15:08:37 BdST

ইফতেখার মাহমুদঃ অনিয়ম দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তাদের কেউ বিধি-নিষেধ কিংবা আইনের তোয়াক্কাও করছেন না। এবার ভিসিদের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসির নজরদারিতে আছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৪ ভিসি। তদন্তে প্রমাণ মিললে ফেঁসে যেতে পারেন তারা। এদের মধ্যে দুজন সাবেক ভিসিও রয়েছেন।

নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি-পদায়নসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে দেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। বড় প্রজেক্টে পুকুর চুরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে ভিসিদের অনিয়ম তদন্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কমিটি তাদের তদন্ত কাজ শেষ করেছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, জমি ক্রয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের ব্যাপারে খোদ সরকারি অডিট দল আপত্তি তুলেছে। এর মধ্যে ধানমন্ডিতে কেনা বাড়ির ভেতরের রাস্তা দুবার কেনার অভিযোগও আছে। বিষয়টি ইউজিসি তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভিসি নাকি ছাত্রলীগকে ঈদ সালামিই দিয়েছেন কোটি টাকার ওপরে। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের আর্থিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে জাবি ভিসি প্রফেসর ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকদিন ধরে আন্দোলন চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনিয়ম তদন্তে ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত’ দাবি করে সময় বেঁধে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিচার বিভাগীয় তদন্ত না করায় ভিসি প্রফেসর ফারজানা ইসলামের পদত্যাগও দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান একের পর এক বিতর্কে জড়িয়েছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ডাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিচারিতা ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করে বিতর্ক সৃষ্টি করেন ভিসি আখতারুজ্জামান। সর্বশেষ [ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রত্ব না থাকা ছাত্রলীগ নেতাদের অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি করার অভিযোগ উঠেছে খোদ ভিসির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভিসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবাবপত্র ক্রয়েও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ভিসি মো. আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ। ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য তিনবার সম্মানী নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের পদোন্নতি, কর্মকর্তা নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়মকানুনের চেয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছাই প্রধান করে দেখেন তিনি। এনিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। তার বিরুদ্ধেও রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। এছাড়া যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে শাস্তি ও বহিষ্কার করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নানা অভিযোগে ওই ভিসির পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল রয়েছে ক্যাম্পাস। গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাস ও ব্যক্তিগত আলাপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ফাতেমা তুজ জিনিয়াকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জিনিয়ার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এর বাইরে বশেমুরবিপ্রবির ভিসির বিরুদ্ধে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কাজ শুরু করেছে ইউজিসি।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রাবিপ্রবি) ভিসি প্রফেসর ড. এম রোস্তম আলী নিয়মনীতি ভঙ্গ করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আপন ভাগ্নেসহ ২২ জন নিকটাত্মীয়কে চাকরি দিয়েছেন। ভিসি প্রশাসনিক ভবনের অবকাঠামো নির্মাণে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অধিক হারে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ আছে। ফলে চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদার তা করছেন না। নির্ধারিত সময়ে প্রশাসনিক ভবনের কাজও এ কারণে শেষ হয়নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় : বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করেন। অনেক সময় সকালে ক্যাম্পাসে থাকলেও বিকেলে থাকেন ঢাকায়। ভিসিদের মধ্যে সবচেয়ে কম সময় তিনি নিজের ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তার নিয়োগের অন্যতম শর্তই ছিল ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান। গত বছরের ২৯৫ দিনই তিনি ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সালে ক্যাম্পাসের বাইরে ছিলেন ১৩১ দিন। চলতি বছরেও তার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার খুবই কম।

এছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি, ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে জনবল নিয়োগ, শিক্ষক ও জনবল নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়ম, সভাপতি হয়েও নিয়োগ বোর্ডে অনুপস্থিত থাকা, অবৈধভাবে গাড়ি বিলাসিতা, অর্গানোগ্রাম লঙ্ঘন করে নিয়োগ, নিয়ম ভেঙে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ, ইচ্ছামতো পদোন্নতি প্রদান, আইন ভেঙে নিয়োগসহ বিভিন্ন কমিটি গঠন, একাধিক প্রশাসনিক পদ দখল, স্বজনপ্রীতি, ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মসহ নানা বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় : চলতি বছরের শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে বিতর্কের সৃষ্টি করেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এস এম ইমামুল হক। ঘটনার প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ক্যাম্পাস। পরে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের মুখে ভিসিকে ছুটিতে পাঠানো হয়। ছুটিতে থাকা অবস্থায় তার মেয়াদ শেষ হয়। এই ভিসির বিরুদ্ধেও রয়েছে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ। এর আগে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর হারুণ অর রশীদের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজের নামে নিয়ে একটি ট্রাস্ট ভবন নির্মাণ করেন।

শুধু তা-ই নয়, তিনি অবসরে যাওয়ার পর এ সংক্রান্ত সব ফাইলপত্র নিয়ে যান। ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক ভিসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তদন্ত কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি তা ফেরত দেননি। ইউজিসির কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত কাজ শেষ। বর্তমানে প্রতিবেদন লেখার কাজ চলছে। তবে ওই উপাচার্যের পক্ষ থেকে তদবির চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : শাবিপ্রবি ভিসি প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধেও নানা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তিনি নিয়োগে প্রভাব খাটিয়ে শাবির বাইরের ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে ওই ভিসির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যায় ক্যাম্পাসে অনিয়য়ম-দুর্নীতির একটি শ্বেতপত্র বেনামে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাকৃবি) ভিসি প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ভিসি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ভিসি প্রফেসর ড. অহিদুজ্জামান, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে ইউজিসি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। আমাদের কাজ কেবল তদন্ত শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ ও প্রতিবেদন পাঠানো। তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।