বমি করার পরও নিস্তেজ আবরারকে যেভাবে পেটান বুয়েটের জিয়ন


Published: 2019-10-12 06:40:01 BdST, Updated: 2019-11-18 03:05:59 BdST

লাইভ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় এবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন স্থায়ী বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন বমি করার পরও তিনি আবরারকে পিটিয়েছিলেন। একপর্যায়ে আবার নিস্তেজ হয়ে গেলে ভান করছে বলে অন্যরা বলাবলি শুরু করে। পরে নিস্তেজ আবরারকে আবারো পেটানো হয়।

শুক্রবার ঢাকা মহানগর হাকিম মো. সারাফুজ্জামান আনছারীর আদালতে জিয়ন ওই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। আসামি জিয়ন বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী (সাময়িক বহিষ্কার)।

জিয়ন আদালতকে বলেছে, আমি আবরারকে কিল ঘুষি মারার পাশাপাশি স্টাম্প দিয়েও হাঁটুতে পিটিয়েছি। এর আগে বৃহস্পতিবার আরেক আসামি ইফতি মোশাররফ সকাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ নিয়ে মামলার দুই আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিলেন। এই দু’জনকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া শুক্রবার মামলার দুই আসামি বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা ও হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এদিন মামলার অপর দুই আসামি মাজেদুল ইসলাম ও শামিম বিল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হল। অসুস্থ থাকায় আরেক আসামি মিজানুর রহমানকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান জিয়নের জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। জিয়ন আদালতকে জানিয়েছেন, বুয়েট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান রবিনের নির্দেশে আবরারকে রাত ৮টার দিকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। এ সময় ওই কক্ষে ইফতি ও তানভীর ছাড়া আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল শিবির শনাক্ত করা। প্রথম দিকে আবরার নামগুলো বলছিল না। এরপর আবরারের রুম থেকে দুটি মোবাইল ফোন ও তার ব্যবহার করা ল্যাপটপ নিয়ে আসা হয়।

জিয়ন বলেন, শিবির কারা করে তা জানতে আবরারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এরপরও আবরার মুখ খোলেনি। এক পর্যায়ে সামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসে। মেহেদি হাসান আর আমি আবরারকে চড়-থাপ্পড় মারা শুরু করি। পরে ইফতি স্টাম্প দিয়ে মারধর শুরু করে। সে অনেকগুলো বাড়ি মারে। এ সময় অনিক সরকার স্টাম্প দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটায়। পায়ের পাতা, হাঁটু ও হাতেও পেটায়। আমিও কিছু কিল ঘুষি মারি। পরে স্টাম্প দিয়ে হাঁটুতে পেটাই। এরপর অন্যরা কয়েক ধাপে ভেতরে এসে মারধর করে।

এক পর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে ও মেঝেতে বমি করে দেয়। তখন একজন বলে ওঠে, ও ভান করছে। এ সময় আমি স্কিপিংয়ের রশি দিয়ে তার পিঠে মারতে থাকি। ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক উপ-সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল (বহিষ্কার) মোবাইল ফোনে বিষয়টি অনিককে জানায়। অনিক আবরারকে গোসল করিয়ে হাতে-পায়ে মলম লাগিয়ে দিতে বলে। এ সময় আবরার দ্বিতীয়বার বমি করে। তখন আবরারের কক্ষ থেকে তার কাপড়-চোপড় নিয়ে আসে অন্যজন। আবরারকে ওই কক্ষ থেকে বের করে পাশের ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেয়া হয়।

ওই কক্ষেও আবরার বমি করে। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেয়ার জন্য নিচে নামাতে বলে। এরপর জেমি, মোয়াজ ও শামীমসহ ৩-৪ জন তাকে কোলে করে সিঁড়ি ঘরের পাশে নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ ও চিকিৎসকদের খবর দেয়া হয়। চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) বুয়েট ছাত্রলীগের উপসমাজ সেবা বিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়। ইফতি বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

এদিকে নিহত আবরারের রুমমেট আসামি মিজানুর রহমান অসুস্থ থাকায় তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। প্রয়োজনে পরে তার রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে দুই আসামি বুয়েট ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা ও হোসেন মোহাম্মদ তোহার ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আবেদনে বলা হয়, ওই দুই আসামি ও তাদের সহযোগী আসামিরা ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে শিক্ষার্থী আবরারকে শেরেবাংলা হলের তার রুম থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে যায়। দিবাগত রাত আড়াইটা পর্যন্ত ওই হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমের ভেতর নিয়ে আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে ক্রিকেট স্টাম্প ও লাঠি-সোটা এবং রশি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড মারধর করে। এতে ঘটনাস্থলেই আবরার মারা যান। মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে আবরারের লাশ ফেলে রাখে। আদালতে আসামি ইফতি মোশাররফ সকালের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অমিত সাহা ও তোহার নাম প্রকাশ করেছে। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতার ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে আসামিদের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া একান্ত প্রয়োজন।

এরও আগে এ মামলায় ৮ অক্টোবর বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত) সহ ১০ আসামির ৫ দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। এরা হলো- মেহেদী হাসান রাসেল (বুয়েটের সিই বিভাগ, ১৩তম ব্যাচ ও বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক), মুহতাসিম ফুয়াদ (সিই বিভাগ, ১৪তম ব্যাচ ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক) মো. অনিক সরকার, (সিই বিভাগ, ১৫তম ব্যাচ ও তথ্য-গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক) মো. মেহেদী হাসান রবিন (সিই বিভাগ, ১৫তম ব্যাচ ও সাংগঠনিক সম্পাদক), ইফতি মোশাররফ সকাল (বায়োমেডিকেল ইঞ্জি., ১৬তম ব্যাচ ও উপসমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক), মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন (মেরিন ইঞ্জি., ১৫তম ব্যাচ ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক) মো. মোজাহিদুল রহমান (ইইই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ ও বুয়েট ছাত্রলীগ সদস্য), খোন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর (এমই বিভাগ, ১৬তম ব্যাচ ও বুয়েট ছাত্রলীগ কর্মী), মুনতাসির আল জেমি (এমই বিভাগ, ১৭তম ব্যাচ) ও ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না (মেকানিক্যাল ইঞ্জি. ১৫তম ব্যাচ ও বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক)। এদের মধ্যে ১০ অক্টোবর ইফতি ও শুক্রবার (১১ অক্টোবর) জিয়ন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। বাকিরা রিমান্ডে আছে।

এদিকে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আরও দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার ভোর ৪টার দিকে সিলেট থেকে মাজেদুল এবং বিকালে সাতক্ষীরা থেকে শামিম বিল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।

ঢাকা, ১২ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।