সপ্তাহ না ঘুরতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষার্থীর লাশ


Published: 2019-12-07 18:48:46 BdST, Updated: 2020-08-07 21:42:28 BdST

রাকিবুল ইসলাম : সপ্তাহ না ঘুরতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই ছাত্রীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অপর ছাত্র সেমিস্টার ফির জন্য আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পার লাশ সনাক্ত করে পরিবারের সদস্যরা। এর আগে বুধবার রাতে তার লাশ সনাক্ত করা হয়। এঘটনার পর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে শুক্রবার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ও এর আশপাশ এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। এর আগে ভালোবেসে বিয়ের দুই মাসের মাথায় স্বামীর ছুরিকাঘাতে খুন হন শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটির ছাত্রী কানিজ ফাতেমা টুম্পা। এছাড়া গত ৪ ডিসেম্বর সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটির ছাত্র সাইফুল ইসলাম শুভ সেমিস্টার ফি যোগাড় করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন।

সেমিস্টার ফি’র জন্য প্রাণ দিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র : সাইফুল ইসলাম শুভ। পড়াশোনা করতেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানীর শ্যামলীর একটি মেসে থেকে পড়াশোনা করতেন তিনি। টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান শুভ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করতে গিয়ে স্ট্যাটাস মেইনটেইন ও সেমিস্টার ফি যোগান দিতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যান তিনি। সেমিস্টার ফি ম্যানেজ করতে করতে যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলেন শুভ। কুলিয়ে উঠতে না পেরে অবশেষে নিজের প্রাণটাই দিয়ে দিলেন শুভ। গত ৪ ডিসেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় মেস থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি। শুভ রাজধানীর সোনাগাঁ ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন।

শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম মুনশি বলেন, লাশ উদ্ধারের সময় পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। তাতে লেখা ছিল, ‘দারিদ্র্যের কারণে পরিবারের আশা পূরণ করতে পারিনি, সে জন্য আমি মা-বাবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।’

শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ জানায়, সাইফুল শ্যামলীর ২ নম্বর সড়কের ১৪/১ নম্বর বাড়ির নিচতলায় একটি মেসে থাকতেন। বুধবার সন্ধ্যায় তার রুমমেট এসে ভেতর থেকে দরজা ছিটকিনি লাগানো দেখতে পান। অনেক ডাকাডাকি করেও তার কোনো সাড়া না পাওয়ায় শেরে বাংলা নগর থানায় জানানো হয়। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় সাইফুলের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। পরে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

স্ট্যামফোর্ড ভার্সিটির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার আলামত, মামলা দায়ের : স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার আগে তাকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তার বাম স্তনে কামড়/আচড়ের দাগ রয়েছে। তবে কারা ওই কাণ্ড ঘটিয়েছে সেটি স্পষ্ট নয় পুলিশ। রুম্পার বয়ফ্রেন্ডের দিকে আঙ্গুল তুলছেন অনেকেই। হত্যার সঙ্গে তার কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, রুম্পা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। বুধবার রাতে লাশ উদ্ধারের পর অজ্ঞাত হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়। পরিচয় না পাওয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে রমনা থানায় মামলা করে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রুম্পার স্বজনরা মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। তার বাবা রোকন উদ্দিন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি হবিগঞ্জে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত। রাজধানীর শান্তিবাগে মা ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন রুম্পা।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রুম্পার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। সূত্র জানিয়েছে, মৃত্যুর আগে তাকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, লাশের শরীরের আঘাত দেখে মনে হয়েছে, ওপর থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে ধর্ষণের শিকার হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না।

রুম্পার স্বজনরা জানান, দুই ভাইবোনের মধ্যে রুম্পা ছিলেন বড়। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। রুম্পা শাহজাহানপুরের শান্তিবাগের ২৫৫ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে মা-ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। বাসা থেকে ৪-৫ মিনিট দূরত্বের একটি ফ্ল্যাটে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতেন তিনি। প্রতিদিনের মতো বুধবার বিকেলে বাসা থেকে বেরিয়ে প্রাইভেট পড়াতে যান। এক ঘণ্টা পড়ানোর পর বের হয়ে বাসার নিচে গিয়ে রুম্পা তার মাকে ফোনে বলেন, চাচাতো ভাইকে দিয়ে বাসার নিচে তার একজোড়া স্যান্ডেল পাঠাতে। ১০ বছরের চাচাতো ভাই একজোড়া স্যান্ডেল নিয়ে নিচে নামে। ওই স্যান্ডেল পরিবর্তন করে পায়ে দেন রুম্পা। এরপর তার ব্যবহূত মোবাইল ফোন, আংটি, হাতঘড়ি ও ব্যাগ চাচাতো ভাইয়ের কাছে দেন। তাকে বলেন, আম্মুকে বলিস আপু একটু পরে বাসায় ফিরবে। রুম্পা সেখান থেকে চলে যান। মোবাইল ফোন, আংটি, হাতঘড়ি ও ব্যাগ বাসায় পাঠোনোর উদ্দেশ্য কী ছিল তা বলতে পারছেন না স্বজনরা। রাতে বাসায় না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।

পুলিশ জানায়, বুধবার রাত সোয়া ১০টার দিকে সিদ্ধেশ্বরীর সার্কুলার রোডের ৬৪/৪ নম্বর বাড়ির সামনে থেকে রুম্পার লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশটি পড়ে ছিল দুটি ভবনের পেছনে এবং একটি ভবনের সামনের গলিতে। তিনটি ভবনের যে কোনো একটি থেকে তাকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা।

বিয়ের দুই মাসেই বয়ফ্রেন্ডের ভয়ংকর রূপ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী খুন : দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক থেকে ভালোবাসার মানুষটিকে বিয়ে করেছিলেন কানিজ ফাতেমা টুম্পা। বিয়ের দুই মাস যেতে না যেতেই বয়ফ্রেন্ডের ভয়ংকর রূপ দেখলেন টুম্পা। তার বয়ফ্রেন্ড আগে থেকেই মাদকাসক্ত ছিলেন। বিয়ের পর তার মাদকের নেশা আরও বেড়ে যায়।

কারণে অকারণে শুরু হয় নির্যাতন। অতিষ্ট হয়ে বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার পথে স্বামীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন তিনি। রাজধানীর কুড়িলে নিহত টুম্পা শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। বৃহস্পতিবার রাতে (২৮ নভেম্বর) কুড়িল চৌরাস্তা এলাকায় তাকে ছুরিকাঘাত করেন স্বামী সাফকাত হাসান রবিন। সাথে সাথে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। টুম্পা শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটির বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার মধ্য কাটাদিয়া এলাকায়। তার বাবার নাম শাহ আলম। চার বোনের মধ্যে টুম্পা ছিলেন সবার বড়।

টুম্পার ছোট বোন আয়শা আক্তার জানান, বিয়ের আগে কুড়িল চৌরাস্তা এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন টুম্পা। আর পাশের বাড়িতে থাকতেন সাফকাত হাসান রবিন। দু'জনের মধ্যে দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুই মাস আগে তারা বিয়ে করেন। এর পর তারা কুড়িলের নূরানী মসজিদ গলির একটি বাসায় থাকতে শুরু করেন। রবিন আগে থেকেই মাদকাসক্ত। বিয়ের পরপরই নানা সমস্যা শুরু হয়। প্রায়ই তাদের মধ্যে কলহ হতো। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার টুম্পা তার বাবা-মাকে ফোন করে তার বাসায় যেতে বলেন। তবে বাবা-মায়ের বদলে খালা নাজমা আক্তার তাকে আনতে যান।

বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পথে কুড়িল চৌরাস্তা এলাকায় পেছন থেকে টুম্পার পিঠে ছুরিকাঘাত করেন রবিন। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাকে ঢামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়।

ঢাকা, ০৭ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।