কে ওই পাপিয়া? তার খুটি ছিল কে?


Published: 2020-02-24 02:30:25 BdST, Updated: 2020-04-07 10:52:30 BdST

রেশমী চৌধুরীঃ পাপিয়া। পুরো নাম শামীমা নূর পাপিয়া। একটি নাম। একটি যন্ত্রনা। একটি মর্তিমান আতঙ্ক বলেও কেউ কেউ দাবী করেছেন। বলেছেন, পাপিয়া কেবল নারী নন। তিনি একজন রীতিমত মাফিয়া। তার খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ও প্রভাব খাটিয়ে চলতেন পাপিয়া। উঠতি বয়সী বড় লোকের ছেলে মেয়েদের নানান প্রলোভনে ঘর ছাড়া করেন। তাদের জড়িয়ে ফেলেন তার জালে। নেশা ও নারী প্রলোভনে তিনি অনেককেই সর্ব শান্ত করেছেন। এসব নানা অপকর্মের অভিযোগে গ্রেপ্তার নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত ) শামীমা নূর পাপিয়ার রাজধানীর ফার্মগেটের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে।

পুলিশ জানায়, রোববার ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে বিদেশি অস্ত্র, ম্যাগাজিন, গুলি, বিদেশি মদ ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা উদ্ধার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের-১ (র‌্যাব)-এর একটি দল। র‌্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, র‍্যাব-১-এর একটি বিশেষ দল অভিযান চালায় শামিমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরীর বাসায়। বাসা থেকে বিদেশি অস্ত্র, ম্যাগাজিন, গুলি, বিদেশি মদ ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এর আগে শনিবার সকালে তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগের চেষ্টা চালানোর সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩ সহযোগীসহ পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

পাপিয়াকে গ্রেপ্তারের পর রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়ার প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা। তবে এর আড়ালে তিনি মূলত অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা করতেন। পাপিয়া কোনো কাজ বাগিয়ে নিতে পাঁচ তারকা হোটেলে সুন্দরী তরুণীদের পাঠিয়ে মনোরঞ্জন করতেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

গত তিন মাসে তিনি শুধু ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলেই বিল পরিশোধ করেছেন দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। ওই হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সবসময় তার নামে বরাদ্দ থাকত। হোটেলটির বারে তিনি প্রতিদিন বিল দিতেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অথচ বৈধভাবে তার বার্ষিক আয় মাত্র ১৯ লাখ টাকা।
জানা যায় পাপিয়া রাজধানীর গুলশানের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের বিলাসবহুল রুম ভাড়া করে অসামাজিক কার্যক্রম চালাতেন। শনিবার তাকে গ্রেপ্তারের পর ওই পাঁচ তারকা হোটেলের দামি রুমে অভিযান চালিয়ে চার নারীকে আটক করে র‌্যাব। এই চারজনসহ সাতজনকে ওই রুমে রেখে মোটা অঙ্কের টাকায় তাদের দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন তিনি।

এদিকে ওই ঘটনার পর রোববার যুব মহিলা লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয় পাপিয়াকে। যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক উপু উকিল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এতথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ২২(ক) উপধারা অনুযায়ী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হলো। এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।

যৌন বাণিজ্যসহ নানা অনৈতকর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শনিবার শামীমা নূর পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। আজ তার বাসা থেকে বিপুল পরিমান টাকা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে। জাল টাকা রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বিমানবন্দর থানায়। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাপিয়ার নানা অপকর্মের কাহিনী এরইমধ্যে বেরিয়ে পড়েছে।

তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন। এক সময় নরসিংদী জেলার ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। রাজনীতিতে প্রয়াত মেয়র লোকমানের অনুসারী ছিলেন তিনি। হত্যার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দলীয় পদপদবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা আর ব্লাকমেইলিং- এই তিনে মিলে অপরাধ স¤্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই দম্পতি। সমাজ সেবার আড়ালে দেহব্যবসা, গোপন ভিডিও ধারণ করে প্রভাবশালীদের ব্লাকমেইলিং, অস্ত্র-মদের ব্যবসা, জাল টাকা- এসব করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন পাপিয়া।

চলাফেরায় ছিলো রাজকীয় ভাব। বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। ঢাকায় রয়েছে অভিজাত ফ্ল্যাট। নিজ জেলা নরসিংদী গেলে মোটসাইকেল মহড়া দিয়ে স্বাগত জানাতো তাদের পোষা বাহিনী। এসব মোটরসাইকেলও সরবরাহ করেছেন পাপিয়া। ফাইভস্টার হোটেল থেকে শুরু করে নিজ এলাকাতেও খুলেছিলেন দেহব্যবসালয়। তাদের অবৈধ এসব ব্যবসা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রসার লাভ করে।

পাপিয়া নিজেকে পরিচয় দিতেন ক্ষমতার রাঘববোয়ালদের কর্মী হিসেবে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়ে নেতাদের ফুল দিয়ে সেই ছবিরও অপব্যবহার করতেন। তিনি নিজেকে কেন্দ্রীয় নেত্রী হিসেবেও পরিচয় দিতেন। পাপিয়া পাঁচ তারকা হোটেলে নারী ও মাদক ব্যবসা চালাতেন। এগুলোই তার আয়ের মূল উৎস। দেশের অভিজাত কিছু মানুষ ও বিদেশিরা এর গ্রাহক। ইন্টারনেটে স্কট সার্ভিস খুলে বসে খদ্দেরদের কাছে তাদের চাহিদামতো সুন্দরী তরুণী পাঠাতেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষিত সুন্দরী তরুণীদের সংগ্রহ করতেন। একপর্যায়ে তাদেরকে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য করতেন পাপিয়া। এরই মধ্যে পাপিয়ার কাছ থেকে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত অনেক ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা হয়েছে। গোপন ক্যামেরায় মেয়েদের ছবি ধারণ করে তাদের নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেইল করতেন তিনি।

পুলিশ ও র‌্যাব জানায়, তার সঙ্গে নিয়মিত বেশ কয়েকজন নেতা যোগাযোগ রাখতেন। পাপিয়া জানিয়েছেন তারা তাকে শেল্টার দিতেন। কোন কারণে অকারণে ফোন করলে নানাবিধ সাহায্য করতেন ওই নেতারা। এর বিনিময়ে পাপিয়া মাসোহারা দিতেন। তারা তাদের সুবিধাও আদায় করে নিতেন বলে জানিয়েছেন পাপিয়া।

ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।