ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের দিনলিপি ও অনলাইন পাঠদান


Published: 2020-07-01 16:25:20 BdST, Updated: 2020-08-08 13:01:20 BdST

আর এস মাহমুদ হাসান, বশেমুরবিপ্রবিঃ মহামারী করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশেও সংক্রমনের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সংক্রমনের ঝুঁকি এড়াতে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ পরিস্থিতিতে কেমন কাটছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের ঘরবন্দী জীবন? তারা তাদের নানান অসুবিধা, সেশনজট সমস্যা, অনলাইন ক্লাস ও প্রিয় ক্যাম্পাসের মধুর স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন ক্যাম্পাসলাইভের সাথে।


রাজিব বেপারি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ, ঢাকা কলেজ:

রাজিব বেপারি

 

একটি অনুজীবের সংক্রমনে থমকে গেছে পুরো পৃথিবী। গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে প্রতিটি মানুষ। তবে জীবিকার তাগিদে ছুটে চলতে হচ্ছে আমাদের অনেক যোদ্ধাদের। যখন প্রিয়জনের খবর পাই করোনা পজেটিভ, তখন বুকের ভিতর শুরু হয় রক্ত ক্ষরণ। ভয়ে ভয়ে কাটছে আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত।

এই ভয়ংকর সময়ে যেনো ঢাকা কলেজের ছাত্ররা পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে, তার জন্যে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে আমাদের কলেজের অনেক বিভাগ অনলাইন ক্লাস চালু করেছেন। বাকি বিভাগের অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আমরা ৭ কলেজর ছাত্র-ছাত্রীরা এমনিতে শেসনজটে পড়ে আছি। এই মহামারি আমাদের শেসনজট আরো অনেকটা বাড়িয়ে দিল। পড়াশোনার যে ক্ষতি হচ্ছে তা পুষিয়ে নিতে ৭ কলেজের আলাদা প্রশাসনিক ভবন তৈরি করতে হবে এবং এই প্রশাসনিক থেকেই ৭ কলেজ সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা করতে হবে। যথা সময়ে পরীক্ষা নিতে হবে।

কলেজ বন্ধ থাকার কারণে দেখা হয়না অনেক বন্ধুদের সাথে। আড্ডা দেওয়া হয়না পুকুর পাড়ে কিংবা টেনিস গ্রাউন্ডে। খাওয়া হয়না রাজ্জাক মামার টং দোকানের চা। এখন আর মধ্যে রাতে ভেসে আসে না বেসুরা গলায় গাওয়া গানের ধ্বনি। সবই যেনো কেড়ে নিয়েছে নভেল করনা ভাইরাস। একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে পৃথিবী, থাকবেনা কোন ভয়। সেই ভোরের অপেক্ষায় আমরা সবাই।

মুনতা হেনা মিম, ইতিহাস বিভাগ, তৃতীয় বর্ষ, ইডেন মহিলা কলেজ:

মুনতা হেনা মিম

 

করোনাকালে এই সময়টা আসলেই অনেক বোরিং যাচ্ছে। তবে কিছু গল্পের বই, ইসলামিক বই পড়ে সময় কাটাচ্ছি। যদিও আমাদের অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে তারপরও সেশনজট নিয়ে ভাবনায় আছি।

কারণ আমাদের একাডেমিক কার্যক্রম অনেক স্লো, টেস্ট পরীক্ষার পর ৫-৬ মাস বসে থাকতে হয় ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। তারপর রেজাল্টের জন্য ৩-৪ মাসের অপেক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমরা প্রতি ইয়ারে ৬-৭ মাসের সেশনজটে পড়েছি। যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। আর আমাদের ইয়ার সিস্টেমই চলছে যদিও আমাদের পরের সেশনের(১৭-১৮) শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার সিস্টেম। এর ফলে ওরা মোটামুটি ৬ মাসের মধ্যে সেমিস্টার শেষ করতে পারছে।

তবে ক্যাম্পাস খুললে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যাবস্থা করলে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে ওঠা সম্ভব। ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়টা অনেক মিস করছি, হলের সামনে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, আয়েশা সিদ্দিকা হলের খিচুড়ি আর চা অনেক মিস করছি।

রিয়াদ হোসেন শেখ, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, ৩য় বর্ষ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ:

রিয়াদ হোসেন শেখ

 

বর্তমান এই করোনাকালীন সময়ে চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব বাসায় থাকার, খুব দরকার না হলে বাইরে বের হইনা। আমরা বাইরে সময় কাটানোতে বেশি অভ্যস্ত। হঠাৎ করে এই ঘর বন্দী ভালো না লাগলেও থাকতে হচ্ছে।

আমাদের অনলাইনে কোন ক্লাস হচ্ছে না তবে শুনেছিলাম ক্লাস শুরু হবে কিন্তু পরবর্তীতে কোন নির্দেশনা পাইনি। সেশনজট আমাদের তো আগে থেকে লেগেই আছে এর মধ্যে এই করোনা আরও দীর্ঘ করল সেইটা। যেহেতু আমাদের এখন অবধি অনলাইনে কোন ক্লাস হয়নি। তাই ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্যাম্পাস খোলার পর আমাদের রেগুলার ক্লাস নিলে এবং প্রয়োজনে ছুটির দিনেও ক্লাস নিয়ে সেশন জটের ধকল সামলানো যাবে বলে আমি মনে করি।

ক্যাম্পাসে ভাই-বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মামার দোকানে চায়ের আড্ডা, ঝাল মুড়ি-ফুচকার আড্ডা আর বিশেষ করে একসাথে জন্মদিন পালন এইগুলা খুব বেশি মিস করি।

মেহের আফরোজ, গনিত বিভাগ, চতুর্থ বর্ষ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ:

মেহের আফরোজ

 

যেহেতু করোনার বর্তমান পরিস্থিতি খুবই খারাপ তাই বাসার বাহিরে সেরকম বের হচ্ছি না। যদিও কখনো খুব প্রয়োজন বাহিরে যাই তখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাহিরে বের হই। সারাদিন বাসায় থাকি মাকে রান্নার কাজে, ঘর গোছানোর কাজে সাহায্য করি।

যেহেতু ক্যাম্পাস খোলা কালীন সময়ে পরিবারের সাথে সেরকম সময় কাটাতে পারিনা তাই এই সময়টাকে পরিবারের সাথে খুব আনন্দে কাটানোর চেষ্টা করছি। বই পড়তে খুব ভালো লাগে নানা ধরনের গল্পের বই পড়ছি, চাকুরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি ,অবসর সময়ে মুভি দেখে পরিবারের সাথে আড্ডা দিয়ে সময়টাকে পার করার চেষ্টা করছি।

জানিনা আবার কবে এই পরিস্থিতি ঠিক হবে । আবার দেখা হবে প্রিয় ক্যাম্পাসটি কে। করোনা কালীন সময়ে খুব মনে পড়ছে আমাদের সেইসআকাশ লীনা রিডিং রুমে বসে পড়াশোনা করা সময় গুলো, বান্ধবীদের সাথে ঘোরা, ক্যাম্পাসে ক্যান্টিনে বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেওয়া এই সময়গুলোকে সত্যি খুব বেশি মিস করছি।

এই সংকটকালীন সময়ে ১৭ ই মার্চ থেকে ক্যাম্পাস বন্ধের পর এখনো পর্যন্ত আমাদের অনলাইন ক্লাসের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। যেহেতু আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ কলেজের শিক্ষার্থী এমনিতেই সেশন জটের চিন্তা আগে থেকেই ছিল এই পরিস্থিতিতে এখন যেন চিন্তাটা আরো বেড়ে গিয়েছে।

তবে আমরা যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে এবং সিলেবাস কমিয়ে যথাযথ ক্লাস এবং পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সেশনজট কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

আলামিন, সমাজ কর্ম বিভাগ, প্রথম বর্ষ, সরকারি তিতুমীর কলেজ:

আলামিন

 

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর এই সংকটকালীন সময়ের প্রথমদিকে খুব আতঙ্কিত ও বোরিং সময় কাটলেও সময়টা যেহেতু দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে তাই এখন চেষ্টা করছি কোন বিষয়ে নিজের স্কিল বাড়ানোর পাশাপাশি পারিবারিক কাজে সাহায্য করতে।

ছাত্ররা যাতে পড়ালেখায় পিছিয়ে না পড়ে সেজন্য আমাদের সরকারি তিতুমীর কলেজের অনলাইনে ক্লাস (২৭জুন থেকে) শুরু হয়েছে। সেশনজট নিয়ে বরাবরই সাত কলেজের মধ্যে সমস্যা হয়ে থাকে। এবার যেহেতু পুরো পৃথিবী জুড়েই করোনা ভাইরাস মহামারী রুপ ধারণ করছে, সেক্ষেত্রে সেশনজট হওয়াটা স্বাভাবিক। আমাদের সাত কলেজ যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সেক্ষেত্রে আশা করা যায়, সেশনজট এড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করবে।

রুপা, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, প্রথম বর্ষ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ:

রুপা

 

এই সময়ে পরিবারের সাথে ভালোভাবে সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। যেসব কাজগুলো আগে ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারতাম না, সেগুলো এখন সুন্দর ভাবে করার সুযোগ পাচ্ছি। আমি এখন ড্রইং এ মনোযোগী হয়েছি, এছাড়াও মুভি দেখে ও বই পড়ে সময় কাটায়।

আমাদের অনলাইনে ক্লাস চলছে। সকল শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে অনলাইনে ক্লাসগুলো রেকর্ড করে কলেজের নিজস্ব পেজে দেয়া হচ্ছে। সেশনজট থেকে মুক্তি পেতে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ছাত্রদের অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হতে হবে বলে আমি মনে করি। তাহলে ক্যাম্পাস খুললে দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে সেশনজট থেকে পরিত্রান পাওয়া যাবে।

ক্যাম্পাসের মাঠে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম, সময় পেলে কোথাও ঘুরতে যেতাম, খেতে যেতাম। কিন্তু লকডাউনের কারণে এখন আর বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়না, ক্যাম্পাসের সে দিনগুলো বড্ড মিস করছি।

কে. এম বায়েজিদ বোস্তামী, ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, প্রথম বর্ষ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ:

কে. এম বায়েজিদ বোস্তামী

 

করোনাকালীন সময়ে বাড়িতে এসে মা বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কাজে সাহায্য আর তাদের সেবা-যত্ন করছি। এলাকার বন্ধুদের সাথে আড্ডাও চলছে জম্পেশ। তবে খুব বেশি মিস করছি ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারের পাদদেশে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, কলেজের সামনে মিজান মামার দোকানের এক কাপ চা সাথে বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন গল্প।

সংকটকালীন মুহূর্তে পড়ালেখার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক বিভাগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতের ভিত্তিতে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে। আমার ডিপার্টমেন্টেও এমন কথা চলছে কারণ সেশনজট ঠেকাতে এমন পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও সেশনজট কমানো যাবে।

তবে সবকিছু স্বাভাবিক হলে পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সপ্তহের ৬ দিন আমরা ক্লাস করতে পারি। যেটা আমাদের জন্য উপকারী হবে বলে মনে করি।

ঢাকা, ০১ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।