কিভাবে কাটছে নজরুল কলেজ শিক্ষার্থীদের করোনার দিনগুলো


Published: 2020-07-05 13:22:34 BdST, Updated: 2020-08-12 07:45:33 BdST

করোনাভাইরাস এক আতঙ্কের নাম। এই ভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ব। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। এই ভাইরাসের জন্য সরকার বন্ধ ঘোষণা করেছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর কবি নজরুল সরকারি কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ দিয়েছে কলেজ প্রশাসন। কবে খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সংকটকালীন মুহূর্তে কিভাবে কাটাচ্ছে কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা? তারই উত্তর পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন কেএনজিসি প্রতিবেদক ইমরান হোসেন

ফাতেমা আফরোজ রাতিশা অনার্স ১ম বর্ষ প্রাণিবিদ্যা বিভাগ:

ছুটির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলে হয়তো এতটা একঘেয়েমি লাগতো না। অনির্দিষ্টকালের এই ছুটি অপেক্ষার প্রহর গুনে কাটছে। ক্যাম্পাসের রঙিন দিনগুলো ছেড়ে এখন অনেকটা মনমরা ভাবেই সময় কাটায়। মায়াভরা নতুন ক্যাম্পাস, নতুন বন্ধু-বান্ধবী সবকিছু এখন খুব মিস করি। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, ঘুরতে যাওয়ার দিনগুলো খুব মনে পড়ে। ছুটির এই দিনগুলো এখন পরিবারের সাথেই সময় কাটছে আমার। গল্প, উপন্যাসের বই পড়েই অধিকাংশ সময় পার হয়ে যাই। মাঝেমধ্যে লিখালিখি করি। বাকি সময়টা টিভি দেখে, ছোট ভাইবোনদের সাথেই কেটে যাচ্ছে।

সময়গুলো এখন অন্যরকম ভাবেই কাটছে। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা যেভাবে বেড়ে চলেছে এখন শুধু প্রত্যাশা আমরা সবাই যেন সুস্থ থাকি।ক্যাম্পাসটা আবার আগের মতো কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠুক। আবার সেই পরিচিত মানুষের ভীড়ে হারাতে চাই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রাণের ক্যাম্পাসে আবার দেখা হবে প্রিয় মানুষগুলোর সাথে। সবাই যেন ভালো থাকি সুস্থ থাকি।

মেহেদী হাসান অনার্স ৩য় বর্ষ বাংলা বিভাগ:

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি বিষয় করোনাভাইরাস। এই মহামারীর সমসাময়িক চরিত্র যুদ্ধক্ষেত্রের জীবনযাপনের মতোই, তদুপরি তার চেয়েও কঠিনতম হিসেবেই প্রকাশ পাচ্ছে।কলেজের ব্যস্ততা নেই, যেই ব্যস্ততা নেশায় পরিণত হয়েছে কালের ধারাবাহিকতায়। ক্যাম্পাস ছাড়া নিজেকে বোঝা মনে হয়, কোনো কর্ম নেই দেহ অসার লাগে এমন।

মানসিক চাপ বড্ড বেশি। নেই সেই পুরনো কোলাহল, নেই সহপাঠীদের সাথে তেমন যোগাযোগ, আড্ডা নেই, নেই গল্প, গান কিছু নেই। সবকিছু যেন রঙ হারিয়ে সদা খুঁজে ফেরে প্রাণচাঞ্চল্যকে। ঘরে বসে সময় কাটাতে মোবাইল, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রিয় মানুষগুলোর খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু "দুধের সাধ কি ঘোলে মেটে! "তবুও মেটাচ্ছি নিরুপায় তাই, ওই যে বললাম বারবার - এটা তো যুদ্ধ! স্রষ্টাকে স্মরণ, প্রার্থনা, হালকা বই পড়া সহ নানা করজ করে কাটাচ্ছি। এছাড়াও যতটা সম্ভব এই করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের পাশে থেকে কিছু কাজও করছি।

ফাহিম হোসেন অনার্স ৩য় বর্ষ রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ:

বন্ধু বান্ধব সে যেন ছাত্র জীবনের এক মহামুল্যবান উপহার। যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি জীবনের কার্যক্রম দ্বারা অর্জন করা হয়। করোনার কারণে এখন আমরা একটি কঠিন সময় পার করছি। জীবনে প্রথম বারের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্ধু, বান্ধব ও সহপাঠীদের অভাব বুঝতে পারছি। আজ জীবন থেমে গেছে, নেই তার কোন রস, নেই কোন আনন্দ, নেই কোন আবেগ, নেই কোন আড্ডা, হারিয়ে গেছে সে প্রেম।

আর মনে পড়ে কলেজের মাঠের সিঁড়ি গুলো দাড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের অপরূপ সৌন্দর্য , , শহিদ মিনার ও মাঠের কোনায় বসে বন্ধুদের সাথে সেই আড্ডা। আজ মন বিষন্ন, মনে নেই কোন আবেগ, সে হারিয়ে ফেলেছে তার চিরচেনা রুপ। সে আজ শুধুই কিছু বোকা বাক্সে বন্দি। ছাত্রজীবনে পারিবারিক টান থাকে সামান্য সময়ের জন্য, কিছুদিন গেলেই ক্যাম্পাস আর বন্ধুদের জন্য মন কাঁদে, ফিরে যেতে মনে চায় সেই কারখানায় যেটা আমাদের প্রস্তুত করছে আগামীর জন্য।

রাত দিন ছোটাছুটি ক্লাস,পরিক্ষা,আড্ডাবাজি, ঘোরাঘুরি, একসাথে খাওয়াদাওয়াই তখন ছিল প্রতিদিনের রুটিন। আর আজ তা রাতের আধারের মত অদৃশ্য, কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে গেছে তার রুপ তার কোলাহল। আজ করোনার অতঙ্কে আমরা আতঙ্কিত, জীবনকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আজ আমরা গৃহবন্দী। আর বন্ধুদের সাথে ভালো মন্দ খোজ রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। যা ব্যবহার করেই কাটছে এই দিনগুলো।

সুমাইয়া মিতু ২য় বর্ষ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ:

ছুটি বরাবরই আনন্দের হয়, কিন্তু এবারের ছুটিটা আকস্মিক। ক্যাম্পাস, বন্ধু ছাড়া একঘেয়েমি সময় কাটছে। পরিবারের সাথে থাকলেও চিন্তামুক্ত হতে পারছি না। কারণটা সবারই জানা। পরিবারের সাথে থেকে পরিস্থিতি কে সামাল দিচ্ছি, যতটুকু সম্ভব সচেতন করছি সবাইকে। একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি,বাবাকে বিশেষ প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হয়।

তিনি ঘরে আসা মাত্রই আমি হাত ধুতে বলি, সে নিজেও খেয়াল করে চলে। কিন্তু বেশ কয়েকদিন দেখছি তাকে বার বার বলতে হয়, জোর করতে হয় হাত ধুতে, তার মধ্যে আলসেমি কাজ করে, আমারও ভীষণ রাগ হয়। একবার ভাবি, তাকে আর বলবো না কিছু। কিন্তু ভেবে দেখি এতে আমাদের সবারই ক্ষতি, তাই রাগ করা যাবেনা। সবাইকে সবার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

একা থাকলে ভাবনা আসে, হয়ত একদিন সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে করোনার হাত থেকে রক্ষা করবেন, সময়টা স্বাভাবিক হবে, কেমন হবে সেই দিনটি? হয়তো সেদিন বাসা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বের হবো। মনে এক অদ্ভুত ভয় কাজ করবে, আনন্দ কাজ করবে, কখন, কখন পৌছাব, কখন দেখব সবাইকে। সেই লাল বাস, সেইসব স্মৃতি ঘেরা স্থান, বন্ধু, শিক্ষক। ক্যাম্পাসটা না হয় অনেক ছোট, কিন্তু পুরোটাই ভালবাসায় ঘেরা।

জাহিদ হাসান শোভন ৩য় বর্ষ, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ:

প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানো, বিশ্রাম আর হরেক রকমের খাবার তবুও অতিষ্ঠ লাগছে হোম কোয়ারান্টাইনের এই বন্দি জীবন। ফিরতে চাই আমার আপন পরিসরে, বাঁচতে চাই নিজের মতো করে। আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা জায়গাগুলো ক্যাম্পাস, এ ভবন, বি ভবন সি ভবন, বার বার চোখে ভেসে উঠছে।

বন্ধু বান্ধব, ভাই ব্রাদার্স নিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্ক, টিএসসিতে বসতে চাই আবার চায়ের আড্ডায়। না খেয়ে, ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর নিয়ে তবু আমি সুখি ছিলাম সেখানে, কারণ বন্দি তো আর ছিলাম না, মেনে নিতে পারি শত কষ্ট তবুও বন্দির শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে চাই না। তাই একাকিত্বকে সঙ্গে নিয়ে, হোম কোয়ারান্টাইনে থেকে নিজের বাড়ির সামনে ফাকা জায়গায় সবজির বাগান ও ফলের বাগান করেছি।

নোমান হোসেন অনার্স ৩র্থ বর্ষ প্রাণিবিদ্যা বিভাগ:

কলেজ বন্ধ থাকায় বাসায় এক রকম অলস সময়ই কাটাতে হচ্ছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গ্রামের বাড়িতে এসেছি। টানা ৩ মাস হলো ক্যাম্পাসে যাই না। আবার কবে ক্যাম্পাসে যেতে পারবো তারও ঠিক নেই। অথচ এ সময়টাতে ক্লাস, পরীক্ষা বন্ধুদের সাথে আড্ডা গানে মেতে থাকার কথা ছিল।

টিএসসিতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প করার কথা ছিল কিংবা কলেজের বাসের গেটে দাঁড়িয়ে প্রাণ খুলে গান গাওয়ার কথা ছিল। জানি না আবার কবে এইগুলো করতে ঠিক হয়ে যাক। ক্যাম্পাস আবার প্রাণ ফিরে পাক। সবাই সচেতন হলে খুব তাড়াতাড়ি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আনা সম্ভব। অন্যকে দোষ না দিয়ে নিজে সচেতন হোন অন্যকে সচেতন করুন। ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন।

সাদিয়া আলম তৃষা অনার্স ১ম বর্ষ দর্শন বিভাগ:

পৃথিবীর প্রত্যকটি প্রাণীই পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে চলে। মানুষও সংঘবদ্ধ সামাজিক প্রাণী। এরিস্টটল বলেছেন, "যে সমাজে বাস করেনা, সে হয় দেবতা না হয় পশু।" আমরাও পরিবার ছেড়ে কলেজে একটি পরিবেশের সাথে খাপখায়িয়ে বা মানিয়ে নিয়েছি। এখানে আছে যেমন দুঃখ-কষ্ট আবার আছে আনন্দোৎসব।

ক্যাম্পাসে আমাদের নিত্যকর্ম আমাদের স্বভাবে দাড়িয়ে যায়। করোনাতে বাড়ি এসে ক্যাম্পাসেরর দিনগুলো খুব মিস করছি। মিস করছি প্রতিদিনের ব্যস্ত রুটিনকে। আর সবচেয়ে বেশি মিস করি মনের অজান্তে মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নেওয়া বন্ধুদের। মনে হচ্ছে একটা পরিবার ছেড়ে চলে এসেছি। এই ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতি আসলে কারোই ভালো লাগার কথা না। আমিও এর ব্যতিক্রমী নই।

তবুও এই পরিস্থিতি মেনে নিয়ে মা- বাবা, ভাই- বোনদের সাথে আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি। বাড়িতে অবসর সময় কাটছে। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছি। মায়ের কাজে সহযোগিতা করছি। বেশির ভাগ সময় কাটে বই পড়ে। পাশাপাশি ছোট ভাই- বোনকে সময় দিয়েই কেটে যাচ্ছে দিন গুলো। একদিন এই আধার কেটে যাবে। নতুন সূর্য উদিত হবে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধি নিয়ে। সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।

আব্দুর রহমান অনার্স ৪র্থ বর্ষ ব্যবস্থাপনা বিভাগ:

গ্রীষ্মেকালে যখন চারিদিকে প্রচুর রৌদ্রতাপ বিরাজ করে তখন প্রত্যেকে এক পশলা বৃষ্টির আশা করে। যেনো প্রকৃতি আবার তার নিজের সতেজ রুপ ফিরে পায়। কিন্তু তাই বলে এটা নয় যে এক পশলা বৃষ্টির পরিবর্তে সেই বৃষ্টিই কাল রূপ ধারন করে প্রকৃতিকে ভাসিয়ে দেবে। তেমনি ছাত্রজীবনে পড়াশোনা, ক্যাম্পাস, টিউশনি আড্ডাবাজির মধ্যে ২/৪ দিনের ছুটে পাওয়া মানেই প্রিয়জনদের সাথে বাড়িতে ছুটে যাওয়া। ঠিক সেভাবেই বাড়িতে এসেছিলাম প্রিয়জনদের সাথে দেখা করতে। সাথে সাথেই দেশে আঘাত হানলো করোনার ভয়াবহ থাবা।

সবাইকে সুরক্ষা ও নিরাপদ রাখার জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ হলো। তারপর ভয়াল থাবায় করোনায় দেশের অবস্থা দিনে দিনে আরো খারাপ হতেই আছে। প্রতিদিনেই বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সাথে মৃত্যুর মিছিল। জানিনা এর শেষ কোথায়।

কিন্তু এভাবে চিরচেনা সেই বিদ্যাপিঠ আর ভালোবাসায় রঙানো বন্ধু-বান্ধব, বড় ভাইবোন, ছোটভাইবোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা চায়ের দোকানের আড্ডা সব কিছু আজ চরম ভাবে মিস করছি।যেখানে আমাদের বিচরণ ছিলো অবিরত। কিন্তু আজ ঘরে বসে এই সোনালী অতীত মনে করা ছাড়া আর কিছুই করার নাই আমাদের। আমাদের সমাজের মানুষের অসচেতনতার কারনে করোনা আরও ভয়াবহ রুপ ধারন করছে।

প্রতিক্ষনেই একটা ভয় হৃদয়কে কুরে খায় আর তা হলো প্রিয়জনদের,সাথে আবার দেখা হবে কিনা! কিংবা প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে আবার সবাইকে পাবো কিনা! আবার সেই রঙিন,উৎসব মুখর দিন ফিরে পাবো কিনা। বাড়িতে এইভাবে আর কতদিন থাকা যায় তবুও সুদিনের অপেক্ষায় দিন গুনছি। এই কামনায় করি সারাক্ষণ পৃথিবী দ্রুত সুস্থ হোক। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক।

ঢাকা, ০৫ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।