বিশ্ব নেতাদের তাচ্ছিল্যে তলে তলে করোনা এতদূর!


Published: 2020-04-04 15:58:52 BdST, Updated: 2020-05-31 20:26:03 BdST

শফিকুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলামঃ করোনা বিশ্বে এক আতঙ্ক ও সারি সারি মৃত লাশের কারণ। করোনায় মৃত্যুতে মানুষ তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মৃতদেহ থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। এটি খুবই ছোঁয়াচে। তবুও করোনা নিয়ে নানা সমালোচনা বিশ্বে বিরাজমান। যেমন, চীন বলছে করোনা যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক কৌশল ও জৈব অস্ত্র। আর যুক্তরাষ্ট্র মনে করে এটি চীনের তৈরি। কারণ ভাইরাসটির উৎপত্তি চীনের উহানে।

অন্যদিকে এটা নিয়ে ইরান গবেষণা করছে এটা জৈব অস্ত্র কিনা। ইতালির এক ডাক্তারের দাবি চীনের আগে তাঁর দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি যুক্তিও দেখিয়েছেন। চীনের উহানের আগে ইতালির লুম্বার্ডিতে করোনা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। তখন এই মহামারীর বিষয়ে তিনি ও একদল চিকিৎসক সরকারকে সতর্ক করেছিল। তাদের সর্তক বার্তা হালে পানি পায়নি। তার খেসারত ইতালিকে দিতে হচ্ছে।

ইতালির এই চিকিৎসকের কথা নতুন বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে ইতালি প্রথম করোনা সংক্রমণের ঘটনা ভালভাবে মোকাবেলা করেছিল। তুরস্ক দাবি করেছে ১৪ ফেব্রুয়ারি, মিলান থেকে ৬০ কিলিমিটার দূরে কডোনা শহরে এক বাসিন্দা হাসপাতালে ভর্তির পর তখনও প্রয়োজনীয় সতর্কমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ঐ রোগীর মাধ্যমে হাসপাতালের কর্মীসহ পুরো গ্রামবাসী করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

এছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন যদি আগে ভাগেই সতর্ক করত বা তথ্য গোপন না করত আজকে বিশ্বে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না। এর মানে তিনি চীনকে সরাসরি দায়ী করছেন। ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের কথায় ক্রমাগত অভিযোগের সুর। তাঁর দেশকে বিপন্ন করছে বাইরের দেশ থেকে আসা ভাইরাস। কিছু দিন আগে তিনি করোনা নিয়ে হাসাহাসি করতেন। দ্রুত ছড়ানো ভাইরাসকে পাত্তা দেননি, নাম দিয়েছিলেন ফরেন ভাইরাস। তিনি পরিস্কার বলে দিয়েছেন যে বা যারা করোনা ছেড়েছে, আমেরিকা ঠিক সময় এর জবাব দিবে। কারণ তিনি মনে করেন কোন চক্রান্ত ছাড়া তাঁদের দেশ বিপদে পড়তে পারে, এটা তাঁরা বিশ্বাস করে না। আর এখন তিনটি রাজ্যসহ অনেক প্রতিষ্ঠান লকডাউন করে।

আবার ভারতীয় এক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে চীনে করোনা ভাইরাসে এক কোটি লোক মারা গিয়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্য অনুসারে ০৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে করোনায় চীনে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৩৩২৬।

ডবি্লউএইচও শুধু ব্রিফ করছে, জোরালো কোন কর্মসূচি দেখছি না। এমনকি জাতসংঘ একটি বড় প্ল্যাটফর্ম, এর কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। করোনা মোকাবেলায় জাতিসংঘের আরও কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। এখন করোনার কেন্দ্রস্থল যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, ইরান। করোনার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। আমরা মনে করি ভবিষ্যতে করোনা উল্লেখিত দেশে মারাত্মক দিকে যাবে ।

যুক্তরাষ্ট্রে জানুয়ারী মাসে প্রথম ধরা পড়ে করোনা ভাইরাস। মার্চে এসে ট্র্যাম্প বলেন করোনা ভাইরাস একটি মৌসুমি রোগ। এটা কি বলতে পারে একটি উন্নত দেশের প্রেসিডেন্ট? ঢাকা ও নিউইয়র্ক এর মানুষের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই, এদিকে উভয় শহর ঘনবসতিপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে নিউইয়র্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে অনেক দেশের লোক আসা যাওয়া করে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ দিন আগে করোনায় আক্রান্ত ছিল ১০৫৫জন। ০৪ এপ্রিল ২০২০ তা এসে দাঁড়ায় ২,৭৭,৪৬৭ এবং মৃত ৭,৪০২ জন। নিউইয়র্কে ২০ দিন আগে করোনায় আক্রান্ত ছিল ২৯৮ জন, এখন আক্রান্ত ১০২৮৭০, মৃত প্রায় ২৯৮৫ জন। নিউইয়র্কে দূর্ভাগ্যবশত সুস্থ হওয়ার সংখ্যা কম। ওয়াশিংটনে এখন আক্রান্ত ৬৬৬৯ জন, মৃত ২৭৯ জন।

কিন্তু অন্যান্য দেশে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা অনেক। ২৮ মার্চ ২০২০ তারিখে পরিসংখ্যান অনুসারে অন্যোন্য দেশে করোনায় আক্রান্ত লোকের বয়স ৬০-৭০ এর মধ্যে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি প্রদেশে ২০-৩০ বয়সের মানুষ করোনায় বেশি আক্রান্ত। সংখ্যা হল ২৬০। যা অন্য বয়সের তুলনায় বেশি। এর কারণ হল যুবকদের অবহেলা।

যুক্তরাষ্ট্রে শুধু তিনটি স্টেট যেমন ওয়াশিংটন, ক্যালেফোনিয়া, নিউইয়র্ক লক ডাউন করেছে, লক ডাউন করলেও হবে না, বাকি সব স্টেট বন্ধ করা উচিত। শুরুতে লোকজন রাস্তায় আড্ডা দিয়েছে, ক্লাবে গিয়েছে, এই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আজ আতঙ্কের কারণ। আমরা মনে করি যুক্তরাষ্ট্র এ সাধারণ নাগরিকের সচেতনতার ঘাটতি ছিল, বিদেশি নাগরিক স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে। অলমার্টে প্রবেশের সময় স্যানিটাইজার, এন্টি-ভাইরাল টিস্যু রয়েছে, তারপরও অনেকেরকে তা ব্যবহার না করে ভিতরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।

কানাডা বেশ সতর্ক ছিল, এজন্য আক্রান্তের সংখ্যা কম। যেখানে বেশি সংক্রমণের আশংকা ছিল। কারণ এ ভাইরাস ঠান্ডায় বেশি ছড়ায়, বিশেষজ্ঞদের মতে। ইতালি প্রথম দিকে অবহেলা করেছে তাঁর খেসারত দিচ্ছে পুরো দেশ ও দেশের লোক। দিন দিন মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলছে। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মত ইতালি সাবধান হলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কম হত।

বাংলাদেশ সরকারের করোনা মোকাবেলায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, কেউ কেউ মনে করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানুয়ারিতে করোনা নিয়ে আগাম ব্যবস্থাপনা ও কৌশলের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তখন আঁচ করতে পারেনি যে করোনা এত মারাত্মক রূপ ধারণ করবে। কিন্তু বর্তমানে যে উদ্যোগ নিয়েছে এটা অবশ্য ভালো। এটা আরও পূর্বে নিলে খুবই ভালো হত। তাই আইইডিসিআরসহ সবাইকে অধিকতর সতর্কতার সাথে অন্যোন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিয়ে সমন্বয় করে করোনা মোকাবেলায় কাজ করতে হবে।

বিশ্ব নেতারা এখনও বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছে। যেমন মেক্সিকান গভর্নর মনে করছে, গরিব লোকেরা করোনায় আক্রান্ত হবে না। বর্তমানে ১০০০ বা ১০০০ এর বেশি করোনায় আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ৫৬টি। মোট আক্রান্ত দেশ ২০৫ সুতরাং বাকি ১৪৯ দেশের নেতারা এখনই যদি হার্ড লাইনে যায়, তাহলে মহামারী থেকে কিছুটা হলে বিশ্ব রক্ষা পাবে। বিশ্বে স্বস্তি ফিরে আসবে। তাঁরা ভার্চুয়াল সভা করে সমন্বিত বা আঞ্চলিক পদক্ষেপ নিতে পারে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সার্কভুক্ত দেশ ভার্চুয়াল সভা করে নেওয়া পদক্ষেপ খুবই ভালো উদ্যোগ ছিল।

কিছু দেশের চীন বিদ্বেষী মনোভাবই আজকের করোনা পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কারণ যখন চীন বিপদে পড়ছে, তখন অন্য বড় দেশ বা নেতারা চীনকে সহযোগিতা করেনি। বরং চীনকে নিয়ে সমালোচনা করেছে। চীনে করোনা ভাইরাসে লোক আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর তেমন কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। বরং অনেক দেশ তখন অর্থনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। করোনা মহামারী রূপ ধারণ করার পিছনে বহুবিধ কারণ থাকতে পারে। আমরা মনে করি বিশ্ব নেতাদের দূরদর্শিতা একটা বিশেষ কারণ।

সকল বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের করোনা মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। তাঁরাও সব শিক্ষার্থীদেরকে সচেতন করে করোনার ঝুঁকি কমাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বাকি আক্রান্ত দেশগুলো চীন ও জাপানের ন্যায় ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেহেতু চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া করোনা মোকাবেলায় সফল হয়েছে। তাই সকল দেশকে ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে সমন্বিত নীতিমাল ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই করোনা থেকে বিশ্ব মুক্তি পাবে। যদিও বর্তমানে আশার আলো হল, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একসাথে করোনা মোকাবেলা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এটা কিছুটা হলেও স্বস্তির খবর।

লেখক: ১. মো: শফিকুল ইসলাম

পিএইচডি ফেলো, জংনান ইউনির্ভাসিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ল, উহান, চীন ও 

শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মেনসিংহ।

লেখক: ২. মো: আমিনুল ইসলাম

পিএইচডি ফেলো, টেনেসি টেকনোলোজিকাল ইউনির্ভাসিটি, টেনেসি, যুক্তরাষ্ট্র ও 

শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

ঢাকা, ০৪ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।