সমাজের নতুন আতঙ্কের নাম আত্মহত্যা


Published: 2021-01-03 15:24:04 BdST, Updated: 2021-01-25 19:22:47 BdST

আরোশি আঁখিঃ কোভিড ১৯ এর সাথে যুক্ত হলো নতুন আতঙ্ক হিসেবে আত্মহত্যা বা আত্মহনন যাকে ইংরেজিতে আমরা সুইসাইড বলে থাকি। যখন একজন ব্যাক্তি স্বেচ্ছায় নিজের জীবন বিসর্জন দেয় অর্থ্যাৎ নিজেই নিজের মৃত্যু ঘটাতে আত্মহনন করে তাকে আত্মহত্যা বলা হয়। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেই ডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটির আগমন যার অর্থ নিজেকে হত্যা করা।

প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার হার বেশি। একটি পরিসংখ্যান এ দেখা যাচ্ছে নারীদের তুলনায় পুরুষদের আত্মহত্যার প্রবণতা তিন থেকে চারগুন বেশি। তবে বহির্বিশ্বের চেয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি উক্ত বিষয়ে ব্যাতিক্রম। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় লাখে ৩৯ দশমিক ৬ জন আত্মহত্যা করে।যেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি।

দিন দিন বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্য আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে ৫৬ টি দেশের মধ্যে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে বেশির ভাগ দেশে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি। যার মধ্যে ৫৩% পুরুষ এবং ৩৯% নারী আত্মঘাতী ছিলো। সারাদেশে ১৫.২ মিনিটে একজন ব্যাক্তি আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করে এবং প্রতি ৩৮ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

আত্মহত্যার এই হার মহামারি তে অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষাঙ্গন, বন্ধু বান্ধবী সহ চলমান জীবন যাপন থেকে দূরে থেকে মানুষের মানষিক অবসাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে জীবনের সকল সমস্যা থেকে বাঁচতে মানুষ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ৷ প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার সংবাদ।

আত্মহত‌্যার প্রবণতা কি আসলেই একটি রোগ?
এতদিন বলা হত, আত্মহত‌্যা একটা লক্ষণ বটে এটা কোনও অসুখ নয়। কিন্তু এখন এই ধারনায় বদল এসেছে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমেরিকার ডেভিড শিহান নানা যুক্তিপ্রদান করে উদাহরণ তুলে ধরে আত্মহত‌্যাকে অসুখ বলেই দাবি করছেন। তাঁর এই দাবিকে মান‌্যতা দিয়েছেন বিখ‌্যাত সাইকিয়াট্রিস্টরাও। তাঁদের মতে, আত্মহত‌্যা বা তার চেষ্টা বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, একে শুধু ডিপ্রেশনের একটি লক্ষণ বলা ভুল। আত্মহত্যার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে বলে জানা যায়। ডিপ্রেশন এর কারণে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করে তরুণ -তরুণীরা৷ অর্থ্যাৎ যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ তাদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে ডিপ্রেশন কে দায়ী করা হয়। বর্তমান বিশ্বে প্রায় তিনশো মিলিয়ন (১ মিলিয়ন =১০ লাখ) ডিপ্রেশন এর রোগী আছে। প্রতি ৫ জনের একজন মানুষ কোন না কোন কারণে ডিপ্রেশন এর স্বীকার।

আত্মহত‌্যার ইচ্ছার প্রথম ধাপের লক্ষণ হল, যেখানে রোগী ভাবেন, আমি নিজে সক্রিয় হয়ে কিছু করব না, মৃত্যু নিজের থেকে চলে এলে ভাল হয়। দ্বিতীয় ধাপে রোগী চিন্তা করে নেন তিনি কীভাবে মরতে চান। কিংবা কীভাবে মরলে ভালো হয় এবং সেটা নিয়ে গবেষণা করা, পরিকল্পনা করা। তারপর অ‌্যাকশন ও চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই ধরনের আত্মহত‌্যায় রোগী বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করে রাখেন। কোন জায়গায় কখন সুইসাইড করবেন, সব ঠিক করা থাকে। এমনকী সেই স্থানে ওই সময় গিয়ে একাধিকবার দেখেও আসেন। আর এক ধরনের হয়, যেখানে হঠাৎ কোনও আবেগ থেকে আচমকা আত্মহ‌ত‌্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। একে ইম্পালসিভ সুইসাইড বলে। এই সব ধরনের লক্ষণগুলিকে এখন ডিসঅর্ডার বলে ধরা হয়।

করোনা মহামারীর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার হার। এর পিছনে আমি মনে করি মানুষে ব্যাক্তিগত এবং সামাজিক সম্পর্ক হ্রাস পাওয়া দায়ী। দরিদ্র্যতা,একাকিত্ব, বেকারত্ব, ক্যারিয়ার বিষয়ক অনিশ্চয়তা সহ বিভিন্ন কারন দায়ী। আসলেই সবাই পরিস্থিতির স্বীকার মাত্র। এসময় যার যার জায়গা হতে নিজেকে মোটিভেট করতে হবে। নিজের জীবনের জন্যই নিজেকে বাঁচতে হবে।

আত্মহত্যা নিজেই একটা বিজ্ঞাপন- কথাটা অদ্ভুত শোনা গেল, তাই না? তবে কথাটার প্রমাণ ইতিপূর্বে অনেকবার মিলেছে। ক্রমশ যেন তার প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। ঢাবির ১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে মৃত্যু বরণ করেছে কেবন এই মহামারীতে তাছাড়া রাবি শিক্ষার্থী, ইবি শিক্ষার্থী সহ একের পর এক শোনা যাচ্ছে আত্মহত্যার মিছিল। আসলে আত্মহত্যা শব্দটা নিজে থেকেই মানুষের মধ্য নিজের অস্তিত্বের অগ্রসর ঘটায়।

তাই যতটা সম্ভব এই ধরণের সংবাদ কম প্রচার করা উচিত বলে আমার মনে হয়। তার মানে এই নয় যে সতর্ক করা যাবে না। বা সংবাদ প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকবে। তবে অবশ্যই এই প্রচার প্রসার না ঘটায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মানুষিক অবসাদগ্রস্ত মানুষ গুলো এই ধরণের সংবাদ কে মোটিভেশান হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে নিজের জীবন নাশের মাধ্যম তৈরী করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। অনেকে আবার প্রিয়জন দের প্রতি অভিমান করে তাদের কে নিজের অবস্থান বোঝাতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

এখনই সময় আত্মহত্যা শব্দটাকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। মানুষের সাথে মানুষের সখ্যতা গড়ে তুলতে হবে। কেবল কারো সমস্যা শোনার বদলে নিজের ঘটনা শোনাতে ব্যাস্ত না হয়ে মনোযোগ দিয়ে বিপরীত পাশের মানুষের সমস্যা গুলো শুনুন তাকে সময় দিন এবং তার মনোবল বৃদ্ধি করতে তার সাথে বন্ধুত্ব চলমানতা বজায় রাখুন।

সামাজিক সম্প্রিতি বৃদ্ধি করতে হবে। দারিদ্র্যের হাট কমাতে সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করতে হবে। বেকারত্ব হৃাস করতে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল প্রতিষ্ঠানে হাতে কলমে দীক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

সুন্দর সমাজ পারে এই ধরণের আতঙ্ক হতে মুক্তি দিতে তাই সমাজকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনক সকলকেই সচেষ্ট হতে হবে অনতিবিলম্বে। এছাড়াও বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যাবহার বাড়িয়ে তুলছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সব বয়সের মানুষ ইন্টারনেটের এই জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে অল্পবয়সে ভুল পথ বেছে নিচ্ছে এবং সমাজ ও পরিবার থেকে মুখ লুকাতে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ।

আরোশি আঁখি
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

ঢাকা, ০৩ জানুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।