বাঁচতে দাও, বাংলা বলছি


Published: 2021-02-28 14:49:50 BdST, Updated: 2021-04-23 01:30:59 BdST

মোস্তাফিজুর রহমান: বাংলার মানুষ রফিক, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা সবাইকেই ভালোবাসে। বাংলার মানুষ চায় না যে তুমি হারিয়ে যাও হে বাংলা ভাষা। তোমায় বাঁচতে হবে, তোমাকে বাঁচাতে হবে। দায়িত্ব তো বাংলার মানুষের। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে এতো প্রেম, ঐক্য, ভাতৃত্ব, স্নেহের মৌলিক কারণ কি? সেটা হলো আমরা সবাই বাঙালি। প্রত্যেকই বাংলা মায়ের সন্তান। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা“। এটা কি কেবল সংবিধানে লিপিবদ্ধ করার জন্যে?

যে উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৫২ সালে সালাম, বরকত, জব্বার মায়ের স্নিগ্ধ কোল ছেড়ে রাজপথে অনন্তকালের নিদ্রায় শায়িত হয়েছিল, সেকি শুধু পাকিস্তানের কাছ থেকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য, নাকি বাঙালির জাতিরাষ্ট্রে বাঙলা তার স্বমহিমা নিয়ে জাতির চেতনাকে ক্রমাগত সম্মৃদ্ধ করবে এবং বাংলা হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী কবিতার ন্যায় পৃথিবীর অন্যতম প্রধান শ্রেষ্ঠ ভাষা, সে জন্য?

কেবল ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই আমরা বাঙালি এমনটা নয়তো? আবার অনেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলে খাঁটি বাঙালি হবার মিথ্যে অভিনয় করি। ১৯৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে, দুই লাখ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, সেই দেশে কেনো বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করার জন্যে হাহাকার করতে হবে? কেনো নতুন করে আদালতে নির্দেশনা জারি করতে হবে? কেবল মুখে বুলি আওড়ানো হয় যে বাংলা আমার আবেগ, বাংলা আমার মায়ের ভাষা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাকে ভালোবাসা হচ্ছে না, জাতি বড্ড বেশি স্বার্থান্বেষী হয়ে যাচ্ছে নাতো? যে বাংলা বাঙালিদেরকে পৃথিবীর বুকে এক জেদি, লড়াকু, বীর জাতি হিসেবে পরিচয় দিলো, আজ তাকেই কোণঠাসা করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। বর্তমানে ভাষা চর্চা প্রায় শতভাগই প্রযুক্তি নির্ভর। এই যে এখানে লেখা হচ্ছে যেখানে ইংরেজী লেখার জন্য একটাই অপশন অথচ বাংলা লেখার জন্যে চারটি অপশন। বাংলায় সংরক্ষিত তথ্য যেমন অপ্রতুল তেমনি তার ব্যবহারোপযোগীতাও সামান্য।

মানুষ শুধু ভাবে কিভাবে ফেসবুক ফলোয়ার বাড়ানো যায়, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে নতুন নতুন কুসংস্কৃতিক ভিডিও আপলোড দিয়ে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিষয়ে নিজের হীনন্মন্যতার পরিচয় দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। যেই সমাজ এতো বেশি ফেসবুকে ডুবে থাকে, এতো বেশি ইন্টারনেট নির্ভর, তাদের উপযোগী করে বাংলাভাষাকে তৈরি করতে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই!

ভাষাবিদরা আশঙ্কা করছেন আগামী কয়েক শতকে বাংলাও বিলুপ্ত ভাষার তালিকায় চলে আসবে না তো? কেননা ১০০ বছরে বাংলা ভাষা সাধুরীতি থেকে চলিত রীতিতে চলে ৫০০ বছরে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। আগামী কয়েক শ বছরে বিশ্বের সাত হাজার ভাষার অর্ধেকই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোটামুটি বলা যায়, বিশ্বে ৫০০টি ভাষা আছে, যেসব ভাষায় ১০ জনেরও কম মানুষ কথা বলে।

বর্তমান বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষের ভাষা ইংরেজী যাদের ১৫% ইংরেজ। কিন্তু রাষ্ট্রের সেভাবে কোনো পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না– কিভাবে ভাষাকে টিকিয়ে রাখা যায়। বাংলা ভাষা বিলুপ্তির প্রধান কারণ ভাষাকে বিশ্বের সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করা যায় না। ইন্টারনেটের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু এই ইন্টারনেট ব্যবহার উপযোগী করার জন্যে কোনো পরিকল্পনা কোনো, অর্থ বরাদ্দ নাই। বাংলা ভাষাকে বিশ্বায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বহুমাত্রিক ব্যবহারের জন্য কি-বোর্ড, বাংলা লিখন-পদ্ধতি, বাংলা ফন্ট ও ইউনিকোড প্রমিতকরণ করতে হবে।

বিএলপি গবেষণার সাফল্য (ফন্টের নকশা, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন, বাংলা লেখা প্রক্রিয়াকরণ, স্বরধ্বনির বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ) বিশেষ করে সাধারণ মানুষ এবং তাদের আর্থ-সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। বিএলপির সাফল্য ছাড়া দেশের জনগণকে যতই তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করি না কেন তাতে অন্তত বাংলা ভাষা ইন্টারনেটের ভাষা হিসেবে গড়ে উঠবে না। এতে করে সাধারণ মানুষের ভাষাই দুর্ভোগের মুখে পড়বে।

লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান
ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, প্রথম বর্ষ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, ২৮ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।