৭ মার্চের মহাকাব্যঃ বাঙ্গালী জাতির মুক্তি


Published: 2020-03-08 11:26:05 BdST, Updated: 2020-04-06 23:11:27 BdST

সৈয়দ নাজমুল হুদাঃ জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে ভাষণ, বক্তব্য কিংবা মহাকাব্য আলোচনা হয়েছে। তবে সকল ভাষণই যে, মহাকাব্য হতে পারে তা কিন্তু নয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ভাষণটিকে মহাকাব্য হিসাবে আজকের প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। যে কারণে কোথাও কোথাও ভাষণ শব্দটি না লিখে মহাকাব্য হিসাবে লিখা হয়েছে।

এই ভাষণে বাঙ্গালি জাতির বিভিন্ন দিকনির্দেশনা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এমনকি চূড়ান্ত সফলতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে ইহা একটি অনন্য মহাকাব্য। যে কাব্যের মধ্যে ছিল কবির অসাধারণ তেজস্বিতা, বাগ্নীতা, দৃঢ়তা, দূরদর্শীতা, সুদুরপ্রসারী চিন্তা। সময় উপযোগী পরিকল্পনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।

৭ মার্চ এর ভাষণটি সাত কোটি মানুষকে একই ছাতার নিচে আনার মনোমুগ্ধ মন্ত্র ছিল এই মহাকাব্যে। এই মহাকাব্য ছিল ভাষার ব্যবহার, শব্দ চয়ন ও মানবতার শান্তির বাণী। ছিল স্বাধীনতার ডাক, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক।

একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত রয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। এমতাবস্থায় এই সকল বিষয় নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা অসৎ উদ্দেশ্য প্রনোদিত। যা বাংলাদেশের সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল বলে আইন বিষেজ্ঞ অনেকেই মনে করেন। ৭ মার্চ নিয়ে বিতর্ক কিংবা অনভিপ্রেত আলোচনা বাদ দিয়ে প্রকৃত বিষয় ও এর সঠিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আজকের প্রবন্ধে সামান্য কিছু আলোচনা করা হলো।

কারণ ২০২০ জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এই শতবার্ষিকীতে সঠিক ইতিহাস ও তথ্য আজকের ও অনাগত ভবিষৎ প্রজন্মের জন্য বিনির্মান করাই হবে আমাদের লক্ষ ও উদ্দেশ্য।

পটভূমিঃ
১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কলে ঢাকা বিমানবন্দরে বলেন, “শেখ মুজিবুর দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী। আরও বলেন, শেখ মুজিবুরের সরকার শ্রীঘ্রই ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। শেখ মুজিব যখন ক্ষমতা গ্রহণ করবেন, তখন আমি ক্ষমতায় থাকব না। দেশের এক বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো তাঁর জন্য উত্তারাধিকার হিসেবে রেখে যাব।”

ইয়াহিয়ার নিজ মুখে স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা ও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতির সাথে প্রতারণা ছিল ইতিহাসের এক জঘন্যতম ভূল। যার পরিনাম স্বাধীনতার ডাক ও স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম। বিশ্বের দরবারে শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে গড়ে উঠা লাল সজুবের পতাকা সমৃদ্ধ সোনার বাংলা একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ দেশ। ২ মার্চ সারা দেশে পূর্ণ হরতাল আর ৩ মার্চ অর্ধ দিবস হরতাল পলিত হয়। ৩ মার্চ ১৯৭১ সমগ্র পূর্ব বাংলায় হরতাল, মিছিল আর শ্লোগান চলতে থাকে।

ঐ দিন পতাকাকে বাংলাদেশের লাখো জনতা ছালাম জানায়। বাঙ্গালির বাঁধভাঙ্গা শ্লোগানে মুখরিত সারা ঢাকা। “বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা, তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব, জয় বাংলা ইত্যাদি। ৬ মার্চ জাতীয় লীগের সভায় অলি আহাদ পরের দিন ৭ মার্চের সভায় বঙ্গবন্ধুকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানায়।

লেঃ জেনারেল ইয়াকুব ও শেখ মুজিবুরের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয় ৫ মার্চ সন্ধ্যায়। লেঃ জেনারেল ইয়াকুব শেখ মুজিরের পাশে বসে হাতে হাত রেখে অনুরোধ করে বললেন, আর যাই হোক ৭ তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণা করবেন না। এমনটি করলে গোলান্দাজ বাহিনী কামানের গোলা নিক্ষেপ করবে।

শেখ মুজিব দৃঢ়তার সাথে বললেন, “এমনটি করলে পরিণতি ভাল হবে না।” ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদ থেকে শেখ মুজিবকে অনুরোধ করে সংবাদ প্রেরণ করেন। আপনার ৬ দফার পূর্ণ সম্মান করা হবে। কিন্তু আপনি স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে বিরত থাকুন। ৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা যাতে শেখ মুজিব না করে এ জন্য ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ দুপুর ১ টা ৫ মিনিটে বেতার যোগে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।

কারণ ইতিমধ্যে ইসলামাবাদ জেনে গেছে যে, ৭ মার্চ শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে অখন্ড পাকিস্থান খন্ডিত হতে যাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আসছে বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এই ভাষণটি ছিল বঙ্গালি জাতির মুক্তির সনদ। যাহা আজ ইতিহাসের পাতায় মহাকাব্য হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে।

কবি নির্মলেন্দু গুন তাঁর স্বাধীনতা কবিতায় লিখেছেন-
“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতা খানি
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

কি ছিল এই মহাকাব্যে?
কাব্য বা পদ্য হচ্ছে শব্দ প্রয়োগের ছান্দসিক কিংবা অনিবার্য ভাবার্থের বাক্য বিনাস- যা একজন কবির আবেগ-অনুভূতি উপলব্ধি ও চিন্তা করার সংক্ষিপ্ত রূপ । বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের কাব্যখানি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ্যাৎ পাকিস্তানীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত রাষ্ট্রের মধ্যে শাসন-শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঙ্গালি জাতির মুক্তির জন্য আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তার বহিঃ প্রকাশ। এটা শুধু কাব্য নয় রাজনৈতিক মহাকাব্য।

মাহাকাব্য হচ্ছে সাধারণতঃ দেশ কিংবা সংস্কৃতির বীরত্ব গাঁথা এবং ঘটনাক্রমের বিস্তৃত বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খনভাবে তুলে ধরা। ৭ মার্চের দিন ছিল না অন্য দশটি দিনের মত ঢাকার আকাশ। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যলোকে যে বস্তু চিক চিক করে জ্বলে তা ছিল বঙ্গবন্ধুর সাহস। ছিল জোৎস্না রাতে রূপালি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মত ভালবাসা। পড়ন্ত দুুপূর পার করে বিকাল ৩ টা ২০ মিনিটে সাদা পাঞ্জাবি আর হাতকাটা কালোকোর্ট পরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, রাজনীতির মহাকবি তার অমর কবিতাখানি শোনাতে দৃপ্তপায়ে উঠে আসেন রেসকোর্সের মঞ্চে।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ

 

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণঃ
শ্লোগানে মুখরিত মুহমূহ....পড়ছে জনসমূদ্র। সাত কোটি মানুষের সংগ্রামী হাতিয়ারের প্রতীক বাঁশের লাঠি উত্থিত হচ্ছে আকাশের দিকে। পত পত করে উড়ছে পূর্ব বাংলার জমিনের উপর লাল সবুজ অংকৃত পতাকা। মঞ্চের আশে পাশে রেসকোর্স ময়দানে পা রাখার তিল পরিমান জায়গা নেই। “জয় বাংলা” শ্লোগানে মুখরিত সারা ঢাকা। এরই মধ্যে মঞ্চের উপবিষ্ঠ হলেন রাজনীতির মহাকবি। কবি শুনালেন তাঁর মহাকাব্যখানি।

হৃদয়ের গভীরের বিশ্বাস, আবেগ, অনুভূতি ও মুক্তির নির্দেশিকা হয়ে রবে কবিতাখানি। কবির মহাকাব্যখানি ছিল ১০ লক্ষ মানুষের সামনে অলিখিত ও পূর্ব পরিকল্পনাবিহীন। দু:খভরাক্রান্ত মন নিয়ে কাব্যখানি শুরু হলেও শেষ হয়েছে বিজয়ের রনধ্বনি ‘জয় বাংলার’ মাধ্যমে। ১৮৬৩ সালে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস ভাষণটির ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও লিখিত।

যার শব্দ সংখ্যা ছিল ২৭২ টি, ২ মিনিট সময়ব্যাপী, ১৫-২০ হাজার মানুষের সামনে। ১৯৪০ সালের উইনর্স্টন চার্চিলের উই শ্যান ফাইট অন দ্যা বিচেস ভাষণটি ছিল ৩৭৬৮ শব্দের, ১২ মিনিট ১৬ সেকেন্ড ব্যাপী, যা শুধুমাত্র আইন সভার ৬০০ লোকের সামনে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের জওহরলাল নেহেরুর অ্যা ট্রাইস্ট ডেস্টিনি ভাষণটি ৭৫৫ শব্দের, ৫ মিনিট ৯ সেসেন্ডব্যাপী, সেটিও সংবিধান পরিষদের ৫০০ মানুষের সামনে ছিল। ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম ভাষণটি প্রথামাংশে লিখিত ও পঠিত যা ১৬৬৬ শব্দের, ১৭ মিনিটি ব্যাপী, শ্রোতার সংখ্যা ছিল ২ লাখ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষটি ১৮ মিনিট ধরে, ১১৩৫ শব্দের, ১০ লক্ষ লোকের সামনে উপস্থাপিত।

প্রাণজ্জ্বল ভাষায়। তৎসম শব্দ বর্জিত। কবি শোনালেন তাঁর অমর কাব্যখানি। কবির কবিতাখানি ৭ কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে মহান মুক্তি যুদ্ধের মাধ্যমে ছিনিয়ে এনেছে মহান স্বাধীনতা। কবি তাঁর অমর কাব্যখানিতে বর্ণনা করেছেন ২৩ বছরের মূমূর্ষ নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। একেবার সহজ সরল ভাষায়।

এই কাব্যখানিতে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক কবি নয় একজন কূটনীতিবিদের মতো করে প্রকাশ করেছেন তাঁর অনুভূতিসমূহ। এ কাব্যখানি ছিল উজ্জীবিত বাঙ্গালির অনুপ্রেরণা ও স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। সকল দিক বিচার বিশ্লেষণে কাব্যখানি পৃথিবীর বুকে রাজনৈতিক মহাকাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

ইউনেস্কো তাঁদের মেমরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড (এমওডাবিস্নঊ) তে ৭ মার্চের ভাষণটিকে “ডকুমেন্টারি হেরিটেজ” হিসাবে মেমোরি অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিষ্ট্রারে যুক্ত করেছে।

মহাকাব্যর গাম্ভীর্যপূণ দিকসমূহঃ
১। তৎকালীন সময়ের সামগ্রিক আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির বিশাদ পর্যালোচনা।
২। বাঙ্গালিকে গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্ভূত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক আইন ও আগ্রাসন প্রত্যাহারের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা।
৩। সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা (হিন্দু, মুসলমান, বাঙ্গালি ও অবাঙ্গালি) সম্পর্কে মহাকাব্যে ফুটিয়ে তোলা।
৪। দিশেহারা জাতির জন্য প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা।
৫। শান্তির বাণী, বিশ্বমানবতার ঐশ্বর্য ও বাঙ্গালি জাতির মুক্তির নির্দেশিকা।

পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের অভিমতঃ
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি শুধু ভাষণই নয় এটা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন সম্প্রদায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, চিন্তাবীদ, রাষ্ট্রনেতা, নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংস্থা এ সম্পর্কে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

যা নিয়ে আলোকপাত করা হলো:
১৯৭২ সালে আনন্দ বাজার পত্রিকার এক নিবন্ধনে বলা হয়েছে, “উত্তাল জনস্রোতের মাঝে, এ রকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দিক নির্দেশনামূলক ভাষণই শেখ মুজিবকে অনন্য এক ভাবমূর্তি দিয়েছে। দিয়েছে অনন্য মহান নেতার মর্যাদা।”

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, “তিনি ছিলেন মানব জাতির পথ প্রদর্শক। তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয় সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করেবে”।
কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ট্রো বলেছেন, “ ৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রনকৌশল দলিল।”
ভারতের পশ্চিম বঙ্গের প্রয়াত সাবেক মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছেন, “৭ মার্চের ভাষণ একটি অনন্য দলিল। এতে এক দিকে যেমন মুক্তির প্রেরণা। অন্যদিকে আছে স্বাধীনতার পরবর্তী কর্ম পরিকল্পনা।”

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ভ্যাকব্রাইড বলেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি, বেঁচে থাকার স্বাধীনতার সমার্থ। তবে এই সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ মার্চের ভাষণে।”
দ্যা ওয়াশিংটন পোষ্ট ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ এর ভাষণ সম্পর্কে বলেছেন,“ শেখ মুজিবের ৭ মার্চ এর ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ঐ ভাষণেরই আলোকে।”

১৯৭১ সালে এএফপি বলেছে, “৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙ্গালীদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐ দিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।”

গ্রেট ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছেন, “পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চির জাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশে^র মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।”

১৯৭১ সালে থমসন রয়টার্স এর মতে, “বিশ্বের ইতিহাসে এ রকম আর একটি পরিকল্পিত এবং বিন্যস্ত ভাষণ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একই সঙ্গে বিপ্লবের রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং সাথে সাথে দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও বিশ্বের অন্যতম সাময়িকী ‘নিউজউইক’ বঙ্গবন্ধুকে “পোয়েট অব পলিটিকস” হিসাবে অভিহিত করেছেন।”

২০১৭ সালের ২৮ থেকে ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চারদিনের বৈঠকে ৭ মার্চের ভাষণকে মেমোরি অফ দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে যুক্তি করেছে। বিশ্বের প্রামান্য ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এ ভাষণকে।

লেখক: সৈয়দ নাজমুল হুদা

৭ মার্চের মহাকাব্যে দর্শকের ভাবান্তরঃ
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙ্গালি জাতির চির প্রেরণার চিরন্তন উৎস ও শক্তির হাতিয়ার হয়ে রবে এই ঐতিহাসিককের ভাষণ/মহাকাব্যে খানি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্থানী শাসক গোষ্ঠীর অন্যায়, অত্যাচার, শাসন-শোষণ আর রক্তচুক্ষকে উপক্ষো করে দৃঢ় চিত্তে অসীম সাহসীকতার সাথে ১০ লক্ষ জনতার উদ্দেশ্য বজ্রকণ্ঠে শোনালেন মহাকাব্যখানি। যা ছিল ঐতিহাসিক পথপ্রদর্শক ও বাঙ্গালি জাতির মুক্তির সনদ। ৭ মার্চের ভাষণের ধারাবাহিকতায় ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেণ কাঙ্খিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এ কারণে ৭ মার্চের মহাকাব্যখানি দর্শকের ভাবান্তর হয়ে রয় কাল থেকে মহাকালের পথে। এ ভাষণটির ছিল না কোন লিখিত রূপ। ভাষণটিতে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শ্রমজীবি মানুষের অধিকার ও রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলা হয়েছে। ভাষণটিতে গণতন্ত্রের পূর্ণ ঠিকানা, গণতন্ত্রের জ্ঞান ও মান, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত, শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচীসহ বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভাষণটি শুধু বাঙ্গালির জন্যই নয়, বিশ্বমানবতার জন্য চিরস্মনীয় ও অনুকরণীয় এক মহামূল্যবান দলিল। দেশপ্রেম ও মানবতার মুক্তির এক জলন্ত অনুপ্রেরণার উৎস এই মহাকাব্যখানি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ইতিহাসের পাতায় একজন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নেতা। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত ১০ লক্ষ লোককে সেনানিবাসে পাঠালে হয়তোবা নিরস্ত্র জনগণ সেদিন হত্যা যজ্ঞের শিকার হতে পারত। লাখ লাখ লোক সেদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত পারত এবং বঙ্গবন্ধু চিহ্নত হতেন একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসাবে। গোটা বিশ্বের জনমত চলে যেত বাঙ্গালি জাতির এই নেতার বিরুদ্ধে।

তাইতো তিনি এক দিকে বলছেন, “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে, শত্রুর মোকাবেলা করতে। অন্যদিকে, তিনি বজ্রকণ্ঠে শুনিয়েছেন সামরিক আইন প্রত্যাহার করে সেনাবাহীনিকে ব্যরাকে ফিরে যেতে। নিরীহ বাঙ্গালী হত্যার তদন্ত দাবী করেছেন। জনগনের অধিকার, জনপ্রতিনিধির হাতে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।”

পাশাপাশি আলোচনার দরজাও খোলা রেখেছেন। দ্ব্যর্থহীনভাবে সেদিনের ঘোষণা খানি মহান স্বধীনতার রূপ লাভ করেছিল এবং নিরস্ত্র বাঙ্গালি শত্রুর মোকাবেলা করে ১৬ ডিসেম্বর কাঙ্খিত স্বাধীনতা উপহার দিয়েছিল। তাইতো ইতিহাসের পাতায় ৭ মার্চ ও বঙ্গবন্ধু জাতির প্রাণ শক্তির স্পন্দন হয়ে রয়।

যবনিকাঃ
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহাকাব্য খানি গোটা বাঙ্গালি জাতিকে আন্দোলিত করেছিল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে শক্তি যুগিয়েছিল। ৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠের ঘোষণাখানি মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক উভয়ই ছিল। এই ভাষণটিতে / মহাকাব্যে শুধু স্বাধীনতার আহ্বান করেননি। চূড়ান্ত স্বাধীনতা পাবার দিকনির্দেশনাও রয়েছে। এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা, স্বাধীন ভূ-খন্ড, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগিত, জাতীয় সংসদ, সংবিধান ও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

৭ মার্চের ভাষণ/মহাকাব্যখানি শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধেই নয় আজও অন্যায় অবিচারে বিরুদ্ধে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রানিত করে গোটা জাতিকে। ১৭ মার্চ ২০২০ হবে মুজিব শতবর্ষ অর্থ্যাৎ বাঙ্গালি জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এই জন্মশতবার্ষিকীতে আমরা দৃীপ্তশপথে এগিয়ে যাব। স্বাধীনতার মহান বানী ও জাতির পিতার গৌরব উজ্জ¦ল কর্মপরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে। এই শতবর্ষ হোক আমাদের শপথ ও মানবিক গুনাবলীর অঙ্গিকার। ‘জয় বাংলা, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’। পাশাপাশি এ বছর মুজিববর্ষ থেকে ৭ মার্চ কে জাতীয় দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হোক।

গ্রন্থপঞ্জীঃ
১। ড. খ. ম. রেজাউল করিম, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য।
২। মেজর রফিকুল ইসলাম, শেখ মুজিব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম।
৩। আব্দুল গফ্ফার চৌধুরী, ৭ মার্চের ভাষণ কেন একটি অমর মহাকাব্য।
৪। আশফাক হোসেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের রূপরেখা।
৫। এম. আনিসুজামান, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু।
৬। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: সংবিধানের মূলমন্ত্র।
৭। বদরুদ্দিন উমর, ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি।
৮। ড. হারুন-অব-রশিদ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেন আজ বিশ্ব স্বীকৃত।
৯। আরিফ খান, বাংলাদেশের সংবিধান।
১০। এ্যাডঃ মশিউর মালেক, খোকা থেকে জাতির পিতা।
১১। মোনায়েম সরকার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি।

লেখক: সৈয়দ নাজমুল হুদা, শিক্ষক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

ঢাকা, ০৭ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।