কতোটি কান থাকলে পরে কান্না শুনতে পাবে...


Published: 2020-05-07 16:57:12 BdST, Updated: 2020-09-24 08:32:47 BdST

আমীর খসরু: করোনা সংক্রমণের এই সময়ে লকডাউন, সাটডাউন বা কড়াকড়ি আরোপের ক্ষেত্রে উপরতলার নীতি-নির্ধারকদের কথাবার্তার সাথে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার কোন মিল ছিল না কখনো। অবশ্য উপরতলার বা নীচের দিকেই নয়, সামগ্রিকভাবে করোনা মোকাবেলা কার্যক্রম শুরু করা থেকে তা বাস্তবায়নের নানা পর্যায়ে প্রায়ঃশই পরস্পরবিরোধী অবস্থান, সমন্বয়বিহীন ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এ কারণেই লকডাউনের বাংলাদেশী শব্দার্থের কথা একজন বলছিলেন- কিছু বাঁশ রাস্তার ওপরে এলোপাতাড়ি ফেলে রাস্তা লক করে দেয়া হলে, বাঁশের নড়বড়ে অবস্থায় নিজেদের কিছুটা ডাউন করে নিবিঘ্নে যাতায়াত করতে পারার নামই হচ্ছে লকডাউন। আর এমতো শিথিল ও ঘোষণা সর্বস্ব লকডাউনের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে- সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি পর্যন্ত এক মুহূর্ত সময়ও লাগেনি মানুষের দলে দলে বাইরে বেরিয়ে আসায় এবং গণপরিবহন বাদে প্রায় সব যানবাহন রাস্তায় বেরিয়ে আসতে।

প্রায় সব দোকান-পাটও খুলে গেছে। যারা বেরিয়ে এসেছেন তাদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই, আসল সমস্যা বিশ্বাসহীনতায়, পুঞ্জিভূত আস্থাহীনতায়। অথচ ১৫ মে পর্যন্ত সরকারি ছুটি বহাল করা হয়েছে। এই হযবরল পরিস্থিতির মধ্যে ৫ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্পষ্ট করেই বলেছেন, গার্মেন্টস, শপিংমল সবকিছু খোলা থাকলে সংক্রমণ বাড়বেই। ওই দিনই সরকারের এমন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে করোনা সংক্রান্ত সরকার গঠিত ‘বিশেষজ্ঞ কারিগরী কমিটি’। তাদের বক্তব্য: এতে করোনার ব্যাপক বিস্তার বাড়বে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার ওই একই সাবধান বাণী উচ্চারণ করছেন।

এক্ষেত্রে বাস্তব কিছু তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে- বর্তমানে করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে এটা ব্যাপকহারে বাড়ার শংকা প্রকাশ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা শংকা প্রকাশ করে বলছেন, এর পরে করোনার মূলকেন্দ্র হতে পারে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে প্রথম ৩ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয় ৮ মার্চ।

মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ৫১ জন, এপ্রিলের শেষে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬৬৭ জনে এবং ৫ মে পর্যন্ত ১০ হাজার ৯২৯ জনে। তুলনামূলক হিসেবে করোনা সংক্রমণের দ্রুততার দিকে থেকে বাংলাদেশ শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই নয়, বহু দেশ থেকে এগিয়ে। বাংলাদেশে মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শেষে এসে সংক্রমণ হার বেড়েছে দেড়শ গুণ। আর ৫ মে পর্যন্ত ২১৫ গুণ।

মে মাসের প্রথম ৫ দিনেই বেড়েছে প্রায় ৩৩শ মানুষের করোনা সংক্রমণ। অথচ ভারত-পাকিস্তানে এই সংখ্যা অনেক কম। এমনকি করোনা সংক্রমন মোকাবেলায় বাংলাদেশের অবস্থা ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার চেয়েও খারাপ। অর্থাৎ উল্টো দিক দিয়ে আমরা ফার্স্টের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি।

তাহলে এ কারণে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- লকডাউন, সাটডাউনের নামে বৃথাই কেন গেল ৪৫ দিনের মতো সময়ের অর্জন, ঘরে বসে থাকা এবং অন্যান্য সবকিছু বন্ধ করে দেয়া। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নামে সত্য কথাটি যাতে বেরিয়ে আসতে না পারে- এটাই কি ছিল উদ্দেশ্য? এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, সোস্যাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব আসলে ভুল শব্দপ্রয়োগ। হওয়া উচিত ছিল ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স, সোস্যাল ইউনিটি এ্যন্ড কোহারেন্স অর্থাৎ সামাজিক ঐক্য ও সামাজিক সম্মিলন, সংবদ্ধতা বজায় রেখেই, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা।

তবে ৪৫ দিনের অর্জনকে বিসর্জন দিয়ে শিথীলতার অর্থ হচ্ছে- জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা বা বিসর্জনের ঝুঁকি আরও বাড়ানো। তাহলে কি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের চেয়ে অর্থনীতি, জীবনের চেয়ে ওই ক্ষমতাধরদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমানোই বিজয়ী হয়েছে? বলা হচ্ছে-সাধারণ মানুষ ত্রাণ পাচ্ছে! সরকারি সহায়তা পেয়েছে! যদিও বাস্তবতা তা নয়। কিন্তু লকডাউন উঠিয়ে সম্মিলিতভাবে নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করার আওয়াজ তো কখনো তুলেননি দরিদ্র প্রান্তিক মানুষগুলো? তারা চেয়েছেন ও চাচ্ছেন, জীবন বিপন্ন না করে কর্মসংস্থান এবং সরকারি সহায়তা, প্রনোদনা।

আসলে শিপমেন্ট, অর্ডার বাতিল, উন্নয়নের ধারা বজায় রাখা, অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা, ক্ষমতা, এর সাফল্য, সূচকের উর্ধ্বগতি-এ সবই আসল। দু:খ হয়-তারা অর্থনীতি বোঝে, তথাকথিত উন্নয়ন বোঝে, বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতা বোঝে, কিন্তু মানুষ ও তাদের জীবন, বেচে থাকার মর্ম বোঝেনা। কথিত উন্নয়নের মতো যতো শব্দ আমাদের শুনতে হয়েছে, তার সিকিভাগও সমাজের ওই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য কথা শোনা যায়নি।

বিশ্বায়নের জমানায় প্রবৃদ্ধি, গড় আয় বৃদ্ধিসহ ইকোনমিক ইনডেক্স বা সূচকগুলোই সুমহান, মানুষের জীবন, বেঁচে থাকা অথবা মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যার যোগ-বিয়োগ মাত্র। কিন্তু কার উন্নয়ন, কেন উন্নয়ন, কাদের নাম করে কতোজনের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি- প্রশ্নগুলো খুবই সোজা।

যেখানে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা তুমুল চিৎকারের পরে পেয়েছেন নকল বা দু নম্বরী মাস্ক, পিপিইসহ নানা চিকিৎসা সরঞ্জামাদি। সেখানে মানুষের জীবন, বেঁচে থাকা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কতো নম্বরের হবে বলে আপনি আশা করেন? মাস্ক, পিপি র ব্যাপারে আসল এবং সত্যিকারের কথা বলে ওএসডি হয়েছেন, বরখাস্ত হয়েছেন চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীরা। অথচ তাদের বাড়তি কোন বোনাস বা অর্থ দেয়া হয়নি।

এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন খুবই সংক্ষেপে করা প্রয়োজন-প্রণোদনার কথা বলা হয়েছিল, অথচ কৃষকদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা বাস্তবায়নের তেমন কিছুই লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আর প্রণোদনার নামে যে ঋণ তার সুদের হার সমাজের উচ্চবিত্তদের, কলকারখানার মালিকদের মতোই কৃষকদেরও দিতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের ষ্ট্যাটাস প্রায় সমান-সমান। এছাড়া যে প্রণোদনার প্যাকেজ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় প্রতিদিনই জানান দিচ্ছে- তা শুধু তাদের জন্য-যারা উপরীতলার। কিন্তু কৃষক, গ্রামীণ অর্থনীতি এদের কথা তো তেমন শুনিই না। উচ্ছিষ্ট আর প্রান্তিকরা তো বাদ!

তাই এখন আমাদের মতো আম-জনতার চোখে পড়ে ত্রাণের দাবিতে মানুষের বিক্ষোভ, অবরোধ, অফিসে অফিসে ধরণা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাঁটাই, আর বকেয়া বেতন না দেয়ার ক্ষোভ। এর বাইরেও আছে দিনমজুরসহ অসংখ্য মানুষ; তাহলে এদের প্রণোদনা কোথায়? কোথায় গেল লাখো কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা। ত্রাণ চুরি অথবা দুর্নীতি নিয়ে বলা হয়েছিল-কঠিন কঠোর শাস্তি হবে। দুদকও কয়েকদিন ত্রাণ দুর্নীতি নিয়ে হম্বি-তম্বি করে যথারীতি এখন সাবজেক্টই পরিবর্তন করে ফেলেছে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে খাদ্যাভাবের, চাকুরিচ্যুতির, বেকারত্ব বৃদ্ধির। সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র, আবার দরিদ্র থেকে সর্বহারায় পরিণত হওয়ার নি:শব্দ ভাঙ্গনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রে-সমাজে এখন নানা ঘটনাবলী ঘটছে মানুষের জীবন-জীবিকা আর বেঁচে থাকার জন্যে। তাহলে কোথায় সোস্যাল সেইফটি-নেট, কোথায় দারিদ্র হার হ্রাস, বিমোচনের সূচক? প্রান্তিক মানুষগুলোর অবস্থার পরিবর্তন হয় না, পরিবর্তন হয় পদবীর। দয়া করে তাদের বলা হয় হতদরিদ্র, আল্ট্রা পুওর, এক্সট্রিম পুওর ইত্যাকার নানা শব্দ।

কিন্তু যে মধ্যবিত্ত নেমে যাচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্তে, যে নিম্ন মধ্যবিত্ত নেমে যাচ্ছে দারিদ্রে, আর যে দরিদ্র সে নেমে যাচ্ছে আরও অনেক অনেক নীচে, ওদের নির্ধারিত দারিদ্র রেখারও নীচে। কিন্তু এদের কান্না শোনার কেউ নেই। লেখাটি শেষ করতে চাই বিশ্বখ্যাত প্রথাবিরোধী গীতিকবি, কালজয়ী গায়ক, নোবেলজয়ী বব ডিলানের ১৯৬২-তে লেখা ও গাওয়া "Blowin' In The Wind" গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে।

how many ears must one man have
Before he can hear people cry?
Yes, and how many deaths will it take 'til he knows
That too many people have died?

এর অর্থ হচ্ছে- ‘কতোটি কান থাকলে পরে কান্না শুনতে পাবে/ কতো হাজার মরলে পরে মৃত্যু বোঝা যাবে’।

(নোট : কবির সুমন-র বিখ্যাত গান- যা বব ডিলানের এই গানকে ভাবানুবাদ করে রচিত এবং গাওয়া হয়েছে , তার ভাবানুবাদ এক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়নি)।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

ঢাকা, ০৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

 
 
 
 

 

 

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।