এর নেপথ্যের খুটি অনেক গভীরে!মেজর সিনহা হত্যা: প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সেই রাতে কি ঘটেছিল?


Published: 2020-08-08 20:13:42 BdST, Updated: 2020-09-28 15:10:14 BdST

কক্সবাজার লাইভ: সেই রাতে কি ঘটেছিল। কেন আলোচিত সেই রাত। ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে সেই লোমহর্ষক ঘটনাটি। আর ফিরে আসবে না সিনহা। রাখবে না মেধার স্বাক্ষর। সকলকে কাঁদিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান চলে গেলেন। সেই ভয়াল রাতের বর্ননা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। বললেন, পুলিশের নানামুখি বাড়াবাড়ির ঘটনা। তারা জানালেন মুহূর্তের মধ্যে তিনটি গুলির মুখে পড়তে হয়।

চেকপোস্টে তিনি হাত উঁচু করে পুলিশের উদ্দেশে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তে তাকে গুলি করা হয়। সিনহা হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছিলেন এমন একজন এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিনড্রাইভে সেনা, পুলিশ ও বিজিবি’র তল্লাশি চৌকি বসানো হয় প্রতিদিন। অন্যান্য চেকপোস্টের থেকে শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টটি একটু আলাদা। অন্য চেকপোস্টগুলো নির্জন জায়গায় হলেও এই চেকপোস্টটির পাশে বাজার, মসজিদ, লোকালয় রয়েছে। মানুষের চলাচল চোখে পড়ে। আনাগোনা করেন সাধারণ লোকজন।

সেই ৩১ জুলাই ঘটনার পরদিন ঈদের নামাজ পড়িয়ে গ্রামের বাড়ি যান ওই এলাকার মসজিদের ইমাম। ছুটি শেষে ফেরার পর পরই তার সাথে কথা হয়। মসজিদের মোয়াজ্জিন এবং মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী কী দেখেছিলেন জানান তিনি। অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন দুর থেকে। কিন্তু কেউ এগিয়ে যাননি।

এদিকে ওই মসজিদের মোয়াজ্জিন বলেন, আমরা দেখতে পেলাম ‘একজন ভদ্রলোক উপরে হাত তুললো। তার দুই হাত উপরে ধরে রেখে সারেন্ডার করেন। আমি ছাদ থেকে কথা শুনিনি। শুনা যায়নি। তবে মনে হলো ভদ্রলোক হাত উঁচু করে কিছু বলছেন। এর মধ্যেই হঠাৎ করেই ৩টি গুলির শব্দ শুনলাম। সেকেন্ড হবে না, একটার পর একটা গুলি চালানো হলো।’

সংশ্লিস্টরা আরো জানান, সিনহার মৃত্যুর পর ৩ জনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তৎকালীন বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের প্রধান লিয়াকত হোসেন। জানা গেছে এর মধ্যে ওসি ও এসপিও রয়েছে। হত্যার বিষয়ে কথা হলেও মাদক বা অস্ত্র উদ্ধারের কোনো তথ্য ফোনালাপে পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন সুত্রে তথ্য মিলেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী অটোরিকশা চালক বলেন, ঘটনার পর সেই মিনি পিকআপ চালক বেলাল ওরফে আবুইয়া তাকে বলেছেন হাসপাতালে নেবার পথে সিনহাকে আরো দুই রাউন্ড গুলি করে পুলিশ। তিনি বলেন, গাড়ি করে নিয়ে যাচ্ছিল। সে অবস্থায় গুলিবিদ্ধ লোকটি অক্সিজেন চেয়েছিল। তখন তাকে আবার দুইটি গুলি করা হয়।

উখিয়ায় চালক আবুইয়ার বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকেই আবুইয়া নিরাপত্তা হেফাজতে আছে। তবে তার পরিচিতজনরা জানান, গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাকে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে আসার পর অনেকটাই ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন তিনি।

পরিচয় গোপন রেখে এ প্রতিবেদককে একজন বলেন, লাশ দেখে আবুইয়া ভয় পেয়েছে। শুধু এই কথাটুকুই বলেছে। ত্রিপলের মধ্যে রক্ত লেগেছিল। সেটা তার বাবা ধুয়ে দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শিরা আরো জানান, ৩১ জুলাই রাত ৯টা ৩০ মিনিটে তৎকালীন বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের প্রধান লিয়াকত তার ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপের অফিসিয়াল নম্বরে ফোন করেন। তারা মিনিট তিনেক কথা বলেন। ঘটনাটির বর্নণা দেন।

তারপর ৯ টা ৩৩ মিনিটে মালখানার ইনচার্জ কনস্টেবল আরিফের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করেন। তার সাথে ১ মিনিট কথা বলেন। এরপর ৯টা ৩৪ মিনিটে কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের ব্যক্তিগত নম্বরে ফোন করেন লিয়াকত। সেখানেও তাদের কথা হয় তিন মিনিট।

এই গুলির ঘটনাটি ব্যাপারে কথোপকথনে লিয়াকত ঘটনা সম্পর্কে এসপিকে জানান। কিন্তু সেখানে মাদক ও অস্ত্র পাওয়ার কোনো কথা উল্লেখ করেননি লিয়াকত। এরপর ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাথে কথা হয় এসপির। তারা কি বলেছেন এ বিষয়টি জানা যায়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এ বিষয়ে জানান, ঘটনাটি তদন্ত হচ্ছে। ঘটনায় এসপি’র সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এসপির নাম যদি আসে আমরা দেখবো, যার নাম আসে দেখবো। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাউকেই ছাড় দিবেন না।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘সাবেক মেজর সিনহার মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে যারাই দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তদন্তের মধ্যে যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন কিংবা যারা দোষ করেছেন বলে প্রমাণিত হবে তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের বিচার করা হবে।’

গত ৩১ জুলাই রাতে শামলাপুরের একটি পাহাড়ি এলাকায় শুটিং শেষে ফেরার পথে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা।

এদিকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ ও কক্সবাজারের এসপি মাসুদ হোসেনের যে ফোনালাপ গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে তা খতিয়ে দেখছে র‌্যাব। প্রয়োজনে এসপিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানয়েছেন সংশ্লিস্টরা। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আশিক বিল্লাহ এ তথ্য জানান।

র‍্যাব পরিচালক আশিক বিল্লাহ বলেন, যে ফোনালাপ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এটা র‍্যাবের নজরে এসেছে। এই ফোনালাপের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই করার সাপেক্ষে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, এই মামলায় মোট ৯ জন আসামির নাম রয়েছে।

এরমধ্যে ৭ জন আদালতে আত্মসমর্পন করেছে। বাকি দুজনের বিষয়ে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি এই দুজনের নামে কোনো সদস্যের কথা উল্লেখ নেই।

কক্সবাজারের টেকনাফ থানার বাহারছড়ায় পুলিশের চেকপোস্টে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের নির্দেশে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার পর তাঁরই পরিকল্পনায় গোলাগুলি, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের মামলা সাজানো হয়। ওসি প্রদীপের কথামতো জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেন ঘটনাটি সাজানোর পরামর্শ দেন। দেশব্যাপী চাঞ্চল্য তৈরি করা এই ঘটনার পর এসপির সঙ্গে ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীর ফোনালাপের একটি অডিও প্রকাশ পেয়েছে। এতে দুজনের কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। তিনজনের কথায় অস্ত্রের কথা বলা হলেও মাদক উদ্ধারের ব্যাপারে কোনো তথ্যই ছিল না।

অডিওতে শোনা যাচ্ছে, ওসি প্রদীপ এসপি মাসুদকে বলেন, সিনহা রাশেদ গুলি করায় তাঁর নির্দেশে লিয়াকত গুলি করেন। তবে লিয়াকত এসপিকে বলেন, সিনহা রাশেদ গুলি তাক করেছিলেন। এসপি মাসুদ তখন ওসি প্রদীপের সুরে লিয়াকতকে বলেন, ‘তোমারে গুলি করছে, তোমার গায়ে লাগেনি, তুমি যেটা করছ সেটা তার গায়ে লাগছে!’ এর মাধ্যমে ওসির সাজানো মামলায় এসপি সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, মেজর সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কক্সবাজারের এসপির বিরুদ্ধে কোনো বিষয় থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না এমন ব্যক্তিদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে সাক্ষী বানানো হয়েছে পুলিশের সেই সাজানো মামলায়। কাছে মামলার তিন সাক্ষী এমনই দাবি করেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন বলছে, ওসি প্রদীপ থানায় এবং থানার বাইরে দুটি সিন্ডিকেট তৈরি করে ক্রসফায়ার ও সমঝোতার নামে টাকা আদায়ের কারবার করেছেন। ওসি প্রদীপ গ্রেপ্তার হলেও তাঁর এসব সহযোগী এখনো সক্রিয় আছেন।

ঢাকা, ০৮ আগস্ট (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।