দুপরের খাবার তিনটায় রাতের খাবার দশটা বা সাড়ে দশটায়‘হাসপাতালে গিয়ে ভূতের বাড়ি মনে হয়েছিলো’


Published: 2020-04-26 15:58:52 BdST, Updated: 2020-06-03 14:22:48 BdST

মোহাম্মদ ওমর ফারুক: যেদিন বাসায় আইইডিসিআর থেকে আমার নুমনা নিতে আসলো ,তখন বাড়িওয়ালা থেকে শুরু করে আশে পাশের মানুষগুলো অন্যভাবে দেখা শুরু করলো। নানান জনে নানান কথা বলতে থাকলো। মনে হয় আমি কোনো অন্যায় করেছি। ওরা কেন আসছে, সেজন্য বাড়িওয়ালা আমার দরজা পিটাচ্ছিলো। এলাকার লোকজন এসে বাড়িওয়ালাকে ধরেছে। বাইরের লোকজন খুব ঝামেলা শুরু করছিলো। পরে দরজা বন্ধ করে তাদের আমি নমুনা দেই বলছিলেন করোনায় আক্রান্ত দেশের প্রথম গণমাধ্যম কর্মী ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ভিডিওগ্রাফার আশিকুর রহমান রাজু।

তিনি বলেন, সবার আচরণ দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি মনে হয় সামাজিকভাবে খুব অন্যায় করে ফেলেছি। পরে বাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে বললাম যে, সাবধানতা হিসেবে চেকআপের জন্য আসছে। পরীক্ষা হলে আপনাদের জন্যই ভালো হবে। এরপর যেদিন করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর পেলাম, সেদিন অ্যাম্বুলেন্স বাসার কাছে আনতে সাহস করিনি। অসুস্থ অবস্থায় হেঁটে গিয়ে দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্স উঠেছিলাম।

গত ২৬ মার্চ। অফিস শেষে বিকেলে বাসায় ফেরেন তিনি। ব্যাচেলর বাসা। নিজের রান্নার কাজ নিজেকেই করতে হয়। আজকের দিনের মতো রান্না শেষ করতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায় তার। এরপর থেকেই শরীর ব্যাথা। একঘন্টার মধ্যেই সেই ব্যাথা দ্বিগুন। রাতে প্রচুর পরিমাণে জ্বর আর ব্যাথা নিয়ে কাটিয়ে দিলো একটি দিন। পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন প্রচণ্ড কাশি আর মাথা ব্যাথা নিয়ে।

পরে নমুনা পরিক্ষা করিয়ে জানতে পারেন, তিনি করোনা পজেটিভ। তিনি সতেরো দিন কুয়েত মৈত্রী হাসপতালে চিকিৎসা নিয়ে গত ১৮ তারিখ বাসায় ফেরেন । এখন সুস্থ আছেন। তার মুখেই শুনবো তার করোনাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতার কথা।

তিনি বলেন, আমি কিভাবে কোথায় আক্রান্ত হয়েছি কিছুই বলতে পারছি না। তবে কাজের খাতিরে অনেক হাসপাতালে ও অন্যান্য জায়গায় গিয়েছি। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মীর হাজীরবাগের বাসিন্দা এই গণমাধ্যমকর্মী বলেন, আমি যখন বুঝতে পারলাম আমি একটি খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তখন অফিসকে জানালাম। পরে অফিসের পরামর্শে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) হটলাইনে যোগাযোগ করি। তারা কিছু পরামর্শ দিয়ে দুদিন রক্তের স্যাম্পল সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষায় ফলাফল করোনা ভাইরাস পজেটিভ আসার পর ২ এপ্রিল হাসপাতালে যাই। এই গণমাধ্যম কর্মীর আরেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে চিকিৎসাধীন হাসপাতালে। সেই কথাই বললেন তিনি। রাজু বলেন, প্রথম দিন হাসপাতালে গিয়েই মনে হয়েছিলো ভূতের বাড়ি। ওখানে গিয়ে কাউকে কোথাও দেখতে পেলাম না। সেখানে যাওয়ার পর সবাই ছিলেন দূরে দূরে। আমাকে দূর থেকে দেখিয়ে দেয়া হলো সামনে ওয়ার্ডে গিয়ে যেটা খালি পাবো সেটায় গিয়ে শুয়ে পড়ার জন্য।

বিকেল তিনটার দিকে হাসপাতালে গেলেও রাত নয়টার সময় চিকিৎসক আমাকে দেখতে আসলো। পুরো হাসপাতালে ভূতুড়ে পরিস্থিতি। কোথাও কেউ নেই। প্রতিটি ওয়ার্ডে ৬টি করে বেড রয়েছে। অনেক সময় পর ডাক্তার-নার্স এসে রোগীদের নাম ধরে অবস্থা জানতে চান। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা তেমন একটা ভালো না। রোগীদের খাবারের মান বা সময় মতো কখনোই খাবার দিতো না।

সকালের খাবার দশটায় ,দুপরের খাবার দুইটায় বা তিনটায় রাতের খাবার দশটা বা সাড়ে দশটায় দিতো। করোনায় আক্রান্ত এই গণমাধ্যম কর্মী বলেন ,ওয়ার্ডের বাইরে কেচি গেটের ভেতরে একটি স্থানে রোগীদের যার যার নাম লিখে পলিব্যাগে করে ওষুধ রেখে যাওয়া হয়। রোগীদেরকে নিজদেরকে গিয়ে নিজেদের ওষুধ নিয়ে আসতে হতো। শুধু তাই নয়। নিজের খাবার নিজেই সংগ্রহ করা লাগতো।

তালাবদ্ধ কেচি গেট খুলে ভেতরে চেয়ারের উপর তিনবেলার নির্দিষ্ট খাবার দিয়ে হ্যান্ডমাইকে সবাইকে খাবার সংগ্রহ করতে বলা হয়। তিনি বলছিলেন, প্রথম দিন তার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে কেউ আসেনি। চিকিৎসকদের ফোন করে তিনি সেটি জানানোর পর সাড়ে চারটার দিকে তার জন্য একটি বক্সে করে খাবার এসেছিল। কোন প্লেট দেয়া হতো না। সেখানে পানি গরম করা থেকে শুরু করে সবকিছুই নিজেকে করে নিতে হয়েছে।

এমনকি জ্বর হলে যে মাথায় পানি দিতে হয়, সেসময়ও সহায়তা দেয়ার কেউ ছিল না। একটা বালতি, মগ কিছুই ছিল না। হাসাপাতলে ছিল না গরম পানি করার ব্যবস্থা। অথচ একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য গরম পানি খুব প্রয়োজনীয়। নিজের ব্যবস্থাপনায় কেটলিতে পানি গরম করে গার্গেল ও চা পানের ব্যবস্থা করতে হতো। আদা, লবঙ্গ, তেজপাতা দিয়ে চা বানিয়ে তিনি সেবন করতেন। ভর্তির পর তার পীড়াপীড়ির কারণে সেখানে দুটি গ্যাসের চুলা বসানো হয়েছে। সেখানে রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিলো বলার মতো।

তিনি বলেন আইসোলেশনে আমি মনে করতাম , এক কক্ষে একজন রোগী থাকবে। পরে দেখলাম সেখানে এমন ব্যবস্থা না। এক ওয়ার্ডে ছয় জন করে আইসোলেশনে থাকতে হচ্ছে এক সঙ্গে। এটা কেমন ধরণের আইসোলেশন মাথায় ধরছিলো না।

হাসপাতালে কি ধরনের চিকিৎসা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে মূলত ঠান্ডা, জ্বর, এন্টিবায়োটিক ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দেয়া হতো। যতটুকু মনে পড়ে মোনাস নামে একটি ট্যাবলেট দেয়া হয়েছিলো আমাকে। অসুস্থ হওয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে রাজু বলেন, একেবারেই নিরুপায় না হলে এমন রোগীদের হাসপাতালে যাওয়া উচিত না।

হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবা রোগীকে মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত করে ফেলে। আমাকে যেটা করেছে। সেখানে ১৭ দিন চিকিৎসা করার পর ১২ই এপ্রিল প্রথম তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফায়ও রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এরপর ১৮ এপ্রিল তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে । সেখানেও তিনি ১৪ দিনের আইসোলেশনে রয়েছেন।

সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর অভিজ্ঞতা কি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো জায়গায় শান্তি নেই। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মনে হয়েছে , আমি বড় ধরনের অন্যায় করেছি। আমি বাড়ি যাওয়ার পর এলাকায় মানুষজন চলাচল সীমিত করেছে। সেরে ওঠার পর যেদিন গ্রামের বাড়িতে এলাম চেনা পরিচিত লোকেরাও খবর নেননি।

আমি এসেছি এটা দেখেই বাড়ির কাছে পুরো রাস্তা খালি হয়ে গেল। আমি যেন ভিন গ্রহের কেউ এরকম মনে হচ্ছিল। এখনো এমন অবস্থা বিরাজ করছে। এই গণমাধ্যম কর্মী বলেন , করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রতি মানবিক হতে হবে। তারা অন্যায় করেনি যে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

সূত্র: মানবজমিন

ঢাকা, ২৬ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।