করোনায় বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রীদের ভিন্ন জীবন


Published: 2020-07-22 12:32:50 BdST, Updated: 2020-08-07 06:37:04 BdST

একটি অনুজীবের সংক্রমনে থমকে গেছে পুরো পৃথিবী। গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে প্রতিটি মানুষ। গত ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে সংক্রমনের ঝুঁকি এড়াতে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে বর্তমানে করোনার যে পরিস্থিতি তাতে ৬ আগস্টের পরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ পরিস্থিতিতে কেমন কাটছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ছাত্রীদের ঘরবন্দী জীবন? বিভিন্ন সৃজনশীল ও গঠনমূলক কাজে কিভাবে সময় ব্যয় করেছ তারা, সেশনজট আতঙ্ক, অনলাইন ক্লাস ও প্রিয় ক্যাম্পাসের মধুর স্মৃতি নিয়ে তারা কথা বলেছেন আমাদের প্রতিনিধি আর এস মাহমুদ হাসানে সাথে।

শেখ সোহানা জামান, হিসাব বিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ (চতুর্থ বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, করোনা নামক বৈশ্বিক মহামারীতে থমকে গেছে আমাদের স্বাভাবিক জীবন-ব্যবস্থা। কিছুদিন ধরেই বেশ কিছু বই, সিরিজ, মুভির লিস্ট সংগৃহীত ছিলো, সেগুলো শেষ করছি এই অবসরে। ক্যাম্পাসের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাদের বিভিন্ন ইভেন্টের ফান্ড কালেক্ট করে অসহায়দের পাশে থাকার চেষ্টাও করছি। এছাড়া বাসার কাজে সাহায্য এবং ফেইসবুকিং, অনলাইনে বিভিন্ন আর্টিকেল পড়েই সময় কেটে যায়।

শেখ সোহানা জামান

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কিছু বিভাগের ন্যায় গত ৬ জুলাই থেকে আমাদেরও অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে।সেশনজট নিরসনে অনলাইন ক্লাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনলাইন ক্লাস করতে আমার কোনো আপত্তি না থাকলেও, আমার সকল সহপাঠীরা অনলাইন ক্লাস করার মতো পরিস্থিতিতে নেই। অনলাইন হোক বা অফলাইন, ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই, সকলে মিলেমিশে এক সঙ্গে ক্লাস করবো।

নিজের ক্যাম্পাসের সব কিছু প্রচন্ড মিস করছি। তারমধ্যে ক্যাম্পাসের i+1 চত্বরের নানার চায়ের সাথে প্রাত্যহিক আড্ডা, হাফিজ মামার চা, রাতে হলের ছাদের আড্ডা উল্লেখ্য। আর সব থেকে বেশি মনে পড়ে শহরের পাশের অসহায় শিশুগুলোর কথা যাদের সাথে আমার বিগত ৩ বছরের সর্বোত্তম সময় গুলো কেটেছে।পরিশেষে বলতে চাই, ফিরে আসুক সুদিন, ফিরে যাবো প্রাণের ক্যাম্পাসে, প্রিয় মানুষগুলোর কাছে।

উম্মে কুলসুম হেনা, লোক প্রশাসন বিভাগ (চতুর্থ বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, করোনায় আলহামদুলিল্লাহ আমার খুব ভালো সময় কাটছে। আমি রান্না করতে খুবই পছন্দ করি। প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু করার ট্রাই করি। সন্ধ্যা হলে পরিবারের সবাইকে লেবু চা করে দেই। কাজিনদের সাথে মাঝেমধ্যে লুডু খেলি। ছোটভাইদের সাথে খুনসুটি করি। আব্বা আম্মার সাথে গল্প করি। এরকম আগে কখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। আমি কোরআন তাজবীদের সাথে পড়তে পারতাম না, আলহামদুলিল্লাহ করোনার এই সময়ে সেটা শিখে ফেলেছি।

উম্মে কুলসুম হেনা

 

আমার ক্যাম্পাসে অনেকে বিভাগে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে তবে আমার বিভাগে এখনো শুরু হয়নি, ঈদের পরে হবে শুনেছি। তবে সেশনজট নিয়ে আমি তেমন ভাবছি না, বেঁচে আছি এটাই অনেক। শিক্ষকরা যদি আন্তরিক হন তাহলে সেশনজট ক্ষতি অনেক খানি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আর শিক্ষার্থীদের উচিত এই ছুটিকে কাজে লাগিয়ে পড়াশুনা এগিয়ে নেয়া। এই ছুটিতে যদি অনলাইনে ক্লাস করে এগিয়ে থাকা যায় তাহলে সেশনজট নিরসনে সেটা অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে অনলাইন ক্লাসের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ। তাই যেসব শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সমস্যা আছে তারা পরবর্তীতে ক্লাসের রেকর্ড শুনে লেকচার বুঝে নিবে। তাছাড়া আমাদের আই টি ভার্চুয়াল ট্রেনিং যেহেতু স্ট্রং না, তাই অনলাইন ক্লাস আমাদের দেশের জন্য একটু চ্যালেন্জিং হয়ে পরেছে। তাই প্রশাসনের উচিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করে অনলাইন টিচিং ট্রেনিংয়ের ব্যাবস্থা করা। আমি আমার হলকে খুব মিস করি। মাঝে মাঝে হলের ছাদে, বকুল তলায় বন্ধুরা বসে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতাম, গান করতাম। এছাড়া হাফিজ মামার চায়ের দোকানের আড্ডা ও কোলাহল খুব মিস করছি।

বৃষ্টি বালা ঘোষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (তৃতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, এই সময়ের মতো এতো খারাপ সময় কখনোই বোধ হয় আশা ছিল না কারো। তবে এই সংকটকালীন সময়ে পরিবারের সাথে থাকতে পারছি এটাই বড় পাওয়া। প্রায় ৬ বছর পর পরিবারের সাথে এতোদিন আছি। বাসার পিচ্চি বাবুটাকে নিয়েই ব্যস্ত রাখি নিজেকে।

বৃষ্টি বালা ঘোষ

 

অনলাইনে মেয়েদের হ্যান্ড পেইন্টেড গহনা নিয়ে কাজ করার একটা পরিকল্পনা করেছি আর আশা করি সেটা খুব দ্রুতই বাস্তবায়ন করবো। অনলাইন ক্লাসের কারণে আশা করা যায় সবাই কমবেশি পড়াশোনার সাথে যুক্ত থাকবে বাকিটা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। যদিও শিক্ষার ক্ষতি অনলাইনে ক্লাসের মাধ্যমে পুরোপুরি পোষানো সম্ভব না তারপরেও শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে নিজেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখায় উত্তম।

ক্যাম্পাসের এমন কোন জায়গা নেই যেটা আমি মিস করিনা। ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণায় জমে আছে আমার ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতি।

উম্মে সাবিকুন্নাহার, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (তৃতীয় বর্ষ)।

তিনি হতাশা প্রকাশ করে ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, চারদিকে যখন সবকিছু লকডাউন তখন বাড়িতেই আমরা সবাই। এই সময়টাতেই আব্বুকে হারিয়েছি আমি, সেটা তিন মাস হতে চললো। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম বাড়িতে সবার সাথে থাকবো। কিন্তু পরে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। প্রথম দিকে সবকিছু থেকে দূরে ছিলাম আম্মু আর ভাইয়া কে নিয়ে। পরে ধীরে ধীরে কিছু করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সবারই রান্না বান্না, ঘরের কাজ, হাতের কাজ শেখা উচিত, সেগুলো শিখছি। তারপর অনলাইন থেকে কিছু কোর্স করছি, পাশাপাশি আম্মুর থেকে বিভিন্ন হাতের কাজ শিখছি। বলা যায় পুরোটা সময়ই পরিবারের সাথে থাকছি।

উম্মে সাবিকুন্নাহার

 

আমাদের ৬ জুলাই থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে।এই বছরের এখন সপ্তম মাস চলছে। আর লকডাউনের ৩ মাস হয়ে গেছে। যেখানে একটা সেমিস্টার শেষ হতে পারতো অথচ এখনও অব্ধি আমরা গৃহবন্দী। অনলাইন ক্লাসগুলোতে আমরা অনেকেই অংশগ্রহণ করতে পারিনা। এই সময়ে অনেকের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়ে পড়েছে। প্রশাসন যদি সেই সকল পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হয়তোবা তাদের কিছুটা উপকার হতো। কিন্তু অনলাইন ক্লাস থেকে আমরা আমাদের ক্যাম্পাসের ক্লাস গুলোর মত অতটা ইম্পুভ করতে আসলে পারিনা।

ক্যাম্পাসের ভেতর সবথেকে আমি আমার ডিপার্টমেন্টের করিডোরটাকে মিস করি। সেখানে সিনিয়র জুনিয়র ওই বন্ডিংটাই একটা ভালোবাসার জায়গা। তবে লেকপাড়ের বিকেল অথবা সন্ধ্যার জয়বাংলা চত্বরকেও মনে পড়ে। মনে পড়ে হাফিজ মামার দোকানের চা, তরিক মামার দোকানের চা যেগুলো একটা সজীবতা ছিলো।

মাহজাবীন সুলতানা বাঁধন, এপ্লাইড কেমিস্ট্রি এন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (তৃতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, এই টাইমে এক্সট্রা তেমন কিছুই করা হচ্ছেনা। তবে অনলাইনে উদেমিতে কোর্স করার চেষ্টা করছি। বাসার মানুষের সাথে ছাদে ঘোরাঘুরি আর গল্প করে সময় কাটে। আমাদের অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে এই মাসের প্রথম থেকেই।

সেশন জট নিয়ে এখন তেমন কিছু এখন ভাবছিনা, কারণ এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সুস্থ থাকাটাই বড় ইস্যু। জোরাজুরি করে ক্যাম্পাস খুললে যে ক্ষতিটা হবে তা সেশন জটের থেকেও ভয়াবহ, টপার হলেও এই চিন্তাটা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

মাহজাবীন সুলতানা বাঁধন

 

যেহেতু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা নাই তাই একটু হিমসিম খাচ্ছে। প্রশাসন থেকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা করে নেট কেনার খরচ দিলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ফলদায়ক হবে বলে মনে করি। মেইন গেটে হাফিজ মামার দোকানে আড্ডা দেয়া, লেকপাড় ও বাঁধন চত্বরের বিকালের আড্ডাটা, চা খাওয়াটা অনেক অনেক মিস করছি।

আজিজুন নাহার, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ (তৃতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, করোনার এই সময়টা কাটানো আমার জন্য একটু কষ্টসাধ্য বটে। বোরিং সময় কাটছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ওইভাবে সব সময় থাকা হয়ে ওঠেনা। এই জন্য কিছু স্টুডেন্ট পড়াই সময় কাটানোর জন্য আর বাসার টুকটাক কাজ করি, সন্ধ্যার পর ফ্যামিলির সবাই একসাথে আড্ডা দেই গল্প করি।

আজিজুন নাহার

 

আমাদের ডিপার্টমেন্টে ইতিমধ্যে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। সেশন জটের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইন ক্লাস এখন উপযুক্ত হলেও অনেক বেশি ভালো হবে তা নয়। তবে হ্যাঁ যতটুকু সম্ভব একটা কোর্স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। তবে অনেক স্টুডেন্ট আছে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব না। তাছাড়া দুর্বল নেটওয়ার্ক তো আছেই। প্রশাসন যদি এমন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করে তবে তাদের পক্ষে ভালো হবে।

ক্যাম্পাসের সব জায়গাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হতো তবে বিশেষভাবে ক্যাফে এরিয়াতে বেশি আড্ডা দেওয়া হতো। এছাড়া হাফিজ মামার দোকানে চা খাওয়া ও আড্ডা দেওয়া হতো, যেগুলো অনেক মিস করছি। সর্বদা ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখগুলোকে মিস করি, ক্যাম্পাসের ব্যস্ত দিন গুলো আমাকে সব সময় টানছে।

ইয়াহিয়া ফাইরোজ হিয়া, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (তৃতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, এই সময়ে আমার বেশির ভাগ অবসর সময় কাটছে পরিবারের মানুষগুলোর সাথে গল্প করে, মুভি, সিরিজ এগুলা দেখে। আর নিজের স্কিল বাড়ানোর জন্যও কিছু বই পড়াও শুরু করেছি। গত ২ জুলাই থেকে আমাদের ডিপার্টমেন্টে অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী অন্য একজন শিক্ষার্থীকে অনেকভাবে সহযোগিতা করতে পারে। যেমন- অনলাইন ক্লাসের নোট শেয়ার করার পাশাপাশি নিজেরা অনলাইনে নিজেদের স্কিলস বাড়ানোর জন্য আলোচনা আর প্লানিং করতে পারে। আর সব থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে নিজের বন্ধু-বান্ধবীদের মনোবল বাড়াতে হবে। যেন এমন পরিস্থিতিতে পারিবারিক নানারকম প্রতিকূলতা আর ক্লাস করতে না পারায় কেও যেন মানসিকভাবে ভেংগে না পড়ে।

ইয়াহিয়া ফাইরোজ হিয়া

 

এখন এমন একটা সময় যেখানে সেশনজট থেকে নিজের আর পরিবারের আর আশেপাশের মানুষদের সুস্থতা নিয়ে ভাবাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ৬ মাস এর একটা সেশনজট মেনে নেওয়া যায় এই খারাপ পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য। আর এই ৬ মাসে নিজের পারসোনাল স্কিল বাড়াতে কাজে লাগালে (যেমন- বই পড়া, পাবলিক স্পিকিং স্কিলস বাড়ানো, নানা রকম অনলাইন কোর্স ইত্যাদি) ফিউচারেও কাজে দিবে।

বাইরের উন্নত দেশগুলার মত উন্নত ইন্টারনেট সেবা আর তা ব্যবহার করার পারদর্শীতা আর সামার্থ্য আমাদের দেশের অনেক জায়গায় আর অনেক মানুষদের হয়ে পারিনি। আর অনলাইন ক্লাস করানোর মত পরিবেশ আমাদের দেশে এখনো হয়নি। এই অবস্থায় অনলাইন ক্লাস করা বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষেই সম্ভব না। তাই তাদের দিকটাও প্রসাশনকে দেখা উচিত। ক্যাম্পাসে নিজের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, তাদের সাথে ঘুরাঘুরি অনেক মিস করছি। সব থেকে বেশি মিস করি নিউ একাডেমিকের ছাদ, ক্লাসের ব্রেকে ওখানে হাটাহাটি করতাম আর আড্ডা দিতাম।

মুবাশ্বিরা নাজিয়াহ্ মেধা, লাইভস্টক সাইন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ (দ্বিতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, লকডাউনের পর থেকেই যেহেতু বাসায় থাকতে হচ্ছে তাই এই সংকটকালীন মুহূর্তে কিভাবে সময় কাটাবো তার একটি লিস্ট করেছিলাম। সময় সংকুলানের জন্য আগে যা যা করা হয়ে উঠেনি তা এখন করার চেষ্টা করছি। এই সময়ে প্রার্থনার জন্য অনেকটা সময় পেয়েছি, তাই কোরআন শিখছি আরও শুদ্ধভাবে। অনেক গল্পের বই, ভালো কিছু মুভি দেখেছি। আরো নতুন নতুন বিভিন্ন প্রকারের রান্না শিখেছি। পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারছি গল্প করে, টিভি দেখে। এছাড়া ইউটিউব থেকে ইংলিস স্পিকিং প্র্যাকটিস করছি রেগুলার। আমার ক্যাম্পাসে কিছু ডিপার্টমেন্টে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে, আমার ডিপার্টমেন্টে অনলাইন ক্লাস শুরু হবে ঈদের পর থেকে ইনশাআল্লাহ।

মুবাশ্বিরা নাজিয়াহ্ মেধা

 

আমি যেহেতু ভেটেরিনারি মেডিসিনের স্টুডেন্ট তাই দীর্ঘমেয়াদী একটি কোর্স (৫ বছর), সেখানে আবার করোনার জন্য সেশনজট সৃষ্টি হলে আমরা খুবই বিপদে পড়ে যাব। আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হব, চাকরি পেতে অনেকটাই দেরি হয়ে যাবে এমন দুশ্চিন্তায় আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পরতে পারি, লেখাপড়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারি।

এই সমস্যা নিরসনে আমি মনে করি, আমাদের অনলাইনের মাধ্যমে লেখাপড়া চালিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই মুহূর্তে শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনলাইন ক্লাস করলে আমাদের লং কোর্স গুলো কিছুটা হলেও শেষ করা সম্ভব৷ যেহেতু দেশের অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক সুবিধা নেই, আর অনেক শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রতিকূলতা ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস করতে, তাছাড়া দু:সহনীয় লোডসেডিং এখন সারাদেশের নিত্য দিনের ঘটনা।

ডিপার্টমেন্টে প্রতি ইয়ার অনুযায়ী ফেসবুক গ্রুপ খুলে সেখানে শ্রদ্ধেয় স্যার ম্যামরা লেকচার গুলো ভিডিও আকারে দিয়ে দিতে পারেন। যেটা প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা ডাউনলোড করে পড়তে পারেন। তাছাড়া প্রয়োজনীয় নোট, শীট মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ইনফরমেশন গ্রুপ্রে সরবারহ করা হলে আমরা অনেকটাই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারি বলে আমি মনে করি।

এক্ষেত্রে প্রশাসন যদি শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয় তাহলে সমস্যা অনেকটাই লাঘব হবে। এ মুহূর্তে আমি মনে করি প্রসাসনের সাহায্য শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে। ক্যাম্পাসের লেকপাড়ের বিকেলের আড্ডা, ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসের ঝালমুড়ি ফুসকা খাওয়া, হাফিজ মামার দোকানের চা খেতে খেতে বন্ধুদের আড্ডা খুবই মিস করছি।

আফসানা আশরাফী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (দ্বিতীয় বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, আমার মুলত দিন কাটে আম্মু আব্বুর সাথে গল্প করে আর তাদেরকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করে। এছাড়া গান, রান্নাবান্না, ফটোগ্রাফি, সাহিত্য এগুলো তো আছেই। অনলাইনে CKH, French learning এর মতো কিছু কোর্সও করছি। তাই আমার কাছে মনে হয় আমি খারাপ নেই। তবে এই সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে আমরা সবাই কম বেশি অবসাদগ্ৰস্থতায় ভুগছি, যার কারণ জীবনযাত্রার এই হঠাৎ পরিবর্তন, তবুও আমাদের উচিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম জগতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে বাসায় থেকে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল কাজ করার চেষ্টা করা এবং অবশ্যই নিজেদের পরিবারের সাথে ভালো মুহূর্ত গুলো উপভোগ করা।

আমাদের ডিপার্টমেন্টে গত সপ্তাহ থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। কিন্তু এটা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, তাই নিয়মিত হচ্ছে না। সেশনজট নিয়ে আসলে আমিও অনেক চিন্তিত। অনেক মূল্যবান কিছু সময় চলে যাচ্ছে আমাদের ছাত্রজীবনের। এক্ষেত্রে আমি আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার পক্ষে। যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু সেগুলো দেশের সব শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকার সমস্যার মত বড় নয়। তাই এই সীমাবদ্ধতা গুলোর সমাধান খুঁজতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। শুধু লাইভ অনলাইন ক্লাস না হোক, পিডিএফ ফাইল ও ক্লাসের ভিডিও সেন্ড করার মাধ্যমে অফলাইনেও ছাত্রছাত্রীরা তাদের পড়ালেখার ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবে বলে আমি মনে করি।

আফসানা আশরাফী

 

প্রশাসনের উচিত শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাখাতের উপর আরো বেশি নজর দেওয়া, শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেট সেবা সুলভ করা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া। তেমনি শিক্ষার্থীদেরও উচিত সময়গুলো নষ্ট না করে পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা।

হলে থাকার কারনে ক্যাম্পাসের প্রায় সব চত্বরগুলোই অনেক স্মৃতি জড়ানো, এর মধ্যে ঝালমুড়ি ও ফুসকা চত্বর, আই আর চত্বর এবং জয় বাংলা চত্বর অন্যতম। এছাড়া নতুন একাডেমিক ভবনের সামনে ও লিপু'স ক্যান্টিনে আড্ডা এবং পুরোনো শহীদ মিনারের সামনের গানের আসরগুলো অনেক মিস করি।

চা আমার অনেক পছন্দের হওয়ায় ক্যাম্পাসের প্রায় সব চায়ের টং গুলোতে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি আছে, এরমধ্যে বালুর মাঠ তো আমার প্রিয় জায়গা। যেগুলোর কথা না বললে নয়- বাদশা মামা ও মিন্টু মামার দোকান, অনেক সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে আছে জায়গাগুলোতে। আর শাম ভাইয়ের রেস্টুরেন্টের কথা তো বলতেই হয়। অনেক মিস করছি দিন গুলো।

সিনথিয়া সুমি, ইতিহাস বিভাগ (১ম বর্ষ)।

তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সারাদিন বাসায় বন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে৷ ক্যাম্পাসে থাকাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো, পড়াশুনা করা আর প্রশাসনিক ভবনের সামবে অবস্থান ছিলো। লেকপাড় ছিলো আমাদের আড্ডা দেওয়ার প্রিয় একটা জায়গা।ভীষণ মনে পড়ছে জয় বাংলা চত্বর আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কাটানো স্মৃতিগুলোকে। বাসায় সময় কাটছে কখনো গল্পের বই পড়ে, লেখালেখি করে, মা-বাবাকে কাজে সাহায্য করে, নতুন নতুন রান্না শিখে এবং বিভিন্ন রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে।

সিনথিয়া সুমি

 

বর্তমান দেশের যে পরিস্থিতি সেশনজট হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ এখন পর্যন্ত আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে অনলাইন ক্লাস করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি৷ তবে অনেক ডিপার্টমেন্ট অনলাইল ক্লাস হচ্ছে বলে শুনেছি।তবে আমাদের ডিপার্টমেন্টের কবে শুরু হবে তা এখনো সিদ্ধান্তহীন। আন্দোলনের কারণে এমনিতেই পিছিয়ে আছি আমরা। আশা করি প্রশাসন ইতিহাস ডিপার্টমেন্টর ব্যাপারটা একটু গুরুত্ব সহকারে দেখবেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় অংশ এসেছে গ্রামাঞ্চল থেকে । তাদের অধিকাংশের পরিবারই আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। তাদের অনলাইনে ক্লাস করার জন্য নেই কোন ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য নেই, আর বাসায় নেট সমস্যা তো আছেই। তবে অনলাইন ক্লাস চললেও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে আর পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারনে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়বে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পরিস্থিতি স্বভাবিক হলে ক্যাম্পাস খুললে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে, সিলেবাস কিছুটা কমিয়ে ক্লাস পরীক্ষা নিলে সেশনজট কিছুটা লাঘব হবে বলে মনে করি।

 

ঢাকা, ২২ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।