নেতা হওয়ার দেড় মাস না পেরুতেই একাধিক অডিও ক্লিপ ফাঁস


Published: 2019-09-12 13:11:47 BdST, Updated: 2019-12-11 06:14:23 BdST

ইবি লাইভ: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিব। নেতা হয়ে এসেছেন মাস দেড়েক আগে। তবে নেতা হওয়ার দুই মাস পূর্ণ না হতেই তার বিরুদ্ধে নেতা বানিজ্য ও নিয়োগ বানিজ্যের একাধিক অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। আঞ্চলিক নেতা বাণিজ্য সম্পর্কিত ৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অডিওতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদুল হাসান নামের এ প্রার্থীকে ছাত্রলীগের নেতা তৈরির বিষয়ে জনৈক ব্যক্তির সাথে কথা বলে রাকিব।

তবে ওই ব্যক্তির নাম জানা যায়নি। তাদের ফোনালাপে উঠে এসেছে রাকিবের কাঠ-খড়ি পুড়িয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ম্যানেজের বিষয়টি। ‘৪০-এ নেতা হয়েছি, ওটা ছয়মাসে ডাবল হয়ে উঠে আসবে’ রাকিবের এমন কথাও তাদের ফোনালাপে শোনা যায়। এর আগে গত রবিবার রাকিবের ড্রাইভার নিয়োগের ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে সাধারণ সম্পাদকের সাথে এক ব্যক্তির গাড়ি চালক নিয়োগ সম্পর্কিত কথা হয়েছে। ক্লিপ দুটি ভাইরাল হলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

পাঠকের উদ্দেশ্য নেতা বানিজ্যের অডিও ক্লিপের কথোপকথন তুলে ধরা হলো:
অজ্ঞাত ব্যক্তি: পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওই ছেলেটা, ওর বাড়ি টাঙ্গাইল।
রাকিব: নতুন এই কমিটিতে পোস্ট কি হইছে?
অজ্ঞাত ব্যক্তি: কি সম্পাদক যেন! সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সেক্রেটারীর সাথে ভালো সম্পর্ক, ভিসির সাথে ভাল সম্পর্ক। ঠিক আছে? তোমার মতই ভিসির সাথে ভাল সম্পর্ক। তোমার... টাঙ্গাইলের ওই ছেলে, ওই ছেলের হচ্ছে টাকা পয়সার অভাব নাই। সেই পরিবারের ছেলে নেতা হবে। কি পলিসি খাটাবো?
রাকিব: ঢাকা যায়ে খাটতে হয়। খাটতে বলতে কি, বহুত কাঠ খড়ি আছে, তবে এখন আমার যে হিসাব-নিকাশ, রাব্বানী ভাইয়ের সাথে আমার যে সম্পর্ক, এ আঞ্চলিক যে বিষয়টা আমি যদি ভাই রে বলি ভাই আমার কথা শুনবে। ভাই আমাকে অলরেডি বলেছে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি: বিষয়টা হচ্ছে আমি বারবারই যে কথাটা বলেছি রাব্বানীর তোমার লবিংটা মেইনটেইন করতেই হবে..
রাকিব: আমি বলি, আমি আপনারে বলি ওরে নেতা হতে হলে, ভিসি স্যার যদি বলে তাহলে ও নেতা হতে পারবে। আর ভিসি স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। ভিসি স্যার রে আমি এখন পযর্ন্ত কারো নাম বলি নাই।
অজ্ঞাত: আর কথা হচ্ছে তোমার মেইনলি যে জিনিষটা দেখতে চাই। বাঁধন যেহেতু লোকাল।
রাকিব: বাঁধন যা বলবেনে তাই শুনবোনে।
অজ্ঞাত: ওনার সাথে ইয়ে সব তোমার ঠিকঠাক রাখা দরকার। বলিছে বিশ্ববিদ্যালয় দেখবে। এখন ধরো তোমার আমার দুইটা কাজ হচ্ছে খুব জরুরী। এখন আমার যে কারণে হয় ইয়েস অর নো নেগেটিভ ওদের তিন-চার দিনের ভিতরে তোমারও জোর আছে একটা, আমারও জোর আছে।
রাকিব: হুমম..
অজ্ঞাত: ঠিক আছে? সেই ব্যাপারটা ওদের সাথে সেভাবে কথা বলা যায়। ওরা খুব নাছোড়, যে ওর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমরা খাব। কারণ সরাসরি হচ্ছে রাব্বানী যে লাইনে আসুক ওই লাইনে গেলেই তোমার ধর, তোমার ধর এর ভিতরে যে ইনভেস্টম্যান্ট সেটাও কিন্তু তোমার থেকে যাবে।
রাকিব: এই ইনভেস্টম্যান্টটা বাদ দেন। . . .

অজ্ঞাত ব্যক্তি: যোগাযোগটোগ আছে। মুটামুটি না তো মনে করো হট সম্পর্ক হতে হবে। এখন মূলত ও যে জায়গাতে, মেইনলি বড় লোকের ছেলে তো! ঠিক আছে?
রাকিব: হুমমম
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ও এদিকে রাজনীতির সাথে হচ্ছে কমিটিতে-টমিটিতে আছে বাদবাকি টাকা পয়সা দিয়ে হচ্ছে ও বের হয়ে আসবে। যে কারণে এত ইয়ে করা। আমার কাছে বলছে টাকা পয়সার কোনো সমস্যা নাই। ঠিক আছে?
রাকিব: আচ্ছা! আপনে ওরে আমারে একটু ফোন দিতে বলেন, আমার নাম্বারটা দিয়ে একটু ফোন দিতে কন। আমি ওর সাথে একটু ডিরেক্ট কথা বলি...
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ও আচ্ছা.. আর এমনি আমার কাছে একটু প্রাথমিক ধারণা চাইছে। ঠিক আছে? আমার কাছে নরমালি জিজ্ঞেস করছে হচ্ছে ফুফাতো ভাইয়ের মাধ্যমে। যে যে হচ্ছে টাকা পয়সা? আমি বললাম যে টাকা পয়সা নিয়ে কোনো সমস্যা নাই। টাকা পয়সার একটা ধারণা দিতে বলছে। কাজ হতে হবে, কাজ হতে হবে..
রাকিব: হুমম.. কাজ হতে হবে।

অজ্ঞাত ব্যক্তি: তোমার ইয়ে সম্পর্কে তুমি যেভাবে বলছিলে আরকি, বিভিন্নভাবে কমিটি ভাঙ্গা তারপর গড়া, তারপর অন্যান্য ঝামেলা, প্রিন্ট-ট্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তোমার তো একটা বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে গেছে।
রাকিব: হুমম.. হিউজ.. হিউজ..
অজ্ঞাত ব্যক্তি: সেই ফিগার তো আমি জানি, তা প্রায় মনে হয় চল্লিশের কাছে হবে..!
রাকিব: হুমম..
অজ্ঞাত ব্যক্তি: এসব নিয়ে ওর হচ্ছে কোনো আপত্তি নাই, ওর কথা হচ্ছে যে কোনোভাবে হতে হবে। এখন কোন লাইনে হবে সেটা বড় কথা না, এখন করবা তুমি.. হতে হবে।
রাকিব: হুম হতে হবে..
অজ্ঞাত ব্যক্তি: এখন ধরো সেক্ষেত্রে তোমারও, তুমি যেহেতু খরচপত্র করি আসছো, আমি চাই তোমার এই খরচটা পূরণ হোক। ঠিক আছে?

রাকিব: না ভাই শোনেন কোনো ছেলে রে ইয়ে করতে গেলে... । এখন আমার যা খরচ হইছে এটা কোনো ব্যাপার না। ওইটা ছয় মাস গেলে সব ডাবল হয়ে যাবে, সমস্যা নাই। কিন্তু ওরে হচ্ছে ফোন দিতে কন আমি গিয়ে হচ্ছে এক জায়গায় দেখা করে আসবোনি।
অজ্ঞাত ব্যক্তি: শোভন বা রাব্বানী দুইটা লাইনই তো তুমি কনফার্ম করতে পারবা?
রাকিব: হ্যাঁ, হ্যাঁ কনফার্ম করতে হবে।
অজ্ঞাত ব্যক্তি: না সেটা না, বলছি যে শোভন বা রাব্বানী দুইটা লাইনই তো তুমি কনফার্ম করতে পারবা?
রাকিব: হ্যাঁ, হ্যাঁ পারব, দুইটাই পারবো।
অজ্ঞাত ব্যক্তি: সে জন্যই বলছি যে টাকার লাইনে ওর টাকার কোনো সমস্যা নাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমার সাথে কথা বলার কথা বলতেছি। ঠিক আছে?
রাকিব: হুমম..

অজ্ঞাত: আর সেটা যদি তুমি মনে করো সেক্ষেত্রে তুমি বলবা যে টাকার লাইনে হলে এভাবে- কিভাবে কি করতে হয় সেটা তোমার দায়িত্ব তুমি শোভনরে দিয়ে না রাব্বানীরে দিয়ে করবা, ওর মেইনলি সর্বশেষ যে কথা আমারে বলেছে ঠিক আছে? সে কথাটা এরকম ওর মুটামুটি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা আছে, রাজনৈতিক পরিবার, ও নেতা হবে টাকা কোনো ব্যাপার না। কোনভাবে কি করবা, রাব্বানীর কাছে গোপন থাকবে কি করবা? এইটা পরে হবে। সেক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে আমি তোমাকে বলতেছি। তুমি. . . .
রাকিব: ও যদি টাকা দিয়ে কমিটি করতে না চায়, তাহলে আমি অরেক জায়গায় কিছু করব।
এগুলো বুঝায় দেন।

এর আগে গত রোববার রাকিবের ড্রাইভার নিয়োগের ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। কথোপকথনটি ঈদ-উল-আযহার আগে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ সম্পাদকের সাথে এক ব্যক্তির গাড়ি চালক নিয়োগ সম্পর্কিত ফোনালাপ শোনা যায়। ফোনালাপে রাকিব তার কাছে টাকা দাবি করে। তিনি ঈদের আগে কিছু এ্যাডভান্স দেওয়ার ব্যাপারে বলে। নিয়োগের অডিও ক্লিপটি এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

পাঠকদের জন্য এ অডিও ক্লিপটির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-

ব্যক্তি: আরেকটা ব্যাপারে শুনলাম, শুনে রাখো..
রাকিব: ভাই কোনটা?
ব্যক্তি: বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ড্রাইভার-ট্রাইভার নিয়োগ হবে এরকম কোনো....
রাকিব: ওইটাতো ঈদের পরে হবে। এখন আমি হচ্ছে.....আপনার হাতে কি কিছু আছে?
ব্যক্তি: আছে, আছে। ঈদের আগে চাইলে কিছু এ্যাডভান্স নিতে পারো
রাকিব: তাইলে ঈদের আগে কিছু ব্যবস্থা করে দেন আমারে।
ব্যক্তি: আচ্ছা ঠিক আছে।
রাকিব: আমি ঢাকায় যাচ্ছি, আর শোনেন ফোনে মনে হয় খুব রিক্স। এখন আমি মনে করেন যে.. বিশ্ববিদ্যালয়-টিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপার-স্যাপার খুব ই-তো। ঈদের পরে নিবে মনে হয়।
ব্যক্তি: হ্যাঁ হ্যাঁ..

রাকিব: আপনি মিডিয়া হয়ে কথা বলেন যদি হয় কালকের মধ্যে কনফার্ম করেন। আমি ব্যবস্থা করে দিবোনে।
ব্যক্তি: আচ্ছা..
রাকিব: আমি কারো সাথে কথা বলি নাই বুঝছেন, একটু ঝামেলার মধ্যে আছি
ব্যক্তি: তুমি আমাকে একটা ধারনা দিয়ে যাও যে, ড্রাইভারের ব্যাপারে ফিগার কতো (কত লাগতে পারে) এই ধারনাটা দিয়ে দাও।
রাকিব: ও.. আমি বলি আপনারে.. আমি ম্যাসেঞ্জারে ফোন দিচ্ছি আপনারে..

গত রোববার এই অডিওটি ফাঁস হলে সেদিনই এক আইডির বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় জিডি করে রাকিব। অভিযুক্ত রাকিবের বিরুদ্ধে এর আগেও নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যে যুক্ত রুহুল আমিনের সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা যায়। ইবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগের দিনেও তার বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয় এক জাতীয় দৈনিকে।

এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সাথে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চালালেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত সাংবাদিকদের বলেন, ‘অডিওটা আমি শুনেছি। তবে এ বিষয়ে আমার কোন আইডিয়া নেই। রাকিবের কাছে ফোন করে কারণ জানতে চেয়েছি। তাকে শোকজ করা হবে। সে কেন আর কার সাথে কথা বলেছে এর কারণ অবশ্যই তার কাছে জানতে চাওয়া হবে।’

 

ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।