লেবাসের বাইরে একরূপ ভেতরে অন্যরূপসামীম মোহাম্মাদ আফজালের আমলনামা


Published: 2019-06-20 13:53:21 BdST, Updated: 2019-12-11 07:44:07 BdST

লাইভ  প্রতিবেদকঃ সামীম মোহাম্মাদ আফজাল। হালে আলোচিত, সমালোচিত। লেবাসের বাইরে একরূপ ভেতরে অন্যরূপ। আসলেই তিনি বহু রূপী। তার মিস্টি কথার আড়ালে নানান কূট কৌশল হর-হামেশাই ধরা পড়তো। তার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বদমেজাজী, বেদায়াতি ও শিরকি সবই চোখে পড়ে। কিন্তু নিরবে সইতে হতো। ভয়ে কউ মুখ খুলতে রাজি হতো না। তিনি পরিচয় দিতেন মরহুম শেখ কামালের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। ইসলামের কান্ডারী সেজে গড়ে তুলেছেন টাকার পাহাড়। তিনি আর কেউ নন তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মহাপরিচালক। এসব দুড়ন্তপনা আর ধূর্ত স্বভারে কারণে একমাত্র ছেলে অনিক আত্মহত্যার পথ বেচেঁ নিয়েছিল বলে ঘনিষ্ট সূত্রে জানাগেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেও নানান তথ্য দিয়ে ধোকা দিয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন। তার কুকীর্তি আর দুর্নীতি এখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সকলের মুখে মুখে। সারাদেশে বিষয়টি যেন ওপেন সিক্রেট।

বিশিষ্ট আলেম উলামারা বলেছেন তিনি বাংলাদেশে শিরক ও বেদায়াত চালু করার এজেন্সি নিয়েছিলেন। এর জন্যে দেশী বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা থেকে গ্রহনও করেছেন মোটা অংকের টাকা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দুর্দান্ত প্রতাপে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। একসময় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দারোয়ান-পিয়ন সবাই তার গুণকীর্তনে মগ্ন থাকত। দল বেঁধে আশপাশে ঘুরঘুর করত। ইফা কর্মকর্তা কিংবা আলেম-উলামাদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে তার এক ধমকে পিনপতন নীরবতা নেমে আসত গোটা সভাকক্ষে। এভাবে চালিয়েছেন ইফা

বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের দোকানের পিলার ভেঙে দোকান সম্প্রসারণের ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি ইফা’র এক পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর সঙ্গে মতবিরোধ হয় তার। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে ইফা পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করায় ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে মহাপরিচালককে শোকজ করা হয়।

নানান কারণ ও সম্পর্কের অবনতির জেরে ইফা মহাপরিচালক পদত্যাগ করছেন- এমন গুঞ্জনও ওঠে। গত শনিবার সামীম মোহাম্মদ আফজাল ইফা কার্যালয়ে পদত্যাগ করতে যান! এ সময় তিনি ইফা’র ৫০টি ফাইল সঙ্গে করে নিয়ে আসতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের সচিব বাধা দেন। বাধার মুখে তিনি ফাইল রেখে চলে আসেন। এরপর আর অফিসে আসেননি সামীম মোহাম্মদ আফজাল।

আত্মীয়করণের অভিযোগঃ
মিস্টি কথা আর মিথ্যা বলতে তিনি সিদ্ধহস্ত। মাজার, কবর আপীর সাহেবদের ব্যাপারে ভালভাবে কিছু বলতে পারলেই তিনি হয়ে যেতেন সামীমের কাছের মানুষ। সামীম আফজাল যোগদানের পূর্বে তার ভায়েরা-ভাই সৈয়দ শাহ এমরান এখানে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, গত ১০ বছরে ডিজি তার অসংখ্য আত্মীয়-স্বজনকে অন্যায়, অনিয়ম ও অবৈধভাবে এখানে চাকরি দেন। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন- সহকারী পরিচালক পদে ডিজির আপন বোনের মেয়ে ফাহমিদা বেগম (বর্তমানে কক্সবাজারের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত)।

মহিলা কো-অর্ডিনেটর অফিসার পদে আরেক বোনের মেয়ে সিরাজুম মুনীরা (বর্তমানে দীনী দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের মহিলা শাখায় কর্মরত)। এছাড়া সহকারী পরিচালক পদে আপন ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি), বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম পদে আপন বোনের ছেলে মাওলানা এহসানুল হক, উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে ভাইয়ের ছেলে মো. শাহ আলম (বর্তমানে চট্টগ্রামে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত), প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে কর্মরত।

আরেক ভাইয়ের ছেলে মো. রেজোয়ানুল হক (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত), হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে আরেক ভাইয়ের ছেলে মো. মিসবাহ উদ্দিন (৫৬০ মডেল মসজিদ প্রকল্পে কর্মরত)। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ডিজির ভাতিজা মো. রেজোয়ানুল হককে প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

ওই পদে যোগ্যপ্রার্থী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নাসির উদ্দিন শেখকে বাদ দিয়ে নম্বর বাড়িয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত ডিজির ভাগনী ফাহমিদা বেগম লিখিত পরীক্ষায় ৬০ নম্বরের মধ্যে পান ৩০। কিন্তু ২৮ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় তিনি পান ২৭ নম্বর। ডিজি মামার কারণে ফাহমিদা বেগম ২০১০ সালের জুন মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ‘সহকারী সম্পাদক’ পদে চাকরি পান। তিনি যে পদে নিয়োগ পান তা সৃজিত কোনো পদ নয়। মনগড়া ও পারস্পরিক যোগসাজশে তাকে চাকরি দেয়া হয়েছে।

ডিজির আরেক ভাতিজা মো. শাহ আলমকে ‘উৎপাদন ব্যবস্থাপক’ পদে চাকরি দেয়া হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসে ‘কম্পিউটার অপারেটর’ পদে দৈনিক ভিত্তিতে চাকরি করেছেন। উৎপাদন ব্যবস্থাপক পদে বয়সসীমা চাওয়া হয় ৩০ বছর। কিন্তু এসএসসির সনদ অনুযায়ী শাহ আলমের বয়স তার চেয়ে বেশি। তার শিক্ষার সনদে ঘষামাজার চিহ্ন পাওয়া যায়।

লেবাসের বাইরে একরূপ ভেতরে অন্যরূপ! পরী মণির জন্মদিন উদযাপন

আর্টিস্ট পদে শ্যালিকা ফারজিমা মিজান শরমীন (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে ভায়েরার ছেলে মো. মোস্তাফিজুর রহমান (বর্তমানে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে বন্ধুর মেয়ে সৈয়দ সাবিহা ইসলাম (বর্তমানে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে আরেক আত্মীয় আবদুল্লাহ আল মামুন (বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ছাপাখানায় উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত), সহকারী পরিচালক পদে আরেক আত্মীয় ইলিয়াস পারভেজ (মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পে কর্মরত)।

ডিজির ছেলে অনিকের গৃহশিক্ষক আতিয়ার রহমানকে প্রোগ্রাম অফিসার পদে (ইসলামিক মিশন প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত) নিয়োগ প্রদান করেন। এগুলো সবই প্রথম শ্রেণির পদ।
এছাড়া ভাইয়ের ছেলে মো. রাসেল মিয়াকে ইসলামিক মিশনের ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান পদে, আপন ভাইয়ের ছেলে মুনিমকে এলডিএ পদে, মাহমুদকে এলডিএ পদে, মাহমুদের স্ত্রীকে ল্যাব-টেক পদে, রতনকে ফিল্ড সুপারভাইজার পদে, ফয়সালকে হিসাবরক্ষক পদে, আনোয়ারুল আজিমকে উচ্চমান সহকারী এবং আনোয়ারুল হককে গবেষণা সহকারী পদে নিয়োগ দেয়। এসব নিয়োগে কোনো নিয়মনীতি কিংবা মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়নি। তার কথা আর নির্দেশনা ছিল আইনের মতো।

ইফা মহাপরিচালকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, সামীম মোহাম্মদ আফজাল ক্যান্সারে আক্রান্ত। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তিনি পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছিলেন। যে সামীম আফজালের একটু অনুগ্রহ পেতে ইফা’র সবাই মুখিয়ে থাকতেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ তার পাশে নেই। খোদ ইফা’র কর্মকর্তারাই এখন ফাঁস করছেন মহাপরিচালকের নজিরবিহীন দুর্নীতির অজানা নানা তথ্য।

তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ, নিয়ম বহির্ভূতভাবে দৈনিক-ভিত্তিতে শত শত কর্মচারী নিয়োগ, মাজার, কবর ও ভন্ডদের লালন, অন্যের দ্বারা বই লিখিয়ে লাখ লাখ টাকার রয়্যালিটি গ্রহণ, বিনা কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাহারসহ নানা অনিয়মের তথ্য এখন বেরিয়ে আসছে। কোন সংস্থা তদন্ত করলে আরও বেশী তথ্য মিলবে বলেও সংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন।

হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে কর্মরত ডিজির অন্য একজন ভাতিজা মো. মিসবাহ উদ্দিনের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়, অথচ তাকে ঢাকা জেলার কোটায় চাকরি দেয়া হয়েছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম পদে কর্মরত ডিজির ভাগ্নে মাওলানা এহসানুল হকের চাকরি লাভের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নাই। এ বিষয়ে হাইকোর্টেও মামলা হয়েছে।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে লালনঃ
সামীম তার ভন্ডামী আর বেদায়াতি চালু রাখতে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ব্যবহার করতেন। তিনি সামীমের ঘনিষ্ঠ। ইফার পরিচালক মু. হারুনুর রশিদের (ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা) ছেলে নাজমুস সাকিবকে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে (বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় সহকারী পরিচালক পদে), ডিজির ঘনিষ্ঠ পরিচালক তাহের হোসেনের স্ত্রীর বোনের মেয়ে সাহিনা আক্তারকে সহকারী পরিচালক পদে (বর্তমানে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত), পীরভাই জালাল আহমদের স্ত্রী মাহমুদা বেগমকে প্রোগ্রাম অফিসার পদে (কেন্দ্রীয় অর্থ ও হিসাব বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত)।

ডিজির আরেক ঘনিষ্ঠ পরিচালক এ বি এম শফিকুল ইসলামের আত্মীয় হোমায়রা আক্তারকে পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে (পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত) নিয়োগ দেন। আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নিয়োগ দিতে তিনি কোনো বিধি-বিধানের ধার ধারেনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চরম জালিয়াতিরও আশ্রয় নেন। যেমন- আর্টিস্ট পদে কর্মরত ডিজির শ্যালিকা ফারজিমা মিজান শরমিনের চাকরির আবেদনেরই কোনো যোগ্যতা ছিল না। ওই পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর। অথচ তার চারুকলার কোনো ডিগ্রি নাই।

দৈনিক-ভিত্তিতে কর্মচারী নিয়োগঃ
সামীম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে দৈনিক-ভিত্তিতে ৬০০-৬০৫০ জন কর্মচারী নিয়োগ দেন সামীম মোহাম্মদ আফজাল। আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি, পদ রক্ষা, আত্মীয়করণ ইত্যাদির জন্য তিনি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে দৈনিক-ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে তাদের নিয়মিতকরণ করা হয়। যদিও দৈনিক-ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার কোনো বিধি-বিধান নেই।

মামা শ্বশুরকে ১৪ লাখ টাকা প্রদানঃ
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজালের মামা শ্বশুর নারিন্দার মশুরীখোলা দরবারের পীর শাহ মোহাম্মদ আহছানুজ্জামান। ‘বোগদাদী কায়দা’ নামে একটি আমপারা শাহ মোহাম্মদ আহসানুজ্জামানের নামে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগ থেকে ছাপা হয়। ওই বইয়ের রয়্যালিটি বাবদ তাকে ১৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। কারণ বোগদাদী কায়দা সুপ্রাচীন কাল থেকে এ উপমহাদেশে কুরআন শরীফ শেখার জন্য পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এটার লেখক শাহ আহসানুজ্জামান নন। অথচ ডিজি তার মাম শ্বশুর পীর শাহ আহছানুজ্জামানের নামে লাখ লাখ বোগদাদী কায়দা ছেপে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

ব্যালে নৃত্য প্রদর্শন করেন ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল

রয়্যালিটি গ্রহণঃ
মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের আগে সামীম মোহাম্মদ আফজালের নিজ নামে কোনো বই ছিল না। কিন্তু ইফার ডিজির দায়িত্ব হওয়ার পর তার নামে ২৫টির অধিক বই বের হয়। অভিযোগ রয়েছে, একটি বইও তিনি নিজে লেখেননি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও নুরুল ইসলাম মানিক অধিকাংশ বই লিখে দিয়েছেন। অন্যের লেখা বই ডিজি নিজের নামে ছাপিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে লাখ লাখ টাকার রয়্যালিটি গ্রহণ করেছেন। একটু তদন্ত করলেই এসব তথ্য বেরিয়ে আসবে।

প্রেসকে ৭০ লাখ টাকাঃ
জানাগেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস দেশের প্রথম শ্রেণির ছাপাখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখান থেকে লাখ লাখ পবিত্র কুরআনুল করীম ছাপানো হয়। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ছাপাখানার উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও শুধুমাত্র পদ রক্ষার জন্য সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর প্রেস থেকে অবৈধভাবে ৭০ লাখ টাকার কুরআনুল করীম ছাপানো হয়। এনিয়ে নানান মুখরোচক নানান কথা এখনও শুনা যায় ইফায়।

মেশিন ক্রয়ে সোয়া কোটি টাকা লোপাটঃ
সংশ্লিস্ট একাধিক সূত্রে জানাগেছে ২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেসের জন্য এক কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হলেও মাত্র ৪৫ লাখ টাকায় মেশিন কেনা হয়। এক্ষেত্রে প্রায় সোয়া কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ফাইলে দেখানো হয়েছে হাইডেলবার্গ জার্মানির মেশিন কিন্তু বাস্তবে কেনা হয়েছে চায়না মেশিন। দুর্নীতির টাকা ডিজিসহ তার ঘনিষ্ঠ পরিচালক হারুনুর রশিদ, তাহের হোসেন, সাহাবউদ্দিন খান ও হালিম হোসেন খান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়টি নিয়ে সেসময় ফাউন্ডেশনে তোপেরমুখে পড়েন স্বয়ং ডিজি। পরে শাসিয়ে সব ঠিক করা হয়।

সামীম আফজালের সঙ্গে নৃত্যু শিল্পী

 

ব্যালে নৃত্য প্রদর্শনঃ
২০১০ সালে এক অনুষ্ঠানে ব্যালে নৃত্য প্রদর্শন করে ডিজি সামীম মোহাম্মদ আফজাল ইসলাম ধর্মের অপমান করেন। এর বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের আলেম-উলামা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তার পদত্যাগও দাবি করা হয়। ওই সময়ে কৌশলে তিনি রক্ষাপান। তিনি একটি দেশের রাষ্ট্রদূতকে তিনি ব্যবহার করেছেন। তাকে দিয়ে তদবীর করিয়েছে বলে জন শ্রুতি রয়েছে। 

১০ পদে জালিয়াতিঃ
ইফার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে সামীমের আমলে। সংশ্লিস্টরা জানান, ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত সিলেকশন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। যথারীতি কার্যবিবরণী প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু নিয়োগে প্রক্রিয়ার প্রতিটি পরতে পরতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থাকায় নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন সচিব ড. আলফাজ হোসেন রেজুলেশনে সই করেননি।
অথচ নিয়োগ কমিটির সকল সদস্য রেজুলেশনে সই করেন। দুর্নীতিবাজগণ এ নিয়ে বিপাকে পড়ে যান। পরবর্তীতে ড. আলফাজ হোসেনকে ছুটি দেখিয়ে তার লিভ-সাবস্টিটিউট হিসেবে ফাউন্ডেশনের প্রভাবশালী পরিচালক তাহের হোসেনকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে ২০১৬ সালের ২৬ নভেম্বর সিলেকশন কমিটির আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও একটি রেজুলেশন হয়। সেখানে দেখা যায় যে, একটি নিয়োগের বিপরীতে দুটি রেজুলেশন গৃহীত হয়। যা মহাজালিয়াতি, অনিয়ম ও অন্যায় বলে মন্তব্য করেন ইফার একাধিক কর্মকর্তা।

ওই দুটি রেজুলেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাওয়া মো. রেযোয়ানুল আলম ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভার রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১২ পান কিন্তু ২৬ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সভার রেজুলেশনের মৌখিক পরীক্ষায় ১৬ নম্বর দেখানো হয়।

একই কায়দায় আর্টিস্ট পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিজির আত্মীয় ফারজীমা মিজান শরমীন প্রথম রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১৫ পান কিন্তু পরের সভার রেজুলেশনের মৌখিক পরীক্ষায় ১৭ নম্বর দেখানো হয়। একইভাবে সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মো. নাজমুস সাকিব আগে ও পরের সভার রেজুলেশনে মৌখিক পরীক্ষায় ১৮ ও ১১ নম্বর দেখানো হয়।
এভাবে দুটি রেজুলেশনে প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরে ব্যাপক গড়মিল দেখা যায়।

নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নেয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর প্রয়োজন মোতাবেক কম-বেশি করা হয়। এ নিয়োগে সবচেয়ে বড় অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্যপ্রার্থী থাকার পরও এ কোটা থেকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমন এক চাকরিপ্রার্থী নাসির উদ্দিন শেখ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে তার নিয়োগ পাওয়ার কথা। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে প্রকাশনা কর্মকর্তা পদে ডিজির ভাতিজা রেজোয়ানুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়। সহকারী লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মো. নাজমুস সাকিব ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কোটায় চাকরি পান। তার পিতা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রভাবশালী সাবেক পরিচালক মু. হারুনুর রশিদ। কিন্তু তার মুক্তিযোদ্ধার সনদ ভুয়া। ডিজির সহায়তায় এভাবে বিভিন্ন অনিয়ম করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ইফা’র ডিজির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সামীম মোহাম্মদ আফজাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রয়েছে- এমন কথা বলে প্রভাব খাটাতেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে দুদকও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সাসপেন্ড এর হিরিকঃ
অসংখ্য নিরিহ লোকের রিজিকে হাত দিয়েছেন সামীম মোহাম্মাদ আফজাল। তার কথার বাইরে গেলেই জামাত-শিবিরের তকমা লাগিয়ে সাসপেন্ড করা হতো। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো কারণ ছাড়াই বহু সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাসপেন্ড করে চেখের পানি ঝরিয়েছেন।

সর্বশেষ তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ও মার্কেট বিভাগের পরিচালক এবং বঙ্গবন্ধুপরিষদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন শাখার আহ্বায়ক মুহাম্মদ মহীউদ্দিন মজুমদারকে গত ৩ জুন কোনো কারণ ছাড়াই সাসপেন্ড করেন। পরবর্তীতে ধর্ম মন্ত্রণালয় তার এ অবৈধ বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে। সেখান থেকে মূলত তার পদত্যাগের দাবিতে মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সোচ্চার হন।

সংশ্লিস্টরা বলেন, বায়তুল মোকাররম মসজিদের পিলার ভাঙার ঘটনায় যে পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিলেন তিনি নিজেও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একসময় তিনি ছিলেন ডিজির খুব কাছের লোক। ইফা ডিজির দুর্নীতির তদন্ত হলে বহু কর্মকর্তার নাম আসবে বলেও মন্তব্য করেন অনেকেই।

এছাড়া তিনি ফাউন্ডেশনের পরিচালক মো. আফজাল উদ্দিন ও পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ারসহ অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সামান্য অজুহাতে সাসপেন্ড করেন। ফলে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অবর্ণনীয়-কষ্ট নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইফা মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি নিজস্ব ও পরিচিত ফোন ছাড়া কারো ফোন রিসিভ করেন না বলে কেউ কেউ জানিয়েছেন।

ঢাকা, ১৯ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।