আম্ফানের থাবায় ২২ প্রাণ, হদয়ে হাজারো ক্ষতচিহ্ন!


Published: 2020-05-23 11:57:14 BdST, Updated: 2020-08-07 03:20:35 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: অসহনীয় যন্ত্রনায় কেবলই ছটফট। হৃদয় ভরা বুক ফাটা কান্না। হাজারো ক্ষত চিহৃ রেখেগেছে সুপার সাইক্লোন আম্ফান। আম্ফানের তাণ্ডবলীলা এখন উপকূল অঞ্চলে। কেবল হাহাকার। এর ভয়াল ছোবলে কেড়ে নিয়েছে ২২ টি তাজা প্রাণ। ভেঙে দিয়েছে অনেকের স্বপ্ন। তছনছ করেছে অনেকের স্বপ্ন। প্রায় এগারশ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ, রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামোর পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষি এবং চিংড়ি ঘেরসহ মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরকারী হিসাবে দেশের ২৫টি জেলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগের দিন থেকে বিদ্যুৎহীন পড়ে। এই ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবের চিত্রটা ছিল ভিন্ন ধরণের। উপকূলীয় অঞ্চলের বাইরে যে জেলাগুলোতে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় হয় না, এসব জেলাতেও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিমের জেলার পানের বরজ থেকে শুরু করে রাজশাহীতে মৌসুমী ফল আম এবং উত্তরের অন্য জেলাগুলোয় ধান এবং সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এসব এলাকা থেকে অনেকে বলেছেন, বড় ধরণের ঘূর্ণিঝড়রের অভিজ্ঞতা এবং প্রস্তুতি না থাকায় এর তাণ্ডব দেখে তারা হতবিহবল হয়ে পড়েন। সুপার সাইক্লোন আম্ফান শক্তি কিছুটা হারিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে বুধবার দুপুরের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে রাতে এ ঝড় প্রবেশ করে বাংলাদেশে। ঝড়ের মধ্যে প্রবল বাতাসে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ে, ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে এ পর্যন্ত আট জেলায় মোট ২৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

যাদের বেশিরভাগই গাছ বা ঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে যাশোরে ১২ জন, পিরোজপুরে ৩ জন, পটুয়াখালীতে ২ জন, সাতক্ষীরায় ২জন, ভোলা, এবং ঝিনাইদহ, চাঁদপুর ও বরগুনায় একজন করে। গত ২১শে মে অনলাইনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে ২৬টি জেলায় এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১১শ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহ হচ্ছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ও বরগুনা। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব জেলায় ঘরবাড়ি প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও নষ্ট হয়েছে । এসব ঘরবাড়ি সংস্কার ও নির্মাণে প্রতি জেলায় ৫শ বান্ডিল টিন এবং ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ত্রাণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে । প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীতে পাট, আম, লিচু ও মুগ ডালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি।

তবে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আমের ক্ষতি হয়েছে। ২শ টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার বেশির ভাগ বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় অবস্থিত । প্রায় ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮৪টি জায়গায় বাঁধের ফাটল ধরেছে । ক্ষতিগ্রস্ত এসব ফাটল ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় ২২ শে মে থেকে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করবে বলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক জায়গায় ডাক বিভাগের টেলিফোন লাইন সমূহ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। যা শিগগিরই মেরামত করা হবে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, যেহেতু এবার প্রচুর সংখ্যক গবাদি পশুকে নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল। তাই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে মৎস্য চাষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ৫শ চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যার অর্থমূল্য প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের এবং খাদ্য বিভাগের তেমন ক্ষতি হয়নি। গণপূর্ত বিভাগের সামান্য ক্ষতি হয়েছে । প্রতিমন্ত্রী আরো উল্লেখ করেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এদের মধ্যে পটুয়াখালীতে দুইজন, যশোরে তিনজন, ভোলায় একজন, পিরোজপুরে একজন ,সাতক্ষীরায় একজন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলায় দুইজন মৃত্যুবরণ করেছেন ।

অন্যদিকে সুপার সাইক্লোন ‘আম্ফান’-এর প্রভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয়-ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাড়াতে সংশ্লিষ্ট চাষী, খামারি ও উদ্যোক্তাদের জরুরি ভিত্তিতে নগদ আর্থিক সহায়তাসহ সহজ শর্তে সুদবিহীন ঋণ প্রদানের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ২১শে মে মৎস্য ?ও প্রাণিসম্পদ সচিব রওনক মাহমুদ স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে।চিঠিতে বলা হয়েছে, উপকূলীয় অ লে ‘আম্ফান’-এর প্রভাবে মাছ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগীর ক্ষয়-ক্ষতির প্রাথমিক বিবরণ পাওয়া গেছে।

তবে ক্ষয়-ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুতকরণে যাচাই-বাছাই চলছে। চিঠিতে আরো জানানো হয়েছে, করোনা মহামারীর বিরূপ প্রভাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগকারীরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তদুপরি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এ খাত সংশ্লিষ্টরা আরও হতাশ হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রাণিজ পুষ্টির যোগানদাতা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত হুমকির মুখে পড়বে, যার প্রভাব গোটা জাতির উপর পড়বে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরিশাল ও খুলনা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী আম্ফানের প্রভাবে মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩০৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ১ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। যার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খামারের সংখ্যা ২৪ হাজার ৩৫০টি এবং ক্ষতিগ্রস্ত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগীর খামারের সংখ্যা ৫০ হাজার ১৩৮টি বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে।

আম্ফান গুঁড়িয়ে দিল আমচাষীর স্বপ্ন। ভরা মৌসুমে আমের ফলন ওঠার ঠিক আগে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান চাষীদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম অ লে কয়েকটি জেলায় বড় আকারে আমের চাষ হয়। প্রতিবছর সাধারণত মে-এর মধ্যভাগ থেকে আম পাড়া শুরু হয়। বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যে আম পাড়ার সময়ও নির্ধারণ করে দিয়েছিল প্রশাসন। কিন্তু এরই মধ্যে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। কয়েকটি জেলায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায়।

প্রাথমিকভাবে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে সারা দেশে এক লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফল ও ফসলের ক্ষতির তথ্য এসেছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ঢাকায় এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৭ হাজার ৩৮৪ হেক্টর জমির আমের আবাদের মধ্যে ১০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। তবে সাতক্ষীরা জেলায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন জেলায় ঝড়েপড়া আম জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে কিনে তা ত্রাণ হিসেবে দুস্থদের মাঝে বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাহলে এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা সম্ভব নয়।

ঢাকা, ২৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।