"বিশ্বাস করুন, বাদির স্ত্রীকে ফুসলিয়ে বিয়ে করিনি"


Published: 2019-07-06 20:35:09 BdST, Updated: 2019-12-12 20:35:32 BdST

ইব্রাহীম শাহাদাত: বিশ্বাস করুন স্যার, বাদির স্ত্রীকে ফুসলিয়ে নিয়ে বিয়ে করিনি। বাদি তার স্ত্রীকে দিনের পর দিন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করত। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাদির স্ত্রী আমার বাসায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। নিতান্ত মানবিক কারণে বাদির স্ত্রীকে আশ্রয় দিয়েছি মাত্র।’

মিথ্যা কথা : স্যার। সে ছিল আমার বাড়ির গৃহশিক্ষক। আমার দুই শিশুসন্তানকে লেখাপড়া করানোর জন্য একজন বেকার যুবককে বিশ্বাস করে বাসায় গৃহশিক্ষকরূপে নিয়োগ করেছিলাম। ওর চোখ পড়ে আমার স্ত্রীর ওপর। সকালে আমার ব্যবসায়ের কাজে চলে আসতাম আর ফিরতাম অনেক রাতে।

এর মধ্যে চলত তাদের মন দেয়া-নেয়া। শুরু হয় নতুন ঘর বাঁধার স্বপ্ন। এক সুযোগে আমারই গৃহশিক্ষক দুই শিশুসন্তান রেখে আমার স্ত্রীকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায়। সাথে নিয়ে গেল ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, পাঁচ হাজার টাকাসহ মূল্যবান কাপড়চোপড়ও। এ অবস্থায় জামিন পেয়ে গেলে স্ত্রীকে আর ফেরত পাবো না, স্যার।

শুনানির সময় উদ্ধারকৃত ভিকটিমও কোর্টে ছিলেন। কেন অপহরণ করবে না শুনি! নজরকাড়া রূপ ছিল ভিকটিমের। বিজ্ঞ আদালতের এক প্রশ্নে, ভিকটিমও জুনিয়র আইনজীবীর বক্তব্যকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। সুন্দরী কথায় কর্ণপাত করা দূরের কথা, সিনিয়র আইনজীবীর দিকে একবার চোখ তুলেও তাকান না। যত সুন্দরীই হোন, তাই বলে সিনিয়রের পজেশন থেকে অপহরণ!

সিএমএম কোর্টে বিজ্ঞ বিচারকের সামনে দুই আইনজীবীর উক্ত বাগ্বিতণ্ডা শুনে আমার মনও খারাপ হয়ে যায়। দু’জন আইনজীবীই মোক্তার লাইব্রেরিতে বসেন। বয়সে একজন প্রবীণ, অন্যজন নবীন। দু’জনকে পাশাপাশি বসে গালগল্পসহ হাসাহাসি করতেও দেখি। যেখানে সিনিয়রদের সামনে ধূমপান নিষিদ্ধ, সেখানে ফুসলিয়ে বউ নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, খারাপ নজরে তাকানোই পাপ।

সে দিনের দুই আইনজীবীর যেন মান-অভিমান নেই। আমরা হলে সারাজীবন একজন আরেকজনের মুখ দর্শন করতাম না। ওদের কাছে যেন, বউয়ের চেয়ে বন্ধুত্ব বড়। এমন বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের মধ্যে একজন নবীন আইনজীবী কি না একজন প্রবীণ আইনজীবীর বউ ভাগিয়ে নিয়ে গেলেন!

এজলাসের পেছনে বসে শুনানি শুনছিলাম। বিজ্ঞ বিচারকের সামনে দুই আইনজীবীর ঝগড়া-বিরোধের পর থেকে তাদের চাল-চলন দেখে একজনের প্রতি করুণা এবং অপরজনের প্রতি বিতৃষ্ণায় মনটা বিষিয়ে ওঠে।

প্রবীণ আইনজীবীর প্রতি একবার করুণা হলেও আবার এই ভেবে মনে মনে খুশি হই যে, লোকটা এই ধাড়ি বয়সে মেয়ের বয়সী একটা বউ ঘরে তুলতে যায় কেন? যেমন কর্ম তেমন ফল। সম্ভবত প্রবীণ সাহেবের প্রথম পক্ষের স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছে। কোনো গরিব বাবা-মায়ের অভাবের সুযোগে এ কাজটা করতে পেরেছেন।

বিয়ের সময় মেয়ের চোখ-কান বন্ধ ছিল। উকিলের সাথে থাকতে থাকতে চোখ-কান খুলে গেছে। চোখ-কান খুলতেই দেখেন, একজনের হৃদয়ে চৈত্রের ঠনঠনে খরা আর অপরজনের আষাঢ়ের কূল ভাসানো বন্যা। বুড়োর সাথে থাকতে যাবেন কোন দুঃখে! সিনিয়র আইনজীবীর আছে কাঁচা পয়সা।

অন্যের মনে ঈর্ষা জাগাতে ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’কে বগলদাবা করে সিনিয়র যেন ইচ্ছে করেই এত দিন কারণে-অকারণে অনুষ্ঠানাদিসহ শপিংমলে ঘোরাঘুরি করেছেন। বউকে খুশি রাখার জন্য হাউজটিউটর হিসেবে রেখেছেন জোয়ান জুনিয়রকে সে বৃদ্ধ স্বামীর তরুণী ভার্যাকে নিয়ে উড়াল দিয়েছে।

এসব ভেবে প্রতিদিনই করুণার দৃষ্টিতে প্রবীণ আইনজীবীর দিকে তাকাই। তখন মনে হয়, প্রবীণের যেন কিছুই হয়নি। জ্বালা হয়েছে আমার। আরে এমন হীরার টুকরো বউ চলে গেলে দু-চার দিন বিছানা থেকে উঠতে পারার কথা নয়। আর উনি! দিব্যি আরামে ওকালতি করে চলেছেন।

এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর একদিন আস্তে করে সেই প্রবীণ আইনজীবীর পাশে বসলাম, সহানুভূতির সাথে জানতে চাইলাম স্যার, বাচ্চা দুইটা কেমন আছে? তারা মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে না তো? : (বিস্মিত হয়ে) বাচ্চা! কিসের বাচ্চা! ওই দিন যে শুনলাম, আপনার ম্যাডাম এক জুনিয়রের সাথে চলে গেছেন, রেখে গেছেন দুই শিশুসন্তান। : (অধিকতর বিস্ময়ে) আপনি ভুল শুনছেন, আমার কোনো শিশুসন্তান নেই। আমার এক ছেলে ডাক্তার, আর ছোট মেয়ে পড়ে ইডেন কলেজে।

বললাম- স্যার, সে দিন এজলাসে দাঁড়িয়ে আপনি নিজের মুখেই বললেন, ‘আমারই গৃহশিক্ষক দুই শিশুসন্তান ফেলে আমার স্ত্রীকে ফুসলিয়ে নিয়ে গেছে।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর আমার পিঠ চাপড়ে বজ্রকণ্ঠে সহাস্যে বলেন- আরে বোকা, আমার বুড়ো বউকে অন্য উকিল নিতে যাবে কেন! নিয়েছে আমার মক্কেলের জওয়ান বউকে, তারই গৃহশিক্ষক। : তবে যে বললেন, ‘আমার বউ, আমার গৃহশিক্ষক, আমার শিশুসন্তান?’

আমরা যখন মক্কেলের কাছ থেকে ওকালতনামা নিই- তখন মক্কেলের মুখের কথা আমাদের মুখ দিয়ে বলি। একজন মক্কেল যে বিষয়ে তার পক্ষে ওকালতি (প্রতিনিধিত্ব) করার জন্য ওকালতনামা প্রদান করেন, সে বিষয়ে উকিল সাহেবের সব কথাই মক্কেলের কথা এবং সব কর্মই মক্কেলের কর্ম।

‘স্যার, আমার মক্কেল মৌলভী মোহাম্মদ রহিমুদ্দিন জোয়ার্দার সম্পূর্ণ নির্দোষ’ বলার পরিবর্তে বলা হয়, ‘আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।’ প্রশাসনিক ব্যাপারে ইংল্যান্ডের রাজা বা রানী সম্পর্কে যে কারণে বলা চলে ‘দি কিং ক্যান ডু নো রঙ’। মোকদ্দমা সংক্রান্ত ব্যাপারে আইনজীবী সম্পর্কেও সে কারণে বলা চলে, দি ল’ইয়ার কেন সে নো লাই। এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হয় আদালতপাড়ায় আমার পদচারণা। [ফেসবুক থেকে সংগৃহীত]

 

ঢাকা, ০৬ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।