ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্টরুমের নামে এসব কি হচ্ছে!


Published: 2019-07-21 17:47:18 BdST, Updated: 2019-12-15 21:16:39 BdST

মো. মাহবুবুর রহমান সাজিদ, ঢাবিঃ রাত ৯টা বাজতেই হলের গণরুমগুলোতে তোরজোড় শুরু হয়ে যায়। সবাই আয়রন করা কাপড় পরে সুন্দরভাবে সেজেগুজে বাধ্য ছেলের মতো খোলামাঠে কিংবা হল প্রাঙ্গনে দাঁড়াবে। এই দৃশ্য বা এই অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি)।

পৌনে ৯টা থেকে শুরু হবে গেস্টরুমের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। ততক্ষণে ১ম, ২য়, ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা এবং হলের বটনেতারা এসে হাজির গেস্টরুমে। ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ১ম বর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীদের ওপর চালিত হয় মানসিক নির্যাতনের স্টিমরোলার। প্রথমেই দাঁড় করানো হবে সারিবদ্ধভাবে।

পৌনে ৯টার পর কারা গেস্টরুমে এসেছে তাদেরকে সামনে নিয়ে আসা হবে। সময়মত না আসার কারণ জানতে চাওয়া হবে। তারপর শুরু হবে সকলের সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা।

১০ টা বাজতেই ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে ১৫/২০ জন করে কয়েকটি দলে ভাগ করা হবে। এদেরকে ঢুকানো হবে গেস্টরুম ওরফে কনসেন্ট্রেশন সেলে। এর অভ্যন্তরে রয়েছে নানান আজগুবি নীতিমালা। তন্মধ্যে অন্যতম হল,

১. হাসা যাবেনা। (অথচ সিনিয়রেরা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করবে, হাস্যকর কথা বলবে হাসানোর জন্য।)

২. যেকোন প্রশ্নের উত্তরে জ্বী ভাই এবং না ভাই ব্যতীত আর কিছু বলা যাবেনা। ( বস্তুত, সহমত ভাইয়ের প্রশিক্ষণ এখানেই দেওয়া হয়ে থাকে।)

৩. টি-শার্ট, চটি জুতা এবং পাঞ্জাবির সাথে প্যান্ট কিংবা পাজামার সাথে শার্ট পড়া যাবেনা। আরও কতগুলো আজগুবি নিয়মকানুন রয়েছে।

গেস্ট রুমে নির্য‍াতনের শিকার এক শিক্ষার্থী

 

হল গেস্ট রুমের নেতৃত্বে থাকে মূলত ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচ যারা কিনা মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বর্ষ শেষ করতে যাচ্ছে। সাধারণত গেস্ট রুমে কমন ম্যানার শেখানো হয়। এবং নবীনদের ভুলের কারণে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়।

কিন্তু! সমস্যাটি হচ্ছে প্রতি হলের গেস্ট রুমেই কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকে যারা অতিউৎসাহী হয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের উপর চড়াও হয়। একটি ছেলে চলতে ফিরতে গেলে একজন কে না দেখা কিংবা কোন সিনিয়র তার দৃষ্টির অগোচরে চলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু কোন কোন সিনিয়র সেই ব্যাপারটিকে তিলকে তাল বানিয়ে গেস্ট রুমে ঐ পার্টিকুলার জুনিয়রকে হেনস্তা করে থাকে। অনেকে ভিন্ন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যও এই কাজ করে। তারা একটা জিনিস বুঝতে চায়না যে, হেনস্তা হওয়া ছেলেটির তখনকার মানসিক অবস্থাটা কেমন থাকে।

আপনাকে কোন জুনিয়র সালাম না দিলে, হ্যান্ড শেইক না করলে বা এড়িয়ে গেলে ব্যাপারটা এমন নয় যে, জুনিয়রটি বেয়াদব। হয়তোবা ছেলেটি তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল তাই আপনি তার দৃষ্টিতে পড়েননি কিংবা আপনি তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলেন তাই ছেলেটি আমাকে সম্বোধন জানাতে পারেনি। আবার আরেকটি ব্যাপারও হতে পারে যে আপনি নিজেই সম্মান পাওয়ার মত ব্যক্তিত্ব নন।

তাছাড়া, সম্মান ব্যাপারটা জোর করে আদায় করার কোন বস্তু নয়। ভয় দেখিয়ে, ফোর্স করে, গালি দিয়ে (অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে এই প্রবণতা আছে) আর যাই হোক সম্মান পাওয়া যায়না। আপনি সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হলে জুনিয়ররা আপনাকে এমনিতেই সম্মানিত করবে। বলা লাগবেনা।

এখানে সিনিয়র ভাইদের কথাই আইন। কি বলেছেন সেটি বিবেচনা না করে জ্বী ভাই কিংবা না ভাই বলা বাধ্যতামূলক।

প্রত্যেকটা দল যখন গেস্টরুমের সামনে আসবে সারিবদ্ধভাবে তখন সামনের সদস্য গেস্টরুমে বিদ্যমান ভাইদের উদ্দেশ্যে সালাম দিবে। অতঃপর হাত মিলিয়ে নিজের নাম, ডিপার্টমেন্ট এবং জেলা ইত্যাদি পরিচয় দিয়ে সামন থেকে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াবে।

এক্ষেত্রে উচ্চতা ঠিক থাকা চাই। খাটোরা থাকবে সামনের সারিতে এবং লম্বুরা পিছনের সারিতে। তারপর শুরু হবে জিজ্ঞাসাবাদ। একজন একজন করে সামনে আনা হবে। জানতে চাওয়া হবে কেন সে অমুক ভাইকে অমুক স্থানে সালাম দেয়নি।

অথবা সালাম দিয়েছে ঠিকই কিন্তু হাত মিলায়নি। চুপ করে থাকবে সালাম না দেওয়ার অপরাধে মহা অপরাধী এই ছেলে। সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে শুরু হবে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ।

মাদারচোদ, বাইঞ্চোদ, আবাল, ধইঞ্চা এবং চোদনা হল গেস্টরুমের প্রচলিত গালি। এছাড়া সিনিয়রেরা তাদের বংশ পরিচয় অনুযায়ী বিভিন্ন গালি দিয়ে থাকেন। অনেক হলে গেস্টরুমে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

গেস্টরুমে আরও জানতে চাওয়া হয় গত পলিটিকাল প্রোগ্রামে কেন উপস্থিত ছিলনা। জিজ্ঞেস করা হয়, "ক্লাস বড় নাকি প্রোগ্রাম বড়?" এছাড়া গেস্টরুমে আগামী কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। উপস্থিত না থাকলে কঠোর শাস্তির হুশিয়ারি প্রদান করা হয়।

রাত ১ টা পর্যন্ত চলে এই নিপীড়ন। যারফলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে করা হয় মেরুদণ্ডহীন। তারা তাদের অধিকার আদায় করতে জানেনা। সেই সুবাধে হল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দুর্নীতি আর অপকর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করে।

গণমাধ্যমগুলোও দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত এসব নির্যাতনের কোন খোজজখবর রাখেনা। প্রতিদিন ১টায় প্রতিটা হলে চলে এসব নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড। অবিলম্বে ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জঘন্য গেস্টরুম প্রথা বন্ধ করা হোক। নিশ্চিত করা হোক শিক্ষার্থীদের অবাধ স্বাধীনতা। গেস্টরুম সংস্কৃতি নিপাত যাক, শিক্ষার্থীরা মুক্তি পাক।

 

লেখকঃ

মো. মাহবুবুর রহমান সাজিদ

শিক্ষার্থী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ২১ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।