ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতাবোধ!


Published: 2019-10-05 19:02:21 BdST, Updated: 2019-10-20 22:07:34 BdST

সাকিব জামালঃ আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শ্রেণিকক্ষে পাঠগ্রহণে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে জীবনে যতো শিক্ষকের সংস্পর্শ পেয়েছি সব শিক্ষকের অবদান স্বীকার করছি কৃতজ্ঞ চিত্তে।

স্বীকার না করা অকৃতজ্ঞতা! এই বিশেষ দিনে আমি ফেসবুক নিউজফিডে খেয়াল রেখেছিলাম শিক্ষকদের নিয়ে আবেগী কোন লেখা চোখে পড়ে কিনা? খুব একটা ভালোচিত্র চোখে পড়েনি বরং দু-একটি তিরস্কারমূলক লেখা চোখে পড়েছে! এর কারনে ভীষণভাবে আমার মনে যে বিষয়টি নাড়া দিলো তা হলো "ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতাবোধ!"

আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলে মূল বিষয়ে আলোচনা করবো। আমি যখন প্রিয় শিক্ষক হিসেবে কাউকে কল্পনা করতে যাই তখন আমার সামনে যেসব প্রিয়মূখ ভেসে ওঠে তার বেশিরভাগ শিক্ষকই হলেন প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাত্র দু/তিনজন এর কথা মনে পড়ে! অথচ বেশিসময় ধরে কাটিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এই সময়টিতে বোঝার সক্ষমতাও ছিলো বেশি। কিন্তু এখানেই সম্পর্কহীন থেকেছি শিক্ষকদের সাথে! আমি চোখ বন্ধ করে নিউরনকে তীব্র আঘাত করেছি তারপরও মাত্র দশ-বারো জন শিক্ষক পেয়েছি যাদেরকে প্রকৃত শিক্ষক মনে হয়েছে।

এইসব শিক্ষকদের বিশেষত্ব হলো- তারা শুধু পড়াশুনাই নয়, জীবন গড়তে, স্বপ্ন গড়তে, নৈতিকবোধ সৃষ্টি করতে আমার পিছনে সময় দিয়েছেন।

যাহোক, সময় বদলে গেছে! বদলে গেছেন আমাদের শিক্ষকসমাজ।পত্র পত্রিকার পাতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত সংবাদ, তথ্য উপাত্ত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়,

এখন শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্কের মতো বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। বলতে গেলে, এই সময়ে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ এটিকে বিপনন করছেন।

কিন্তু আমরা যখন প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র ছিলাম তখন শিক্ষাকে পণ্য মনে হয়নি। যেমন, কোন বিষয় না বুঝতে পারলে সরাসরি শিক্ষকদের কাছে চলে যাওয়া যেত- উকিলদের মত পরামর্শ ফি বা ডাক্তারদের মত ভিজিট দিতে হতো না! দেখা যেত, শিক্ষকগন শ্রেণীকক্ষে পাঠদানসহ ছাত্রদের পরিস্থিতি বিবেচনায় কমবেশি অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতেন। তবে তাদের আর্থিক লোভও ছিলো না।

বেশ কষ্ট করে সংসার করতেন অনেক শিক্ষক তবুও ছাত্রদের কখনো বিনা পয়সায় পড়াতে না করেন নি! এমনকি বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষক জোগার করে গরীব এবং মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনায় সহযোগিতা করেছেন ঠিক অভিভাবকের মত। এখন বোধহয় গ্রাম বা শহর কোথাও কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ধরনের শিক্ষক খূঁজে পাওয়া যাবে না।

শিক্ষাকে যদি পণ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, তবে বাজার অর্থনীতির মতো সহজভাবেই এটি বোঝা যায়, বাজারে পণ্য বিক্রেতা কখনো ক্রেতার কাছ থেকে বিশেষ সম্মান আশা করতে পারেন না। কারণ এখানে সম্পর্ক শুধুই ক্রেতা-বিক্রেতা।

এখানে দুটো বিষয় স্পট যা ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ককে আজ বিচ্ছিন্নতাবোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তা হলো:
১. প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও ছাত্রদের জীবন গড়ার নানামুখী শিক্ষা দেয়ার কাজ থেকে শিক্ষকগন দূরে সরে গেছেন।
২. শিক্ষাকে মাত্রাতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ করে ফেলা হচ্ছে। কিভাবে এই দুটো জিনিসই ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছে তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি।

শিক্ষকেরা যদি শিক্ষার্থীদের শুধু বলেন পরীক্ষায় ভালো করো, আমার কাছে পড়ো, আমার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হও, আমার লেখা বই কেনো ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করবে।

পক্ষান্তরে শিক্ষক যদি ছাত্রকে পর্যবেক্ষণ করে তার দুর্বলতা নির্ণয়ের মাধ্যমে পড়াশুনা নিয়ে পরামর্শ প্রদান করেন, ছাত্রের ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক খোঁজখোঁজখবর নেন, ভিন্ন বিষয় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা দেন তখন ছাত্রের কাছে শিক্ষককে প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে মনে হবে এবং সে তখন শিক্ষকদের সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করতে শুরু করবে।

একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠবে নি:সন্দেহে। কেননা শিক্ষার্থীরা অনুকরণপ্রিয় তারা শিক্ষকদের, অভিভাবকদের অনুকরণ করতে ভালোবাসে এবং এই প্রক্রিয়া তারা প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অব্যহত রাখে।

সুতরাং, বিচ্ছিন্নতাবোধ কমিয়ে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গঠন, সুনাগরিক সৃষ্টি এবং বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একটি জাতি গঠনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে একটি মধুরতম ও অনুকরণীয় সম্পর্কে উন্নীত করতে শিক্ষকদেরই মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

মনে রাখতে হবে শিক্ষাকতা একটি ত্যাগী এবং সেবামূলক পেশা। শিক্ষার্থীদের যা শিখাবেন ওরা তাই শিখবে। পরিশেষে বলতে চাই, "ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক" কি এবং কেমন হবে তাও শিক্ষকগনই ছাত্রদেরকে শিখাবেন!

ঢাকা, ০৫ অক্টোবর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।