করোনা সংকটে শিক্ষার্থীদের করণীয়


Published: 2020-03-25 12:05:37 BdST, Updated: 2020-04-05 12:10:08 BdST

মো. আবুল কালাম আজাদঃ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা ছড়িয়েছে করোনা আক্রান্ত দেশ থেকে আগতদের মাধ্যমে। আমরা পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে পারছি। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন অন্তত চারজন। করোনা সংক্রমণ শুরু থেকে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ লোক বিদেশ থেকে এসেছেন, তাদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়নি, অনেককে এখনও শনাক্ত করা যায়নি। আবার যাদের শনাক্ত করা গেছে, তাদের অনেকেই কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানছে না।

স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বন্ধ। তাই বলে ঘরে বসে অলস সময়? কী করণীয়? কী করলে নিজের সময় ভালো কাটবে, দেশের, সমাজের উপকারে লাগা যাবে? ছাত্রছাত্রীদের প্রথম কাজ যেহেতু পড়ালেখা করা, কাজেই সে বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশে-বিদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে অনলাইন ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি জগতে 'শিক্ষক বাতায়ন' রয়েছে, যেখানে আছে সব শ্রেণির সব বিষয়ের শিক্ষা উপকরণ। শিক্ষকরা ঘরে বসে শিক্ষক বাতায়ন ব্যবহার করে ছাত্রছাত্রীর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পড়ালেখার কাজে সহযোগিতা করতে পারেন। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই সময়ে একটা দৈনন্দিন রুটিন করতে পারে, যেখানে পড়ালেখা, বিনোদন, খেলা, শরীরচর্চা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

প্রথম কথা, শিক্ষার্থীরা কী পড়বে? তোমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে যা শিক্ষক তোমাকে পড়াতেন বলে মনে হয়, তাই পড়ার চেষ্টা করো। অভিভাবক সহযোগিতা করতে পারেন। ফোনে শিক্ষকের পরামর্শ নিতে পার। আমাদের মুক্ত পাঠ, কনটেন্ট ইত্যাদি ওয়েব পেজে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে পার। নিজে নিজে পড়, নিজে নিজে পরীক্ষা দাও। শুধুই কি পাঠ্যবইয়ের পড়া? হয়তো তোমার বাসাতেই আছে তোমার বয়সে পড়ার উপযোগী অনেক বই। দেখ তোমার বাসার বুক সেলফে অনেক বই পেয়ে যাবে। সতর্কতা অবলম্বন করে পাশের বাসার বন্ধু থেকেও ধার করতে পার। ওয়েবসাইটে ফ্রি ডাউনলোড করার উপযোগী অনেক বই আছে। তুমি যদি যথেষ্ট বড় হয়ে থাক, নিজে ডাউনলোড করতে পার অথবা তোমার বড় ভাইবোন বা অভিভাবককে বলতে পার ডাউনলোড করে দিতে। কত কিছু জানার আছে ওয়েবসাইটে; এই সুযোগে যে বিষয়ে তোমার ভালো লাগে তাই পড়তে পার। আমরা জানি, পৃথিবীতে জ্ঞানের ভাণ্ডার অনেক বড় আর আমরা এ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসটি নিয়ে নিতে পারি।
বিনোদনের তো শেষ নেই। টিভি দেখা, গান শোনা, মুভি দেখা। কোন টিভিতে তোমার জন্য কোন প্রোগ্রামটি ভালো, বোঝার চেষ্টা করো। এই সময়ে প্রিয় গান শোনা, শিক্ষণীয় অথচ আনন্দ দেয় এমন অনেক মুভি আছে, যেগুলো তুমি দেখতে পার। পরিকল্পনা করে নাও এ সপ্তাহে বা আগামী সপ্তাহে কোন কোন বই পড়বে, কোন ওয়েবসাইটে জ্ঞানের সন্ধান করবে আর মুভি দেখবে। তোমার অভিভাবকের পরামর্শ নাও।

দুই.

এবার আসো খেলাধুলা। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলতে হলে ২২ জন দরকার, কমপক্ষে পাড়ার খেলায় ১০-১২ জন। করোনার কারণে এই পাড়ার খেলাও বিপজ্জনক। ঘরে বসে ভাইবোন বা বাবা-মার সঙ্গে দাবা খেলতে পার অথবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট কোনো খেলা। এসবই হয়তো বুদ্ধির খেলা, আনন্দ দেওয়ার খেলা। কিন্তু শরীরচর্চা তো করা চাই। দড়ি লাফ হচ্ছে একা মজার শরীরচর্চা। তা ছাড়া মুক্ত হাতের ব্যায়াম তো আছেই- জায়গায় দৌড়ানো, বুকডন, বৈঠক, আরও কত কী? আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাদের শরীরচর্চা শিক্ষক বলতেন, লাফিয়ে লাফিয়ে কাল্পনিক পাখি ধরতে; তেমনটিও করতে পার।

এবার আসা যাক গুরুত্বপূর্ণ কথায়। করোনায় পুরো পৃথিবী শঙ্কিত, আমরাও সবাই উদ্বিগ্ন। অনেকেই মনে করে আমি তো ছাত্র, বয়স কম, আমার কী করার আছে। কিন্তু আমি মনে করি, এই করোনাতে তোমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ আছে। করোনা প্রতিরোধের উপায় হচ্ছে- প্রতিনিয়ত সাবান, স্যানিটাইজার বা ছাই দিয়ে হাত ধোয়া। হাত দিয়ে নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ না করা। এ কথাটি তুমি তোমার পরিবারের সব সদস্যকে বলতে পার এবং প্রতিনিয়ত তা অভ্যাস করার বিষয়ে উৎসাহিত করতে পার। এই বার্তাটি তুমি তোমার বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হলে বা ফোনে বলতে পার। আমরা কাউকে ফোন করে সালাম বা সম্ভাষণ জানিয়ে জিজ্ঞেস করি- কেমন আছেন, বাসার সবাই কেমন আছে ইত্যাদি। এখন এর সঙ্গে জিজ্ঞেস করতে পারি- আজ ক'বার হাত ধুয়েছেন বা এ রকম আরও করোনা সচেতনতামূলক কথা।

করোনা ছড়ায় মানুষের মাধ্যমে। কাজেই যত কম জনসমাগমে যাওয়া যায়, ততই ভালো। নিজে কোনো জনসমাগমে যাবে না, অন্যকে এতে নিরুৎসাহিত করবে। একান্ত বাইরে যেতে হলে মাস্ক পরে যাওয়া ভালো। যত কম সময় বাইরে থাকা যায়, হাত দিয়ে যতটা সম্ভব কম জিনিস স্পর্শ করা, ফিরে এসে হাত ভালো করে ধুয়ে তারপর অন্য জিনিস স্পর্শ করবে। কাপড়ে করোনা ভাইরাস কয়েক ঘণ্টা বাঁচে। কাজেই বাইরে থেকে ফিরে পরিহিত কাপড় পাল্টিয়ে ফেলবে ও ধুয়ে দেবে।

তোমার আশপাশের কোনো বাসাবাড়িতে বিদেশ থেকে কেউ এসে থাকলে তার কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার দায়িত্ব আশপাশের সবার। বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টাইনকালে বাড়িতে লাল পতাকা বা তার ঘরের সামনে লাল চিহ্ন দিয়ে অন্যদের সতর্ক করার পরামর্শ দিতে পার। কোয়ারেন্টাইন অমান্য করলে উপজেলা বা জেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা ৯৯৯ নম্বরে জানাতে পার। বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তির স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কিনা খোঁজ নিতে পার; যোগাযোগ না হয়ে থাকলে তুমি প্রশাসনকে তার আগমন জানাতে পার। তবে সতর্ক থাকতে হবে তোমাকে, ওই ব্যক্তি থেকে অন্তত ৩ ফুট দূরে থাকবে। তার ব্যবহার্য জিনিস স্পর্শ করবে না।

বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের তালিকা জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে আছে। তোমরা এ অফিসগুলোতে গিয়ে তাদের পরামর্শমতো সহযোগিতা করতে পার। ফোনে নিয়ম করে প্রতিদিন তোমার উপজেলার বা তোমার এলাকার বিদেশ প্রত্যাগতদের কোয়ারেন্টাইন বিষয়ে সচেতন করতে পার। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা এরূপ স্বেচ্ছাসেবকের সেবা নিতে পারেন। সারাদেশে সব উপজেলায় বিপুল সংখ্যক স্কাউট এবং রোভার স্কাউটস, রেড ক্রিসেন্ট, ইউওটিসি, রোটারিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সদস্য আছে। তাদের কার্যকরভাবে ব্যবহার করে কোয়ারেন্টাইনসহ অন্যান্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

তিন.
তোমার অভিভাবক, আত্মীয়স্বজনকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জিনিস না ক্রয়ের জন্য আহ্বান জানাতে পার। এখন দেখা যাচ্ছে, অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি জিনিস কিনছেন। এমনকি ৩-৪ মাস বা বছরের বাজার। এটি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের খাদ্যগুদামে প্রচুর খাবার আছে, কৃষকের ঘর এবং ক্ষেতে প্রচুর খাদ্যশস্য, সবজি আছে, খাবারের কোনো অভাব হবে না। এভাবে অবিবেচক কিছু ব্যক্তি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জিনিস কেনার ফলে অনেক জিনিসের দাম দোকানিরা বাড়িয়ে দিয়েছেন, কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার অবস্থা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনকে সচেতন করতে পারে।

করোনা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে যাওয়ার আগে একটা কাজ করতে পার। তুমি আর তোমার বন্ধু দু'জনে মিলে করোনা সচেতনতা বিষয়ক স্লোগান দিয়ে পোস্টার লিখতে পার। আর দু'জনে মিলে মাস্ক পরে সাবধানতার সঙ্গে পোস্টার নিয়ে প্রতিদিন তোমাদের সুবিধাজনক সময়ে বাসার সামনে, ফুটপাতে আধঘণ্টা দাঁড়াতে পার। পোস্টারে লেখা থাকতে পারে- 'করোনার ভয়/হাত ধুয়ে করবো জয়। হাঁচি-কাশি দেবার তরে/ মুখ ঢেকে নাও মনে করে।' করোনা সতর্কতা, অপ্রয়োজনে অনেক জিনিস কেনা, করোনা চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে তুমি নিজেও ছড়া রচনা করতে পার। এ কাজের জন্য যদি রাস্তায় না যাওয়া যায়, তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তো আছেই। করোনা ভ্যাকসিন আবিস্কারের জন্য অনেক দেশ গবেষণা করছে এবং গবেষণার অংশ হিসেবে মানবদেহে ভ্যাকসিন দিয়েছে। অনেক দেশ সফলভাবে ওষুধ আবিস্কারের দ্বারপ্রান্তে, ম্যালেরিয়া রোগের ওষুধ করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার করে অনেক দেশ সফলতা পেয়েছে। সফল চিকিৎসায় অনেক বয়স্ক ব্যক্তি করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন। পৃথিবীর বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো করোনার উৎপত্তি, সংক্রমণ ও চিকিৎসা নিয়ে কাজ করছে।

বাংলাদেশও করোনা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। তোমার অংশগ্রহণে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা আর দৃঢ় মনোবল দিয়ে আমরা করোনার ব্যাপক সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাব বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখকঃ মো. আবুল কালাম আজাদ

সভাপতি, বাংলাদেশ স্কাউটস এবং প্রাক্তন মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) ও প্রাক্তন মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

[কার্টেসি : সমকাল]

ঢাকা, ২৫ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//টিআর

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।