'করোনার পিছনে না ছুটে করোনার সামনে থাকা উচিত'


Published: 2020-03-30 15:47:10 BdST, Updated: 2020-06-06 01:00:03 BdST

একরামুল হকঃ সবাই তো করোনার পিছনে ছুটছে। প্যানিক করছে। আমাদের আসলে করোনার পিছনে না ছুটে করোনার সামনে থাকা উচিত।

ভদ্রলোকের কথা শুনে খানিকটা থমকে গেলাম। আমাদের অফিস করোনা ভাইরাসের জন্য “Work from Home” ডিক্লেয়ার করেছে। যেসব এমপ্লয়ি চাইবে, তারা বাসায় থেকে অফিসের কাজ করতে পারবে। আমরা কম-বেশী সবাই তারই প্রস্তুতি নিচ্ছি। ল্যাপটপের ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে ভদ্রলোকের কাছে ‘বাই’ বলতে গেছি, এমন সময় তিনি হাসি মুখে কথাটা বললেন।

কথাটা শুনে থমকে গেলাম এই জন্য যে, আমাদের অফিসে ডাক্তারদের সংখ্যা বেশী, আমরা টিবি (যক্ষ্মা) নিয়ে কাজ করি। এতো ডাক্তারের ভীড়ে, সকাল-বিকাল করোনা নিয়ে অনেক কিছুই শুনছি, জানছি কিন্তু এই ধরনের ইন্টারেস্টিং কথা আগে শুনিনি।

ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখি, মুখ টিপে হাসছেন। উনি নিজেও একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার, মুখ ভর্তি সাদা চাপ দাঁড়িতে তাঁকে দারুণ মানিয়েছে।

-সামনে থাকার ব্যাপারটা কি রকম?
-আমরা সবাই ভাবছি যে, কিভাবে করোনা ভাইরাস থেকে দূরে থাকা যায়, তাই না? কিন্তু তার পাশাপাশি আমাদের এই প্লান করা উচিত যে, করোনা এফেক্টেড হয়ে গেলে কি হবে? তখন কি করবো?

আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, কাধের ব্যাগটা পাশের চেয়ারে রাখলাম। তাই তো? তখন কি করবো? জিজ্ঞেস করলাম-
-করোনার তো কোন ঔষুধ নেই, তাই না?
-শুধু করোনা কেন, ভাইরাস ঘটিত কোন অসুখেরই ঔষুধ নাই। ভাইরাসের ভ্যাকসিন হয়। করোনার ভ্যাকসিন বের হতে আরো সময় লাগবে।

-আর এন্টিবায়োটিক?
-এন্টিবায়োটিক দেয়া হয় ব্যাকটেরিয়া ঘটিত অসুখের জন্য।
-আচ্ছা। তাহলে?
-ব্যাপারটা হলো, ভাইরাস আক্রমন করলে আমাদের দেহের যে “ইমিউন সিস্টেম” আছে, সেটাই ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে। যাদের ইমিউন সিস্টেম ভালো, তাদেরকে করোনা আক্রমন করেও এফেক্টেড করতে পারবে না।
-তাই নাকি?

-আরেকটু বুঝিয়ে বলি। মোটামুটি বলা যায় যে, মানবদেহে তিন ধরনের ইমিউন সিস্টেম আছে। ইমিউনো কম্পিটেন্ট, ইমিউনো কম্প্রোমাইজড আর ইমিউনো সাপ্রেসড। যারা ইমিউনো কম্পিটেন্ট, তাদের ইমিউন সিস্টেম অনেক শক্তিশালী। তাদেরকে করোনা আক্রমন করবে ঠিকই কিন্তু আক্রান্ত করতে পারবে না। ধরে নাও, ৩৩% মানুষ এই দলে পড়বে। তবে এখানে একটা কথা আছে।

-কি কথা?
-করোনা তাদের কোন আক্রান্ত করতে পারলো না কিন্তু তারা ক্যারিয়ার হিসাবে ঠিকই কাজ করবে। অর্থাৎ ইমিউনো কম্পিটেন্ট মানুষটার মাধ্যমে তোমার বা আমার মধ্যে এটা ছড়াতে পারে।
-ওহো!

-হ্যা। তার সামনেও মাস্ক পড়ে থাকতে হবে। দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এবার ধরো, যারা ইমিউনো কম্প্রোমাইজড, করোনা তাদেরকে আক্রমন করবে, তাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে এবং করোনা যুদ্ধে হেরে যাবে। অর্থাৎ, তারা করোনায় আক্রান্ত হবে, তাদের জ্বর, কাশি, গা ব্যথা সবই হবে কিন্তু তারা সুস্থ্য হয়ে যাবে। এরাও পার্সেন্টেজে বেশী। এখন পর্যন্ত দেখা গেছে যে, করোনায় আক্রান্ত পেশেন্টদের মধ্যে মাত্র ৩-৪% রোগী মারা যাচ্ছে। অন্যান্য ভাইরাসে আরো অনেক বেশী হারে মারা যায়।
-গুড। ভেরী গুড।

-বাকী থাকলো ইমিউনো সাপ্রেসড। এরা সাধারনতঃ ৬০-৭০ বছর পেরিয়ে গেছে। এদের ইমিউন সিস্টেম খুবই দূর্বল। এদেরকে করোনা আক্রান্ত করলে তাদের জ্বর, কাশি, সর্দি, গা ব্যথা থেকে রোগটা নিউমোনিয়াতে টার্ন নিতে পারে, সেই সাথে শ্বাসকষ্ট। এই গ্রুপটাই ভালনারেবল। করোনা ফুসফুসে ইনফেকশন করে ফেলে, বংশবৃদ্ধি করে জায়গা দখল করে ফেলে।

আর এই বয়সে যারা আছে, তাদের দেখা যায় আগে থেকেই একাধিক দূরারোগ্য ব্যধি থাকে, যেমন ডায়বেটিস, ব্লাড প্রেশার, এজমা, কিডনী ইত্যাদি। কাজেই, করোনার সাথে এগুলো মিলে রোগটা জটিল আকার ধারন করে। এদের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হয়, ভ্যান্টিলেশনের ব্যবস্থা করতে হয়।

-ভ্যান্টিলেশনটা কি?
-পেশেন্টকে অক্সিজেন সরাসরি দেয়া যায় না। এটার মাত্রা ভ্যান্টিলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে কম-বেশী করে নিয়ন্ত্রন করতে হয়। আমাদের এখন এসব দিকে নজর দিতে হবে। ধরে নিতে হবে যে, করোনা আমার হতেই পারে। কিন্তু হলে কোথায় যাবো, সেটা ঠিক করতে হবে। এখানে ডক্টর দেবী শেঠি একটা চমৎকার জিনিষ বলেছেন।

-কি বলেছেন?
-উনি বলেছেন যে, জ্বরের সাথে বা জ্বর আসার কিছু দিন পর যদি আপনার শরীর ব্যথা শুরু হয়, তাহলে বুঝবেন যে, আপনার ইমিউন সিস্টেম কাজ করা শুরু করেছে। গা ব্যথা হওয়া মানেই, দে আর ফাইটিং। আর যদি জ্বরের সাথে গা ব্যথা না করে, তাহলে আপনি ইমিউন সাপ্রেসড, আপনি দ্রুত হাসপাতালে যাবেন।

এইজন্য আমাদের করোনার সামনে থেকে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা কিভাবে করা যায়, কোন হাসপাতালে যাওয়া যায়, সেই চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। আমরা তো তা করছি না, আমরা বাজার করে খাওয়া স্টক করছি। আরে বাবা, মরে গেলে এতো খাবার খাবে কে?
-কিন্তু ডক্টর ব্যাপারটা যদি এতো সহজ হয়, তাহলে বাইরের দেশগুলো যেমন ইটালি, স্পেন,

আমেরিকায় এতো লোক মারা যাচ্ছে কেন?
ডাক্তার দুই আঙ্গুল উচু করলেন।
-দু’টো কারনে এমন হচ্ছে। এক, এসব দেশে লোক আমাদের মতো এতো সহজে মারা যায় না। এসব দেশে বয়োবৃদ্ধের সংখ্যা অনেক বেশী। ইটালী তো ইউরোপের সর্ববৃহৎ ওল্ড এজড পপুলেশন। আর ওল্ড এজ মানেই হলো ইমিউনো সাপ্রেসড, সেই সাথে অন্যান্য রোগ তো তাদের আছে।
-আচ্ছা...

-নাম্বার দুই, এসব দেশে খুব ভালো চিকিৎসা হয়, সব ঠিক আছে। কিন্তু এরা এরকম ডিসাস্টার মোকাবেলা করে অভ্যস্ত না। এদের তো রোগ-শোক হয় কম। আর আমি খোঁজ নিয়েছি, ওদের ভ্যান্টিলেশন সিস্টেম অনেক কম। এখন ধরে নাও, আইসিইউ তে সিট আছে কথার কথা দশটা। আর ভ্যান্টিলেশন সিস্টেম আছে দুইটা, তাহলে ওরা কাকে রেখে কাকে দেবে। দেখা যাচ্ছে, একজনকে কিছুক্ষন দিলো, তারপর আরেকজনকে, এভাবে দিতে দিতে দশজনের মধ্যে তিনজন নাই হয়ে গেলো।
-বলেন কি?
-হ্যা, এখন ঠিক তাই হচ্ছে।

-তাহলে, আমাদের কি হবে?
-হ্যা, আমাদেরও ওই স্টেজে গেলে বিপদ হবে। আমাদের তো আইসিইউতে সেই ধরনের ব্যবস্থা নাই। সরকারের উচিত বেশী সংখ্যক হাসপাতালে আইসিইউ তে ভ্যান্টিলেশন সিস্টেমের ব্যবস্থা করা। তবে আমাদের কিছু পজিটিভ দিক আছে। যেমন, আমাদের ইমিউন সিস্টেম এভারেজে ভালো।

আমরা এতো ঘন ঘন ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সাথে ফাইট করি যে এই ফাইট করতে করতে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ওদের চাইতে কিছুটা ভালো। এখন আমাদের যেটা করতে হবে আমাদের ইমিউনিটি বাড়াতে হবে।

এজন্য খাদ্য তালিকায় মাংস যুক্ত খিচুড়ি বা মাছ যুক্ত ডাল রাখতে হবে। রেগুলার এক্সারসাইজ করতে হবে, রেস্ট নিতে হবে, যেকোন একটা মাল্টিভিটামিন খেতে হবে। ভিটামিন সি আর জিঙ্ক এই দু’টো ইমিউনিটি বাড়াতে খুব কাজে দেয়। ঠান্ডা পানি বাদ দিয়ে কিছুটা কুসুম গরম পানি খেতে হবে। সিগারেট একেবারেই বাদ দিতে হবে। আর...

-আর...
-বাইরে গেলে মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। হাত-মুখ সাবান পানি দিয়ে ভালো করে ধুতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

-আচ্ছা, আমার একটা প্রশ্ন ছিলো। যাদের একবার করোনা হয়ে গেছে, তারা কি আবারও করোনা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে? ধরুন, আমার মধ্যে এই ভাইরাস আছে। আমি ১৪ দিন কাটিয়ে আসলাম। ১৪ দিন পরে আমার মধ্যে যে ভাইরাস ছিলো, ও মারা গেলো। কিন্তু আমি বাসা থেকে বের হয়ে দেখলাম আপনার মধ্যেও এই ভাইরাস আছে কিন্তু আপনার ১৪ দিন হয়নি।

তাহলে আপনার থেকে এই ভাইরাসটা কি আবারও আমার কাছে আসবে?
-খুব ভালো একটা প্রশ্ন করেছো। সাধারনতঃ একবার করোনা হয়ে গেলে, তার বিরুদ্ধে শরীরে ইমিউন সিস্টেম ডেভেলপ হয়ে যায়, তার আর করোনা হবার কথা না। তবে, দুই-এক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকতে পারে।

যেমন, জাপানে এক লোকের নাকি দু’বার হয়েছে, তবে আমার মনে হয়, এটা খুবই রেয়ার, পার্সেন্টেজে আসবে না। থিওরি বলে যে, একবার আক্রান্ত হলে আর হবে না। তবে অন্য ভাইরাস থেকে আক্রান্ত হতে পারে। করোনা নাকি তার ডিএনএ ঘন ঘন চেঞ্জ করছে। এইজন্যই সবার একসাথে কোয়ারান্টাইনে যেতে হবে, এটাকেই লক-ডাউন বলছে।

তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই ভাইরাসটা দক্ষিন এশিয়া বা যেসব দেশে বেশী গরম পড়ে, আর্দ্রতা আছে, সেখানে খুব একটা বিস্তার করতে পারবে না। তুমি দেখো, যেগুলো এফেক্টেড কান্ট্রি, সবগুলোরই তাপমাত্র ১৫ ডিগ্রীর নীচে ছিলো বা আছে। এমনকি ইরানেও একই অবস্থা ছিলো।

-তাহলে আপনি বলছেন যে, ঘাবড়ানোর তেমন কিছু নেই?
-অবশ্যই আছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে, ঠান্ডা মাথায় হিসাব করতে হবে। যারা ৬০ এর নীচে, ধরে নাও, এদের তেমন কিছু হবে না। যারা ওল্ড এজ, তারা যেন একেবারেই বাসা থেকে বের না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করতে হবে। আগে থেকে ঠিক করে রাখতে হবে যে, অবস্থা খারাপ হলে কোথায় যাবো। কিন্তু ওই হাসপাতালের সামনে যেয়ে এখন থেকেই প্যানিক করা যাবে না। ফ্লু হলেই সাধারনতঃ নাপা, ফেক্সো এগুলো খেয়ে ১৪ দিন বাসাতেই কাটিয়ে দিতে হবে।

-আচ্ছা, শেষ আরেকটা প্রশ্ন।
আমার মাথায় অনেকক্ষন ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিলো, প্রশ্নটা না করে পারলাম না।
-কি?
-আচ্ছা, এখন তো ডেংগুর সিজন চলে এসেছে। আমার প্রশ্ন হলো, একজন করোনা পেশেন্টকে যদি একটা ডেঙ্গুবাহিত মশা কামড়ায়, সে কি করোনায় মারা যাবে নাকি ডেংগুতে? আর ঐ মশা যদি অন্য কোন সাধারন মানুষকে কামড়ায়, তাহলে তার করোনা হবে নাকি ডেংগু?
ভদ্রলোক কিছুক্ষন আমার দিকে ভুরূ কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর হেসে ফেললেন।
-জোকিং রাইট?

আমিও তার সাথে হাসলাম।
জোকিং ই বটে! মানুষ এখনো অনেক অসহায়। প্রকৃতি তাকে নিয়ে মাঝে মাঝে “জোকিং” করে, এ আর নতুন কি!

লেখক: একরামুল হক

ঢাকা, ৩০ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।