ইতিহাসের পাতায় উঠতে যাচ্ছি নাকি সভ্যতার বাঁক বদল ঘটাতে?


Published: 2020-07-09 13:35:01 BdST, Updated: 2020-08-08 14:35:08 BdST

আল আমিন ইসলামঃ প্রখ্যাত জার্মান ঐতিহাসিক লিওপোল্ড ফন বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল তার অনুসন্ধান বা বিবরনই হলো ইতিহাস। জি. জে রেনিয়ার বলেছেন, সভ্য সমাজে বসবাসকারী মানুষদের অভিজ্ঞতার কাহিনী হলোই ইতিহাস। ইবি প্রফেসর এমতাজ হোসাইন স্যার বলেছেন, 'মানবের অতীত ‌স্বীয় কর্মকাণ্ডকেই ইতিহাস বলে।

আবার কেউবা বলে থাকেন মানুষের অতীত কালের বিদ্যমান জীবন ব্যবস্থা ও ক্রিয়াকালাপের পর্যালোচনা ও লিপিবদ্ধতাকেই ইতিহাস বল। অতীতের বিভিন্ন ঘটনা ঐতিহাসিকরা পর্যালোচনা করে সেগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, যাকে কালাক্রমে আমরা ইতিহাস বলে থাকি। এমন কিছু অতীতের উল্লেখযোগ্য সমাজের ঘটনা বা মানবের জীবনযাত্রার ঘটনা রয়েছে, যে গুলো স্থান পেয়েছে 'ইতিহাসের পাতায়'।

এমন ঘটনার সংস্পর্শে বলা যেতে পারে বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস সৃষ্টি করেছে তার ভয়াবহ তান্ডবলীলা। শুধু যে করোনা ভাইরাসই এমন আতঙ্ক বা ভয়াবহ তৈরি করেছে তা নয় বরং এরকম অনেক ভাইরাস বা দুর্যোগ এসেছে বা এরকম ঘটনা ঘটেছে ইতিহাসে সে বিষয়ে আমারা অনেকেই জ্ঞাপিত।

পর্যালোচনা করলে আরেকটু স্পষ্ট যাওয়া যে করোনার পূর্বে গুটিবসন্ত এবং যক্ষ্মার মতো অনেকগুলি মহামারী দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মহামারীগুলোর মধ্যে একটি ছিল ব্ল্যাক ডেথ (প্লেগ নামেও পরিচিত), যাতে ১৪ শতকে আনুমানিক ৭৫-২০০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মহামারীর মধ্যে রয়েছে ১৯১৮ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী (স্প্যানিশ ফ্লু) এবং ২০০৯ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী (এইচ১এন১)। বর্তমান মহামারীগুলোর মধ্যে এইচআইভি/এইডস এবং কোভিড-১৯ মহামারী অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়া ১৭২০-১৭২১ সালে মার্সেইয়ের মহামারী উল্লেখযোগ্য। স্প্যানিশ ফ্লু (১৯১৮ থেকে ১৯২০) - এটি সারা বিশ্বের ৫০০ মিলিয়ন মানুষকে সংক্রামিত করেছিলো। উনিশ শতকে একটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলো।

"এশিয়ান ফ্লু", ১৯৬৫-১৯৫৮: ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে এইচ২এন২ ভাইরাস প্রথম চিনে সনাক্ত করা হয়েছিল। এতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। "হংকং ফ্লু", ১৯৬৮-১৯৬৯: "সোয়াইন ফ্লু", ২০০৯-২০১০: এছাড়া গুটিবসন্ত একটি সংক্রামক রোগ যা ভেরিওলা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে।

এই সব ভাইরাসের ফলে মারা গিয়েছে কোটি কোটি মানুষ। সৃষ্ট হয়েছে মহামারীর সাথে দুর্ভিক্ষ বা মন্দাও। কালাক্রমে অবসান ঘটেছে নানা সভ্যতার। পরাক্ষন্তরে জন্মও নিয়েছে নতুন নতুন সভ্যতা। সৃষ্টি হয়েছে মানুষের নতুন জগৎ, আর অতীতের জীবন প্রণালী গুলো ঠাঁই পেয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

তাদের মহামারীকালীন নানা অসচেতনা, চিকিৎসার অভাব, প্রতিনিয়ত সংক্রমণ বৃদ্ধি সেই সব ইতিহাস যেন এখন রচনা হতে চলেছে। কেননা অতীতের প্রেক্ষাপটের সাথে বাস্তব সময়ের রয়েছে দারুণ মিল বটে। এছাড়া এবার দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের।

প্রবল আম্ফানের তীব্র ঝড় ও বৃষ্টি তাদের বহুলাংশে ফসল ধ্বংসসহ ঘড়-বাড়ি উজাড় করেছে। পাশাপাশি আষাঢ়ের বৃষ্টি আর বন্যা তাদের উপর যেন ' মাড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে'। এছাড়া সাম্প্রতিক কালে দিল্লির পতঙ্গপালের আগমন আর শশ্য বিধ্বস্ত করে দেওয়ার ঘটনা যেন বরই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে মানুষের মনে। তবে কি আমরা মন্দার পথেই চলছি?

তার উপরে আবার করোনার মতো মহামারী। টেনে হিঁচড়ে কি‌ তবে আমরা ১৯৩০ এর দশকের বিশ্বব্যাপী সংগঠিত মন্দা বা একবিংশ শতাব্দীতে ঘ‌টিত মহামন্দা যা বিশ্ব অর্থনীতির পতনের মতো ঘটনার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি ? এ যাবৎ কালের সবচেয়ে ব্যাপক মন্দা- অগাস্ট ১৯২৯ থেকে সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ : ঘটে যা বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম মন্দা বলা চলে।

বিভিন্ন শহরে মহামন্দার প্রভাব তীব্র ছিল, বিশেষ করে যেসব শহর ভারী শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল। অনেক দেশে নির্মাণকাজ একরকম বন্ধই ছিল। কৃষক সম্প্রদায় ও গ্রাম্য এলাকাসমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। এবারও যেন সেরকম কিছুর সম্মুখীন হতেই চলেছি আমরা। কেননা কৃষকের ফসলের বেহাল দশা।

জনগণের কাজ বন্ধ, কর্মহীন প্রায় কোটি কোটি মানুষ‌। তার ফলে মৃত্যু বরণ করেন অনেকেই। আবার যদি দুর্ভিক্ষের কথা বলি তবে দুর্ভিক্ষ হল কোন এলাকার ব্যাপক খাদ্যর অভাব বা সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়। এছাড়া প্রাকৃতিক দূর্যোগ, গবাদিপশুর মড়ক, পোকাড় আক্রমন, ফসলহানি ইত্যাদি কারণেও দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়।

তেমনি করোনার এই ক্রান্তিলগ্নেও আমরা সেই চিত্রই প্রত্যাক্ষ করিতে পারি। এবারও ঘটেছে ব্যাপক ফসলহানি, পাশাপাশি ঘটেছে পতঙ্গপালের মতো ভয়াবহ পোকার আক্রমণ। যা মানুষের খাদ্যর সংকট সৃষ্টিতে বদ্ধ পরিকর। প্রাচীন গ্রন্থ ও ইতিহাসে এরকম পোকার কথা শোনা যায়। শোনা যায় সেসব ভয়াবহ মুহূর্ত ও দিনগুলোর কথা।

তবে কি সময়‌ এবার আমাদের? এ যাবৎ কালে ১৭৭০ সালে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল দেশে। বাংলা ১১৭৬ সাল হওয়ায় এই সময়টি দুর্ভিক্ষের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত লাভ করে। পাশাপাশি অতি বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় সমগ্র দেশজুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দারও দেখা মিলে।

আবার ১৯৪৩ ও ১৯৭৪ সালেও একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ‌কৃষির ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপক। দালাল ফরিয়াদের ফলে তা আবার প্রকট রূপ লাভ করে। এছাড়া ১৯৫৮-৬১ সালে চীনের মহাদুর্ভিক্ষে শুধুমাত্র চীনেই মারা যায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ। বিংশ শতাব্দীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দুর্ভিক্ষ হল, ১৯৬০ সালে বায়াফ্রা দুর্ভিক্ষ, ১৯৭০ সালে কাম্বোডিয়া দুর্ভিক্ষ, ১৯৯০ সালে উত্তর কোরিয়ার দুর্ভিক্ষ।

এছাড়া ১৯৮৩-৮৪ সালে ইথোপিয়ার দুর্ভিক্ষ। তবে কি ২০২০ সালও এমন হতে চলেছে? ২০২০ থেকেই কি শুরু হবে মহামারী, মহামন্দা বা দুর্ভিক্ষ?

ইতিহাসের মতো এই সালও কি হতে যাচ্ছে একটি অভিশপ্ত বছর। সেই অভিশপ্ত বছরেরই সভ্য সমাজ আমরা, যারা কি খুব দ্রুতই বিলীন হতে চলেছি। জন্ম দিতে চলেছি কি নতুন ইতিহাসের কিংবা বাঁক বদল করতে যাচ্ছি নতুন সভ্যতার? আমরা কি তবে ইতিহাসের পাতায় উঠতে যাচ্ছি নাকি সভ্যতার বাঁক বদল ঘটাতে?

লেখক:
আল আমিন ইসলাম নাসিম
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
ইমেইল : [email protected]

ঢাকা, ০৯ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।