অনলাইন ক্লাস নিয়ে এক রাবি শিক্ষার্থীর অনুভূতি


Published: 2020-07-18 14:47:33 BdST, Updated: 2020-08-13 05:37:27 BdST

আবদুল হালিম বুখারী: পুরো পৃথিবী দিশেহারা করোনা ভাইরাস মহামারিতে। মৃত্যু তো আছেই সাথে সাথে সব কিছু যেন স্থবির করে দিয়েছে। যেখানে বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশ ধরাশায়ী সেখানে নিম্ন আয়ের দেশের কথা আর কি বলব।

এরকম মহামরিতে যেখানে জীবিকার অভাবে মানুষ না খেয়ে মরতে বসেছে সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার কথা বলা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না।

যাইহোক হাজার ঝড়ের মাঝেও মানুষ গড়া প্রত্রিয়া হিসাবে জ্ঞান চর্চার বিকল্প নেই। মানুষ যদি জ্ঞান চর্চার পথ থেকে দুরে থাকে তবে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ থাকবে না।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে এগিয়েছে অনেক দূর। তাই তারা প্রযুক্তির দ্বারা অনেক সমস্যা সমাধান করে থাকে। তেমনি তারা শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে অনলাইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস-পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরু করার পর তা চলছেও সফলভাবে।

এখন নিম্নআয়ের দেশের কথা বলি, যাদের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত না, নেই কোন প্রযুক্তিগত সামর্থ, তারা ইচ্ছা থাকলেও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শতভাগ সফলতা আনতে পারবে না।

গণমাধ্যম মারফত জানতে পারলাম বাংলাদেশ সরকার এরই ধারাবাহিকতায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি চালু করার। এটি খুবই দরকার, কারণ গত চার পাঁচ মাসে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার যে পরিমাণ ক্ষতি সাধিত হয়েছে সেটা কাগজে-কলমে শুধু হিসাব করে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।

পড়াশোনার ধারাবাহিকতা রাখতে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস অতি জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। আমার নিজের জায়গা থেকে আমি উপলব্ধি করছি অনলাইন ক্লাস কতটা জরুরি।

এতক্ষণ যা বললাম তা হলো আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের কথা। স্থবির পড়ালেখার পরিবেশকে গতিশীল করতে পারলে আমরা করোনা মহামারীর দুর্যোগ মুহূর্তে অনেকাংশে নিজেদের ক্ষতিকে পুষিয়ে নিতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।

এখন আসি বাস্তবতায়। আমারা ছোট এবং অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল একটি দেশের নাগরিক। যে দেশের আশি ভাগ মানুষ বাস করে গ্রামে। দেশের যত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে আমরা দেখেছি সেখানে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি।

যাদের পরিবার অতিকষ্ট করে তাদের পড়ালেখার খরচ যোগান দেয়। আমি নিজে দেখেছি অনেক শিক্ষার্থী নিজে টিউশনি করে তার পড়ালেখার খরচ বহন করে, যাদের পরিবার দিন এনে দিন খায়।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও সরকার যে অনলাইনে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চালু করার প্রয়োজ অনুভব করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে কারণে সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

এখন দেখি অনলাইনে ক্লাস করতে একজন ছাত্রের কি কি জিনিসের প্রয়োজন। প্রথমত একটি ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোন এবং দ্বিতীয়ত নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট কানেকশন। প্রাথমিক বিষয়ের সমাধান শিক্ষার্থীদের নিজেদের হাতে। যদিও সবার পক্ষে সমানভাবে প্রস্তুতি নেয়াও সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে মোবাইল কোম্পানী ও সরকারের হাতে। সরকারে কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অনলাইন ক্লাসে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে না কোনক্রমেই।

বছরের প্রথম দিক থেকেই যেখানে সরকার ও জনসাধারণ যেখানে অনলাইনে ক্লাসের বিষয়ে চিন্তা ভাবনা সেসময় আমরা দেখছি মোবাইল কলরেট ও ডাটা প্যাকেজের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

অনলাইনে ক্লাস করতে গেলে একজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ থাকা বাঞ্ছনিয়। তার সাথে সংযুক্ত খরচের বিষয়টি।

ধরে নিলাম শিক্ষরা হয়তো খরচ বহন করে নেবেন যেভাবেই হোক কিন্তু সকল শিক্ষার্থীর পক্ষে কি এই খরচ বহন করা সম্ভব? যেখানে এই মহামারীর পরিস্থিতিতে শত শত পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। এটি কারো অজানা বিষয় নয়।

অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে চাই পাঠক ও সরকারের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্যে। বতর্মান কোম্পানিগুলো যে ইন্টারনেট রেট করেছে তাতে একজন ছাত্রের একমাস ক্লাস করতে ১৫০০-২০০০ টাকার প্রয়োজন।

যার জোগান দিতে একটি পরিবারকে হিমশিম খেতে হবে। এক্ষেত্রে মেনে নিলাম যে, একবেলা না খেয়ে তবুও অনলাইন ক্লাস করবে অনেক ছাত্রছাত্রী। কিন্তু বর্তমানে দেশের গ্রাম পর্যায়ে ইন্টারনেটের যে গতি সেখানে এসেই সবাই ধরাশয়ী হয়ে পড়ছি আমরা।

এত কম গতির ইন্টারনেট দিয়ে কোন ক্রমেই অনলাইন ক্লাস করাটা সম্ভব হচ্ছে না। আমি নিজে তার প্রমাণ। আমাদের ব্যাচে মোট চল্লিশ জন ছাত্রছাত্রী সেখানে অনলাইন ক্লাসে সর্বোচ্চ পনের জনও যুক্ত হতে পারে না। একমাত্র ইন্টারনেট গতির কারণে।

কারণ তারা বেশিরভাগই থাকে গ্রামে। এছাড়া কয়েকজনের তো স্মার্ট ফোনই নেই। এই সমস্যা নিরোধকল্পে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয় ক্লাসের পর কষ্ট করে বঞ্চিতদের জন্য পুনরায় পাঠ তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক গ্রুপে দিয়ে দেন। সেখান থেকে বঞ্চিতরা পাঠ বুঝে নিয়ে নিজেদের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিচ্ছে।

উল্লেখ্য, অনলাইন ক্লাসে ব্যবহৃত জুম, গুগল ক্লাসরুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিম, ভারচুয়াল ক্লাসরুম, সিসকো ওয়েবেক্স, ওয়েবনার ইত্যাদি সফট ওয়ারের জন্য উচ্চগতি সম্পন্ন ইন্টারনেট কানেকশন প্রয়োজন। তুলনামূলকভাবে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যবহৃত ইন্টারনেটের গতি কম হলেও চলে।

ব্যান্ডউইথ কাঙ্খিত মানের না হওয়ায় লাইন বারবার কেটে যায়, ভিডিওসহ যুক্ত হওয়া যায় না অথবা কথা কেটে কেটে শোনা যায়। এরূপ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখী হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

আমি ব্যক্তিগতভাবে করোনাকালীন অচলাবস্থায় অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থার পক্ষে। কিন্তু ইন্টারনেট গতির কারণে যে বারবার হোঁচট খেয়ে কজে বাধাপ্রাপ্ত হতে হচ্ছে তার আশু সমাধানের দিকে নজর দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি নিবেদন করছি।

একটা বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে, কোন শিক্ষার্থীই চায় না সেশন জোটে পড়ে নিজেকে পিছিয়ে দিতে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা তো নয়ই। কিন্তু বাস্তবতার কাছে হার মানতে হচ্ছে আমাদের।

ছাত্র সমাজের অভিভাবক তুল্য বাংলাদেশ সরকার আমাদের দিকে তাকিয়ে যে অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটি আমাদের অনেক বড় পাওয়া।

কারণ বতর্মান এই মহামারীতে দেশের অর্থ ব্যবস্থা সহ অন্যান্য কাঠামোর যে অবস্থা, এরকম অনলাইন ব্যবস্থা করা চিন্তার বাহিরে। তবুও আমাদের সরকার আমাদের দিকে তাকিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে আমরা আনন্দিত।

উপরে উল্লিখিত সমস্যাগুলো নিরসনে শিক্ষার্থীদের পক্ষথেকে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি। সরকারের পক্ষথেকে এই বিষয়গুলো সমাধান দেয়া হলে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম অধিকাংশে সফলতা অর্জন করবে বলে আমাদের ধারণা।

বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো, এক. অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের বিনামুল্যে অথবা সাশ্রয়ীমূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজের ব্যবস্থা করা। যত দিন অনলাইনে ক্লাস চলবে ততোদিন পর্যন্ত কার্যকর হবে।

দুই. দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট গতি যেন নূন্যতম 1Mbps থাকে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করা যে, মোবাইল অপারেটরা ঠিকমত শিক্ষার্থীদের ব্যান্ডউইথ দিচ্ছে কি না। এটি বড় কোন সমস্যা নয়, আশা করি সরকার চাইলে খুব তাড়াতাড়ি এটির ব্যবস্থা করতে পারবে এবং বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।

পরিশেষে বলতে চাই সরকার যদি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে চায় এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণ চায় তাহলে অবশ্যই এই সমস্যা গুলোর সমাধান করে তারপর অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থার চিন্তা করবে বলে আশা করি। নয়তো শিক্ষার্থীর উপকার শুধু কাগজ কলমেই থাকবে, কারো জীবনে উপকারের ছোঁয়াও লাগবে না।

আবদুল হালিম বুখারী
প্রথম বর্ষ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৮ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।