শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন নাকি চরিত্রের বিকাশ?


Published: 2020-09-21 15:03:40 BdST, Updated: 2020-10-26 16:29:09 BdST

তানভীরুল ইসলামঃ আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা একটি স্বীকৃত বিষয়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দ্যেশ্য অর্জনের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যদিও শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ভর করে সমাজের বহুমাত্রিক ভাবাদর্শের উপর। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অর্থ উপার্জন নাকি ব্যক্তির চরিত্রের বিকাশ, তা এখনও অনেকের বিতর্কের বিষয়।

এটাই স্বাভাবিক, সমাজে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতাদর্শের মানুষ থাকার কারণে শিক্ষার অর্থ এবং সংজ্ঞায় থাকবে নানা বৈচিত্র্য। চলমান এই বিতর্কের সহজে অবসান না হলেও, এটি নানাভাবে প্রমাণিত যে, শিক্ষা এবং উন্নয়নের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য ও অঙ্গাঙ্গী।

তত্ত্বগতভাবে মানবপুঁজির উপযুক্ত ব্যবহার ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন বিশ্বে একটি স্বীকৃত ধারণা। মানবসম্পদ মূলত একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ। উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ হচ্ছে প্রত্যক্ষ উপাদান, দ্বিতীয়ত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পুঁজি হচ্ছে পরোক্ষ উপাদান (Passive Factors)।

মানবসম্পদই দ্বিতীয় বিষয়টি মানে, পুঁজি বিনিয়োগ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করে তৈরী করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং তা নিশ্চিত করে জাতীয় উন্নয়নে অগ্রসর হয়। প্রবৃদ্ধি তত্ত্ব অনুযায়ী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সাথে জড়িত হয়ে শিক্ষা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

যেমন শিক্ষায় প্রচুর বিনিযোগ করে হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার এইদেশ গুলো হতে পারে বড় উদাহরণ। মানবপুঁজির উন্নয়নে শিক্ষায় বিশাল বিনিয়োগ তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়েছে। শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার ফলেই চীন তার বিশাল জনগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তর করে শিল্পায়নে ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেছ।

নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের মতে, ‘যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে অন্যতম প্রধান শর্ত। যেমন, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে জাপানের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের শিক্ষার হার ও মান ছিল অতি উঁচু।’ সঙ্গতই বলা যায় শিক্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ একটি জাতির অবস্থা কিভাবে পাল্টে দেয় তার একটি সফল গল্প হচ্ছে আমাদের এশিয়ার দেশ জাপান। বহু আগে জাপান শিক্ষাকে বিশাল পুঁজিতে রুপান্তরিত করেছে। শতভাগ শিক্ষিত জাপানিদের অর্থনৈতিক সম্পদের মধ্যে ১ শতাংশ প্রাকৃতিক পুঁজি, ১৪ শতাংশ ভৌত বা বস্তুগত পুঁজি এবং ৮৫ শতাংশ শিক্ষা সংক্রান্ত মানবিক ও সামাজিক পুঁজি।

শিক্ষায় বিনিয়োগে Rate of Return অধিক। শিক্ষিত শ্রমশক্তির আয় অধিক হয় বিধায় সব অবিভাবকই তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠান। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার Rate of Return ১৮ শতাংশ বা তার উপর। মালয়েশিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরের বাড়তি শিক্ষায় একজন কৃষক ২ থেকে ৫ গুণ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন।

কারণ অধিকতর শিক্ষায় কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গী উন্নত হওয়ার কারণে তারা সৃজনশীল হয়, নতুন পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়। ৪ বছরের অধিক শিক্ষিতরা কৃষিক্ষেত্রে সার ও প্রযুক্তি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হন যারা ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত শিক্ষা নিয়েছে তাদের থেকে।

শিক্ষায় বিনিয়োগের কারণে ব্যক্তি, সমাজ ও সমগ্র বিশ্ব লাভবান হয়। মোটকথা শিক্ষা হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপকরণ ও হাতিয়ার। বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিক নোবেল বিজয়ী থিওডর ডব্লিউ সোলজ “মানবপুঁজির” ধারণাকে পরিচিত করেন এবং এই তত্ত্বের সম্প্রসারণ ঘটান আরেক নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিক গ্রে বেকার। তাদের মতে ব্যক্তির অর্জিত দক্ষতা এবং জ্ঞান শ্রমবাজারে তাদের মূল্য বৃদ্ধি করে। শিক্ষায় বিনিয়োগের অনেক পরোক্ষ ইতিবাচক উপকার ও প্রভাব আছে। যেগুলোকে আমরা ভোগ করতে পারি এবং নানাভাবে এ থেকে লাভবান হতে পারি।

নোবেল বিজয়ি ধ্রুপদী অর্থনীতিক মিল্টন ফ্রিডম্যান ১৯৬২ সালে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু Spillover Effects এর ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, নাগরিকদের একটি বৃহৎ অংশের মধ্যে কিছু অভিন্ন ন্যূনতম শিক্ষা, জ্ঞান ও মূল্যবোধ ব্যতিরেকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সমাজ গড়া অসম্ভব, শিক্ষা সেই কাজটি করে থাকে। একে কেবল অর্থনীতির চালিকা হিসেবে নয়; বৃহত্তর বিবেচনায় তা নৈতিকতা, মানবতা, দক্ষতা, সামর্থ্যের গুণাবলিও অর্জনের কারণ। তাই সামাজিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও উন্নয়ন এ বিষয় তিনটিই সমানুপাতিক। একে অপরের পরিপূরক।

লেখক: তানভীরুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম) //এআই//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।