বাস্তবায়নেই পূর্ণতা পাবে হিন্দু বিধবাদের অধিকার


Published: 2020-12-03 12:27:11 BdST, Updated: 2021-01-18 03:17:44 BdST

আজাহার ইসলামঃ হিন্দু নারীরা বরাবরই অবহেলিত। বিধবা নারীরা আরো বেশি অবহেলিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই তৎকালীন বড়লাট লর্ড ডালহৌসি আইন প্রণয়ন করে বিধবা বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেন। এছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বা আত্মহুতি দেবার কুখ্যাত প্রথা ‘সতীদাহ’। যা রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় লর্ড উইলিয়ম বেন্টিনয়ের দ্বারা ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।

হিন্দু আইন দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি দায়ভাগ অপরটি মিতাক্ষরা। বাংলাদেশের হিন্দু সমাজ দায়ভাগ নীতিতে চলে। দায়ভাগ, সম্পত্তির প্রতি জন্মগত অধিকার স্বীকার করে না। দায়ভাগ মতে উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ধারিত হয় পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের বিধান দ্বারা। স্বামী নিঃসন্তান অবস্থায় পরলোক গমণ করলে দায়ভাগ মতে, যৌথ পরিবারের বিধবা তার স্বামীর অংশের মালিক হয়। হিন্দু নারী তার স্বামীর পরিবারে আশ্রিতা মাত্র। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে নারীদের অধিকার নেই বললেই চলে। বিবাহিতা নারী স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর পরিত্যক্ত বিষয় সম্পত্তি জীবদ্দশায় ভোগ করতে পারে বটে কিন্তু ওয়ারিশ হয় না।

১৯৩৭ সালের ‘হিন্দু উইমেন্স রাইটস টু প্রপার্টি অ্যাক্ট’ এর ৩ ধারায় স্বামীর সম্পতিত্তে বিধবা স্ত্রীর অধিকার বর্ণিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিধবা, এক বা একাধিক হলে সকলে একত্রে মৃতের এক পুত্রের অংশের সমান জীবন স্বত্বে পাবে। এই আইনে কৃষি-অকৃষি বিভেদ করা নেই। পরবর্তীতে ফেডারেল কোর্টের ১৯৪১ সালের রায় অনুযায়ী শুধু অকৃষি জমিতে সম্পত্তি পাবে বলে উল্লেখ করা হয়।

এর মাধ্যমে দায়ভাগ মতে কৃষি জমিতে হিন্দু বিধবাদের কোন অধিকার ছিলনা। এদিকে যদি বিধবা স্ত্রী পুনরায় বিয়ে করে তাহলে পূর্বমৃত স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তবে দেশের সিলেট জেলায় বিধবারা কৃষি ও অকৃষি উভয় সম্পত্তিতে জীবন স্বত্ব পায়। দেশের অন্য জেলাগুলোতে এ আইনের প্রচলন নেই।

গত ২ সেপ্টেম্বর ৮৩ বছর ধরে প্রচলিত আইনের শিকল ভেঙ্গেছে হাইকোর্ট। স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি জমিতেও হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার থাকবে বলে এক রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় দেন। যা হিন্দু বিধবাদের অধিকারে এটি একটি যুগান্তকারী রায়, বলছেন বিজ্ঞ আইনজীবীরা। তবে আইনটি বাস্তবায়ন হতে সময় লাগতে পারে। কেবল বাস্তবায়ন হলেই আইনটি পূর্ণতা পাবে।

আদালতের ব্যাখা অনুযায়ী, ১৯৩৭ সালে হিন্দু নারীর সম্পত্তি অধিকার আইনে কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতে বিধবা নারীর অধিকারের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৩৭ সালের আইনে যেহেতু কৃষি-অকৃষিজমির পার্থক্য করা হয়নি, অতএব বাংলাদেশে কৃষি-অকৃষিজমির কোনো পার্থক্য করা হবে না। কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতেই হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার পাবে। পাশাপাশি বিশেষ প্রয়োজনে (লিগাল নেসেসিসিটিস) বিক্রিও করতে পারবে। এটা কোনো নতুন রায় নয়। বরং প্রচলিত আইনেরই একটি ব্যাখ্যা।

এটি শুধু একটি রায় নয়। হিন্দু বিধবাদের ন্যায্য অধিকার। স্বামীর রেখে যাওয়া বসতভিটায় হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে কৃষি-অকৃষি সম্পত্তিতে বিধবা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। শহুরে নারীরা বিভিন্ন চাকরি/কাজে যুক্ত থাকলেও গ্রামীণ হিন্দুরা শুধু স্বামীর সংসারে ব্যতীত অন্য কাজ করেনা বললেই চলে। তারা সম্পূর্ণরূপে স্বামীর উপর নির্ভরশীল। স্বামী মারা যাওয়ার পর তারাই বেশি হিমশিম খায়। ফলে স্বামী মারা যাওয়ার পর মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় তাদের। আইনটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রামীণ হিন্দু বিধবাদের এ ব্যাপারে অবহিত করাও জরুরি।

লেখকঃ আজাহার ইসলাম
শিক্ষার্থী, ল’ অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

ঢাকা, ০৩ ডিসেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।