খুলনায় ডিজিটাল ব্লাড ব্যাংক সেবা চালু


Published: 2019-06-19 15:39:08 BdST, Updated: 2019-07-23 02:35:20 BdST

খুলনা লাইভ: খুলনা জেলার দক্ষিণাঞ্চল কয়রা উপজেলায় মুমূর্ষু রোগীদের রক্তদানের জন্য খোলা হয়েছে ডিজিটাল কয়রা ব্লাড ব্যাংক।

সমাজের অবহেলিত, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে মানব সেবামূলক কাজের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে এখাতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী নিজেদের আত্ননিয়োগ করে দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করছে। তারা শিশু ও যুব কল্যাণ, শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ ব্যক্তিদের কল্যাণ, বয়স্ক শিক্ষা, পূণর্বাসন, দুস্থদের সহযোগিতা, দারিদ্র রোগীদের সেবা, রক্তদানসহ নানাবিধ মানব কল্যানে নিয়োজিত। এরই ধারাবাহিকতায় রক্তদানে খুলনা জেলার কয়রা থানাধীন কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপের ভূমিকা অপরিসীম।

কয়রা ডিজিটাল ব্লাড ব্যাংক মুমূর্ষু রোগীদের জরুরী রক্তের চাহিদা পূরণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। রক্তদান হচ্ছে সবচেয়ে বড় একটি মানব সেবামূলক ইবাদত। জরুরী মূহুর্তে এক ব্যাগ রক্তই পারে একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে।

একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের আর্শীবাদে জীবন ও জগতের উন্নতি হওয়া সত্বেও রক্তের কোন বিকল্প আবিষ্কার হয়নি। রক্তের বিকল্প শুধু রক্ত যা টাকার পরিমাপে মূল্যায়ন অসম্ভব। একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য যখন জরুরী রক্তের প্রয়োজন, তখনই কেবল বোঝা যায় রক্তের মূল্য কতখানি। প্রতিনিয়ত রক্তের অভাবে ঝরে যাচ্ছে হাজারো প্রাণ। কিন্তু সামাজিকভাবে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে রক্তদাতাদের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল।

এর কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা রক্তদান সম্পর্কে সচেতন নই, রক্তদানের কথা শুনলে আমরা ভয় পাই। কিন্তু আমরা যদি রক্তদান সম্পর্কে জানতে পারি, নিজেকে সচেতন করতে পারি ও মানবসেবায় নিজেকে উজ্জীবিত করতে পারি। তাহলে রক্তদান সম্পর্কে ভয়টাকে জয় করতে পারব।

সাধারনত একজন সুস্থ ব্যক্তি চার মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করতে পারেন। এবার দেখে নেয়া যাক রক্তদানের যোগ্যতাসমূহ-
বয়সঃ ১৮-৫৭ বছর, ওজন: ১০০ পাউন্ড বা ৪৭ কেজির উর্ধ্বে।
তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ( অনুচক্রিকা , রক্তরস ) ওজন ৫৫ কেজি বা তার উর্ধ্বে ও রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে রক্ত দান করা যায়।
রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৭৫% বা তার উর্ধ্বে থাকলে। সম্প্রতি ( ৬-মাস ) কোন দূঘর্টনা বা বড় ধরনের অপারেশন না হলে।
রক্তবাহিত জটিল রোগ যেমন: ম্যালেরিয়া, সিফিলিস , গনোরিয়া, হেপাটাইটিস , এইডস, চর্মরোগ , হৃদরোগ , ডায়াবেটিস , টাইফয়েড এবং বাতজ্বর না থাকলে।
কোন বিশেষ ধরনের ঔষধ ব্যবহার না করলে। চার মাসের মধ্যে যিনি কোথাও রক্ত দেননি।
মহিলাদের মধ্যে যারা গর্ভবতী নন এবং যাদের মাসিক চলছে না এমন ব্যক্তি রক্তদান করতে পারবে।

কয়রা উপজেলার মাটিতে রক্তের অভাবে যেন একটি মানুষও মৃত্যুবরণ না করে এই উদ্দেশ্য নিয়ে গত ১লা জানু'১৯ মোস্তাফিজুর রহমান (সোহাগ ) সোহাগ বাবু, নূরী আলম ও মো. ইকবাল হোসেনসহ তাদের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে শুরু করে অনলাইন ভিত্তিক এরক্তদান সংগঠন কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপ।

কয়রা ব্লাড ব্যাংকের গ্রুপের মূল কাজ ফেসবুক গ্রুপ ও ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে রক্ত গ্রহীতা ও রক্ত দাতাদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে দেওয়া। তাছাড়া রক্তের জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে তাদের ফেসবুক গ্রুপে। https://www.facebook.com/groups/2051610904917513/

রক্তের প্রয়োজনে এজন্য রক্ত গ্রহীতা বা তার পক্ষ থেকে জানাতে হবে রক্তের গ্রুপ ও হাসপাতালের অবস্থান। কয়রায় উপজেলাসহ অন্যান্য যে কোন ব্যক্তি রক্তের প্রয়োজনে কয়রা ব্লাড ব্যাংক কল সেন্টার নাম্বারে ফোন করলেই রক্তদাতা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায় এবং নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের রক্তদান করা হয়:

১. দূঘর্টনাজনিত রক্তক্ষরণ: দূঘর্টনায় আহত রোগীর জন্য দূঘর্টনার ধরণ অনুযায়ী রক্তদান।
২. দগ্ধতা: আগুনে পুড়া বা এসিডে ঝলসানো রোগীর জন্য পাজমা/ রক্তরস প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহ।
৩. অ্যানিমিয়াঃ রক্তে R.B.C. এর পরিমাণ কমে গেলে রক্তে পযার্প্ত পরিমাণ হিমোগ্লোবিনের অভাবে অ্যানিমিয়া রোগ হয়। হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়াতে R.B.C. এর ভাঙ্গন ঘটলে রক্তদান করা হয়।
৪. থ্যালাসেমিয়াঃ এক ধরনের হিমোগ্লোবিনের অভাবজনিত বংশগত রোগ। রোগীকে প্রতিমাসে রক্ত প্রদান।
৫. হৃদরোগঃ ভয়াবহ Heart Surgery এবং Bypass Surgery এর জন্য রক্তদান।
৬. হিমোফিলিয়াঃ এক ধরনের বংশগত রোগ। রক্তক্ষরণ হয় যা সহজে বন্ধ হয় না, তাই রোগীকে রক্ত জমাট বাধার উপাদান সমৃদ্ধ Platelete দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে রক্তদান করা হয়।
৭. প্রসবকালীন রক্তক্ষরণঃ প্রসূতি মায়েদের জন্য সাধারণত প্রয়োজন হয় না তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে রক্ত সরবরাহ করা।
৮. ব্লাড ক্যান্সারঃ রক্তের উপাদানসূমহের অভাবে ক্যান্সার হয়। প্রয়োজন অনুসারে রক্ত দেয়া হয়।
৯. কিডনী ডায়ালাইসিসঃ কিডনী ডায়ালাইসিস করতে।
১০. অস্ত্রপচারঃ অস্ত্রপচারের ধরণ বুঝে রক্তের চাহিদা পূরণ করা হয়।

যারা রক্ত দিতে আগ্রহী তাঁরা কল সেন্টারে ফোন করে নাম নিবন্ধন ও সংযুক্ত থাকতে পারবেন। কয়রা ব্লাড ব্যাংক গ্রুপ সেবা গ্রহীতার কাছ থেকে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ছাড়াই রক্তদানে কাজ করে যাচ্ছ।

ব্লাড ব্যাংক গ্রুপ প্রতিষ্ঠাতা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের ২৩ জন। যারা সার্বক্ষণিক রক্তদানে গ্রুপটি পরিচালনা করছেন । ০১ হাজারেরও বেশি রক্তদাতা বা ডোনারের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত আছে কয়রা ব্লাড ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের কাছে।

কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ তারক বিশ্বাস বলেন, কয়রা মাদকমুক্ত একটি উপজেলা। এখানকার মানুষের জীবনযাপন অতিসাধারণ। কয়রা উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রাণের সংগঠন ডিজিটাল কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপ রক্তদানে এগিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া তিনি এ সংগঠনটির প্রশাসনিক বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

নিকট ভবিষ্যতে তাদের লক্ষ্য একটি ফিজিক্যাল ব্লাড ব্যাংক তৈরি করা এবং কমপক্ষে দুই লাখ মানুষের রক্ত সংক্রান্ত তথ্য বা ডাটাবেইজ সংরক্ষণ করে মুমূর্ষু মানুষের রক্তের চাহিদা পূরণ করে কয়রা উপজেলাসহ অন্যান্য উপজেলা, জেলার মানুষের রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচানো। এই সংগঠনটি বর্তমানে কয়রায় রোগীদের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

কয়রা ব্লাড ব্যাংক গ্রুপ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা জানান, কয়রা উপজেলাসহ অন্যান্য স্থানের একটি মানুষও যেন রক্তের অভাবে না মারা যায়। সে লক্ষে তারা কাজ করে যাচ্ছে। এলাকাবাসী জানায়, এ পর্যন্ত কয়রা ব্লাড ব্যাংক ৭০০ জনেরও বেশি রোগীকে রক্তদান করেছে। আমরা ডিজিটাল কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপের কল্যাণ ও শুভ কামনা করি।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম “ফেসবুক” এর ইতিবাচক সহযোগিতা নিয়ে কয়রা ব্লাড ব্যাংক কাজ করে চলেছে। স্বেচ্ছায় ফেসবুক ব্যবহারকারীরা নিজের রক্তের গ্রুপ ও অন্যান্য তথ্য কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপকে জানাচ্ছে, তখন সেই তথ্যসমূহ ফেসবুক গ্রুপ সংরক্ষণ করছে। যখন কারও রক্তের দরকার হচ্ছে তখনই ফেসবুক নোটিফিকেশন এর মাধ্যমে রক্ত গ্রহীতা ও রক্তদাতাদের যুক্ত করে দিচ্ছে।

কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এস, এম শফিকুল ইসলাম বলেন, মুমূর্ষু অবস্থায় একজন রোগীকে রক্তদান করার মত মহৎ কাজ আর হতে পারেনা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রক্তদানমূলক সামাজিক সংগঠন কয়রা ব্লাড ব্যাংক ফেসবুক গ্রুপটি মুমূর্ষু রোগীদের জীবন বাঁচাতে কাজ করছে। তিনি এ সামাজিক সংগঠনটির পাশে থেকে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ঢাকা, ১৯ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//আরএইচ

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।