সিনিয়র নেতাকে গালাগাল ও রাস্তায় নগ্ন করে পেটানোর হুমকি...ভাইরাল হলো সেই হুইপের ছেলে শারুনের গুলি বর্ষণের ভিডিও


Published: 2019-09-27 20:15:31 BdST, Updated: 2019-11-12 14:33:05 BdST

লাইভ প্রতিবেদকঃ বাড়াবাড়ি ভাল নয়। বেশী বাড়লে সমস্যায় পরতে হয় সবখানে। তাকে নিয়ে চলছে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। আর ওই সমালোচনার মূল আলোচিত ব্যক্তি হলেন জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী। কেবল তিনি নন তার সোনার ছেলেও জড়িয়েছেন ওই সমালোচনার জটে। নানান বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীকে।

শামসুল হকের ছেলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে অশ্লীল বাক্যবিনিময়ের অডিও ফাঁসের পর এবার ভাইরাল হলো ভারী অস্ত্র দিয়ে পুরোপুরি সামরিক কায়দায় হুইপপুত্র শারুনের গুলিবর্ষণের ভিডিও। আর তা নিয়ে চলছে নানান সমালোচনা।

শারুন, তার পিতা ও সাধারণ সম্পাদক

 

জানাগেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওটি হুইপ পরিবারকে নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে এ নিয়ে। অনেকে আবার এর মাঝে দেখছেন ষড়যন্ত্র। Alizeh Murtaza : News (আলিজেহ মুরতাজা নিউজ) নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, পুরোপুরি সামরিক কায়দায় ৪৭ রাইফেল সাদৃশ্য আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি বর্ষণ করছেন হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন। তখন তাকে ঘিরে ছিল তার দলবল।

সংশ্লিস্টরা জানান, গত ১৪ ঘণ্টায় ভিডিওটি দেখা হয়েছে সাত হাজার ৯০০ বার। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলের একজন সদস্য ও হুইপপুত্রকে ঠান্ডা মাথায় এমন ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখে এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এর আগে নগরের আবহানী ক্লাবে র‌্যাবের অভিযান নিয়ে মুখ খুলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন হুইপ শামসুল হক চৌধুরী।

পরে একই ইস্যুতে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীকে টেলিফোনে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে অপমানের অডিও ক্লিপও ঝড় তোলে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শারুনের ওই ভিডিও-কে পুঁজি করে সরকারের সমালোচনায় মেতে উঠেছে একটি পক্ষ।

তারা প্রশ্ন তুলছেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হুইপ শামসুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছে। পরিকল্পিতভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।’ ভিডিওটির বিষয়ে বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের একটি শ্যুটিং ক্লাবে অনুশীলনের সময় এ ভিডিওটি ধারণ করা হয়।

একে-৪৭ হাতে শারুন

 

‘হুইপ শামসুল হক চৌধুরী ক্লাবে জুয়ার আসর থেকে ১৮০ কোটি টাকা আয় করেন’-এমন অভিযোগ এনে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার অভিযোগে পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহমুদ সাইফুল আমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করা হয়।

গত বুধবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আস-শামস জগলুল হোসেনের আদালতে মামলাটি করেন হুইপ শামসুল হক চৌধুরী। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমকে তদন্ত করে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন।

আওয়ামী লীগের হুইপ শামসুল হকের ছেলে শারুন ও চট্টগ্রাম আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রবীণ নেতা দিদারুল আলমের টেলিফোন কথোপকথনের অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে দেশজুড়ে ঝড় ওঠে। হুইপের ছেলে শারুন দিদারুল আলম চৌধুরীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও রাস্তায় নগ্ন করে পেটানোর হুমকি দেন।

হুইপকে নিয়ে যা বললেন দিদারুল আলম চৌধুরী

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রবীণ এ নেতা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, পটিয়ার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরী একসময় ডবলমুরিং থানা যুবদলের সেক্রেটারি ছিলেন। পরে জাতীয় পার্টির রাজনীতিও করেছেন। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে আসেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।

এ সময় উপস্থিত অন্যদের ধরে নির্বাচনী প্রচারণার মাইক হাতে নেন শামসুল হক চৌধুরী। জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে লাগামহীনভাবে গালাগালি করায় সেদিন জিয়াউর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন শামসুল হক। সেদিন তার ‘বিচ্ছু শামসু’ নামটি দেন জিয়াউর রহমান। দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, জিয়ার প্রডাক্টের কাছে কখনও বঙ্গবন্ধু কিংবা তার মেয়ের জন্য ভালোবাসা থাকবে না। থাকবে শুধু বাইরের একটা রূপ ব্যবহার করে উনার থেকে কিছু হাতিয়ে নেয়া। প্রকৃতপক্ষে তার অন্তরে বিএনপি-জাতীয় পার্টি। মুখে মুখে তিনি আওয়ামী লীগ।

আর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক আরও বলেন, ডবলমুরিং থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময় তিনটি টাইপ মেশিন চুরি করে হাতেনাতে ধরা পড়েছিলেন শামসুল হক চৌধুরী। ওই ঘটনায় ১৭ দিন হাজতবাসও করেন। পরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নিউ মার্কেট মোড়ে আওয়ামী লীগের মিটিং পণ্ড করার জন্য বোমা হামলা চালান দলবল নিয়ে।

তখন আমাদের মোশাররফ ভাই আহত হন। বোমা হামলার পর আমাদের নেতা ইসহাক মিয়া মাইকে বলেছিলেন, “কে তুমি হামলাকারী? আমি তোমাকে ভালো করে চিনেছি। তোমার নামের প্রথম অক্ষর ‘শ’।” দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, ৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে শামসুল হক আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চাচ্ছেন বিধায় স্টেডিয়ামে গরু জবাই করেন।

হুইপ পুত্র শারুন

 

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাই আর আমি বহু চেষ্টা করে তাকে যোগ দিতে দেইনি। এর সাক্ষী আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন প্রটোকল অফিসার। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আওয়ামী লীগের ৫০ বছর পূর্তিতে তার যোগদানের চেষ্টা আমরা রুখে দেই। পরে ঢাকার কিছু নীতিভ্রষ্ট ক্রীড়া সংগঠক টাকার বিনিময়ে তাকে আওয়ামী লীগে যোগদানের সুযোগ দেন।

সৈয়দ সেলিম নবীর (বর্তমানে ভারতে বসবাসকারী) কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে শেখ রাসেল ক্রীড়া সংসদে দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ পান শামসুল হক। সেদিনও সেলিম নবী ইন্ডিয়া থেকে আমাকে ফোন করে বলল, তার টাকাটা আজ পর্যন্ত শামসুল হক দেননি। তাকে বলা হয়েছিল পরিচালক করা হবে।

কদিন আগে পরিচালক পদ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে সেলিম নবীর নাম নেই। তিনি এমপি বা হুইপ যদি না হতেন তাহলে একবাক্যে বলতাম, তার মতো একজন প্রতারক বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের প্রবীণ এ নেতা আরও বলেন, এরপর শামসুল হক আবাহনীর সাইনবোর্ড ধারণ করলেন। আবাহনীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর একটা দুর্বলতা আছে, যেহেতু সংগঠনটি তার প্রিয় ভাই শেখ কামালের হাতে গড়া।

শামসুল হক চৌধুরী চেয়েছিলেন আবাহনীকে হাতিয়ার করে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। এই আবাহনীকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগান, ষোল আনা উশুল করে নিলেন।
দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় নেত্রী, আমার বড়বোনকে অনুরোধ করব- দলে যারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শ বিশ্বাস করে না তাদের ছাঁটাই করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শিক সন্তান, সে পেটে পাথর বেঁধে উপোস থাকবে, কিন্তু চুরি করতে যাবে না।

হুইপপুত্র শারুনের সঙ্গে ফোনালাপ, যা বললেন দিদারুল আলম

তিনি বলেন, আবাহনী লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবের তিন সিগনেটরির একজন তিনি। তাকে বাদ দিয়ে সংগঠনের অর্থ নয়ছয় করার চেষ্টা হলে তিনি আবেদন করে ব্যাংক হিসাবটি বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি নিজেই হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী শারুনকে ফোন করে তার বাবার সঙ্গে জমি নিয়ে চলা বিরোধটি মিটিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেন এবং দেখা করার জন্য সময় চান।

ফোনালাপের শুরুতে ব্যবহার ভালো করলেও শেষের দিকে আবাহনীর ব্যাংক হিসাব বন্ধ করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শারুন এবং একপর্যায়ে চড়-থাপ্পড়ের হুমকি ও রাস্তাঘাটে নগ্ন করে পেটানোসহ অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। মূলত ওই ফোনালাপের জেরেই শামসুল হক চৌধুরী প্রসঙ্গে মুখ খুললেন দিদারুল আলম চৌধুরী। ফাঁস করে দিলেন তার সব কা কীর্তি।

দিদারুল-শারুন: ফোনালাপের চুম্বক অংশ:

দিদারুল : ক্লাবের ব্যাপারে তোমার আব্বার সাথে বসে কথা বলব।

শারুন : ক্লাবের ব্যাপারে কীসের কথা? ক্লাবের ব্যাপারে যা কথা হওয়ার হইছে আর কথা বলার দরকার নেই। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখাইছেন তো, এখন আমাদেরটা আমরা দেখাব।

দিদারুল : ক্ষমতা-টমতা কিচ্ছু না…

শারুন : দেখাইছেন তো। আপনি ক্ষমতা দেখাচ্ছেন না?

দিদারুল : আমাদের সেইফের জন্য করতে হবে না…

শারুন : আমরা যদি ক্ষমতা দেখাই আপনি এক পারসেন্টও টিকতে পারবেন?

দিদারুল : না না, আমি ১০০ পারসেন্ট টিকতে পারব। আমি হইলাম শেখ মুজিবের আদর্শিক সন্তান।

শারুন : এ, এইসব গালগোল অন্য জায়গায় কইরেন। আমার সাথে কইরেন না। আমি সম্মান দিছি সম্মান নিয়ে থাইকেন।

দিদারুল : শোনো আমি সাগরেদ নই। তোমার আব্বা তো জাতীয় পার্টি করে, এখন আওয়ামী লীগে এসেছে…

শারুন : এগুলা শেখ হাসিনা বুঝবে। আপনার বোঝার দরকার নাই। রাখেন মিয়া ফালতু।

দিদারুল : আমরা তো শাহজাদা, সাগরেদ না…

শারুন : আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না…

দিদারুল : আমি তোমাকে এই জন্যই ফোন দিই নাই। তুমি এক কাজ কর রবিবার এসো।

শারুন : রাস্তাঘাটে যখন প্যান্ট-শার্ট খুইলা দিমু তখন বুঝবেন। বেআদবি তো এখনো দেখেন নাই। সম্মান করে কথা বলছি গায়ে লাগতেছে না…

দিদারুল : অ্যা অ্যা? তুমি রাস্তাঘাটে...

শারুন : আপনি উল্টাপাল্টা কথা বলতেছেন কীসের জন্য?

দিদারুল : উল্টাপাল্টা কী বললাম? আরে শোনো তোমার বাবা বিএনপি-যুবদলের এরপর জাতীয় পার্টি কইরা এখন...

শারুন : গালবাজি যেখানে-সেখানে করবি রাস্তাঘাটে চড় মেরে মুখের দাঁত সবগুলো ফেলে দেব। বেআদব কোথাকার!

এনিয়ে চট্রগ্রামে নানান আলোচনার ঝড় উঠেছে। সিনিয়র নেতারা এসব মেনে নিতে পারছেন না। তারা দলের কাছে বিচার চাইবেন বলেও জানাগেছে।

ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।