‘স্বাস্থ্য বিভাগ কে চালায়? এটা একটা আজগুবি বিভাগদুই মন্ত্রীর বাহাস!


Published: 2020-07-14 21:07:31 BdST, Updated: 2020-08-14 13:32:18 BdST

আজহার মাহমুদ: যেন বাহাস চলছে। তবে মুখোমুখি নয় এই বাহাস। এক মন্ত্রী বলছেন মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তরের মাঝে সমন্বয় নেই। মন্ত্রনালয় থেকে যেন অধিদপ্তর আলাদা। তবে সংশ্লিস্ট মন্ত্রী বলেছেন মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তরের মাঝে কোন সমস্যা নেই। সমন্বয় আছে আমাদের মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে। সবই ঠিকঠাক চলছে। এই ভার্চুয়াল বাহাস হচ্ছে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মধ্যে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাঝে সমন্বয়ের অভাব আছে। করোনার চিকিৎসা, সংক্রমণরোধ এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে সুসমন্বয় প্রতিষ্ঠা জরুরি হয়েছে।

তবে খুবই কৌশলী হয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক কারো নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো সমস্যা নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে মন্ত্রণালয় প্রশাসনিকভাবে কোনো কাজের ব্যাখ্যা চাইতেই পারে। এটি সরকারি কাজের একটি অংশ। দুই মন্ত্রীর মাঝে বুদ্ধিমত্তার বাহাসে অনেক বিশ্লেষক বলেছেন কৌশলী হলে চলবে না। নিজ মন্ত্রনালয়ের সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে। কোথায় গলদ তা বের করতে না পারলে সমস্যায় পড়বে স্বাস্থ্য খাত। ভোগান্তিতে পড়বে দেশের সাধারণ জনগন।

সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের

 

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অবস্থিত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি ওই কথাগুলো বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনার নমুনা পরীক্ষা ক্রমশ কমছে। আবার পরীক্ষিত নমুনা বিবেচনায় আক্রান্তের হার বেশি যা অংকের হিসাবে প্রায় চার ভাগের একভাগ। নমুনা পরীক্ষা আরও বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাই।

মন্ত্রী ওই মন্ত্রনালয় ও অধিদপ্তরকে লক্ষ্য করে বলেন, ল্যাবগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী পরীক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রেরণে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর ও দ্রুত উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। ফি নির্ধারণের ফলে অনেক অসহায়, কর্মহীন, দরিদ্র মানুষ করোনার লক্ষণ দেখা দিলেও পরীক্ষা করাতে আসে না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। অসহায় মানুষগুলোর সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সেতুমন্ত্রী বলেন, করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ যেমন উদ্বেগ বাড়িয়েছে অন্যদিকে বিদেশে দেশের ইমেজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাই এ ধরনের অপকর্ম নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান যেন এ ধরনের অপরাধ করতে না পারে সে জন্য সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ঐতিহ্যগতভাবেই যে কোন সমস্যায় অসহায় মানুষকে সহায়তা করে আসছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অধিদফতরের কোনো সমস্যা চলছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অধিদফতরের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কোনো সমস্যা নেই। দুটিই সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। দুটি প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে কোভিড-১৯ এর দুর্যোগ মোকাবিলায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। আমরা সব কাজ বিধি অনুযায়ী করে যাচ্ছি। ছোটখাট সমস্যা হলে তা দুর করছি। জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে মন্ত্রণালয় থেকে অধিদফতরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এটি সরকারের প্রশাসনিক ও দাফতরিক কাজের একটি অংশ মাত্র। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সমস্যার কোনো ব্যাপার এটি নয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক

 

জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের অনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটুকু হয়েছে তা সরকার খতিয়ে দেখছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের কঠোর বিচার করতে হবে। তাদের প্রশ্রয়দানকারীদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো ক্লিনিক ও হাসপাতালে অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ড হলে তা দ্রুততার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি।

এদিকে একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারি প্রকাশের পর একে অপরের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকার পরও রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার অনুমতি দেয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে শোকজ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই কাজ করছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে ভোগান্তি বাড়বে । তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আঙুল তুলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দিকে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আঙুল তুলছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পরবেন।

একরামুল করিম চৌধুরী এমপি

 

অন্যদিকে দোষারোপ বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব। তিনি বলেন, তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল। হয়তো এ সম্পর্কে তারা বোঝেনি, যে যার মতো কাজ করেছে। এছাড়া দেখতে হবে এখানে কোনো দুর্বৃত্ত টিম আছে কিনা। এখন এসব থেকে বের হয়ে এক সাথে কাজ করতে হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে দেয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক সংসদ সদস্যের বক্তব্য ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তিনি হলেন জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নোয়াখালী- ৪ (সদর- সুবর্ণচর) আসনের একরামুল করিম চৌধুরী এমপি। গত সোমবার ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে দেয়া এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ কে চালায়? এটা একটা আজগুবি বিভাগ এ বিভাগের আগা নেই গোড়া নেই’।

তিনি দুঃখ করে বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নোয়াখালীতে ১০টা আইসিউ বেড দেবে অথচ স্বাস্থ্য বিভাগ তা কার্যকর করছে না। করামুল করিম চৌধুরী এমপি বলেন, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য অথচ আমি জানি না এ দফতর কিভাবে চলছে, কে চালাচ্ছে? একটা দেশে এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের এ উদাসীনতা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারেন না।

তার এ ভিডিওবার্তা ইতিমধ্যে ৩ লাখ ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষ দেখেছেন। এর মধ্যে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ শেয়ার করেছেন। আর ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ লাইক কমেন্ট করেছেন। এসব মিলিয়ে এখাতকে রক্ষা করতে হলে প্রধানমন্ত্রী আশুহস্তক্ষেপ চেয়েছেন অনেকেই। তা না হলে রশি টানাটানিতে ভোগান্তিতে পড়বে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

ঢাকা, ১৪ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)/এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।