বাসা ভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালাদের চাপ, বিপাকে বশেমুরবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা


Published: 2020-06-04 00:39:56 BdST, Updated: 2020-07-06 17:23:06 BdST

আর এস মাহমুদ হাসান, বশেমুরবিপ্রবিঃ মরণঘাতি করোনার ছোবলে তছনছ সারা বিশ্ব। দিশেহারা বাঘা বাঘা রাষ্ট্র নায়করা। এর ধাক্কা বাংলাদেশেও লেগেছে। এ কারণে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা চলে যান যে যার বাসা ও গ্রামের বাড়িতে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের তেমন কোন সমস্যা না হলেও যারা মেসে ও বাসা ভাড়া করে থাকেন তারা পড়েছেন বিপাকে। এসব বাড়ি ওয়ালা ও মেসের মালিকরা ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) নবীনবাগ এলাকার শিক্ষার্থীরা এনিয়ে আছেন নানান সমস্যায়। মেস ও বাসা ভাড়া নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছে অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা। বাসা ভাড়া না পেয়ে বাসা ছাড়ার হুমকিও দিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।

নবীনবাগের আখতারুজ্জামান চৌধুরী নামের একজন বাড়িওয়ালার ভাষ্য "আমি টাকা খরচ করে বাড়ি বানিয়েছি। গোবরা, পাথালিয়া গ্রামের অনেক মেসের মালিকরা ছাত্রদের উপর নির্ভরশীল। নবীনগর উপ-শহর এলাকা, আবাসিক এলাকা এইখানের হিসাব আলাদা। ওই বাড়িওয়ালা বলেন, আমার ফ্যামিলি বাসা। আমি ছাত্র বাদে অন্য যারা চাকুরীজীবীদের বাসা ভাড়া দিতে পারি। তার পরেও শিক্ষার্থীদের ভাড়া দিয়েছি। আমি বাড়ি ভাড়া কম নেবনা। তিনি বলেন, মেয়েরা রুমে তালা দিয়ে চলে গেছে। বাসা আটকানো। তাদের পুরো ভাড়া দিতে হবে, নইলে আমি কিভাবে চলবো"।

নবীনবাগ ৬ তলা মেস মালিক বলেন, "ছেলেরা আমাকে নানা বলে ডাকে। আল্লাহ না করুক এই করোনাতে আমি মারা যেতে পারি। আমার মেসের অনেক ছাত্রও মারা যেতে পারে। আমার মেসে কখনো ১৫০, কখনো ২০০ ছাত্র থাকে। ওরা ফিরে আসলে দুই পক্ষ বসে একটা সমঝোতা করব"। তিনি এটাও জানান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো বাড়ি ভাড়া মওকুফের ব্যাপারে তাদের কিছু জানায়নি।

প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ ইসলাম ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, আবাসিক হলে সিট পাইনি বলে থাকি নবীনবাগের একটি মেসে। করোনাকালে ক্যাম্পাস ছুটি থাকায় গত এপ্রিলের ভাড়া পরিশোধ করলেও মে মাসের ভাড়া এখনো পরিশোধ করতে পারেননি। তিনি বলেন, এখন বাড়িওয়ালা ফোন দিয়ে মে মাসের ভাড়া পরিশোধের চাপ দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মেস ভাড়া পরিশোধ করা তার পক্ষে যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘার মতোই অবস্থা।

কৃষি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অনুভা ইসলাম অগ্নি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান, "ফ্লাট ভাড়া খুব বেশি হওয়ায় এই করোনা পরিস্থিতিতে সবার পক্ষে একসাথে তিন মাসের ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অন্যান্য এলাকার মতো নবীনবাগে ও বাড়ি ভাড়া মওকুফের দাবি জানাচ্ছি"।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নবীনবাগের অনেক শিক্ষার্থী প্রশাসনের অনীহাকে দায়ী করে বলেন, গোবরা এলাকা আর নবীনবাগ এলাকাতে বাসা ভাড়া নিয়ে কেন আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত আসবে, এক মিটিংয়ে কেন বাসা ভাড়া সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধান হলোনা। তার দাবী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হলেই শিক্ষার্থীদের উপকার হবে।

নবীনবাগ এলাকায় মেসে থেকে পড়াশোনা করেন এমন বিভিন্ন বিভাগ ও বর্ষের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অবস্থা শুধু জাহিদ, অগ্নির একার নয়, মেসে থাকা নবীনবাগের প্রায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। এসময় তারা করোনার সময়টুকুতে মেস ভাড়া মওকুফের দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি ছাত্র হল এবং দুটি ছাত্রী হল রয়েছে। শেখ রাসেল হলের প্রভোস্ট শেখ ফায়েকুজ্জামান টিটো ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, "তিনটি ছাত্র হল এবং দুইটি ছাত্রী হলে আনুমানিক ২ হাজার মত শিক্ষার্থী থাকেন"।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২,০০০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের তুলনায় হলগুলোর সিট পর্যাপ্ত নয়। বাকি ১০,০০০ মত শিক্ষার্থী অনাবাসিক, যারা আশেপাশের গোবরা, পাথালিয়া, সোনাকুর, নবীনবাগ, পাচুড়িয়া, বেদগ্রাম, ঘোনাপাড়া সহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় মেস ও ভাড়া বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছেন।

এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই টিউশন করে নিজের খরচ চালান। অন্যরা পরিবার থেকে পাঠানো টাকার ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য অনেক পরিবারের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তারা আরও জানায়, "আমরা অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। আমাদের পরিবার থেকে তেমন সাপোর্ট নেই। আর এই মুহূর্তে বাড়িওয়ালাদের হুমকিতে আমরা আতঙ্কিত।" এমতাবস্থায় তারা বাড়ি ভাড়া মওকুফের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

শেখ রাসেল হলের প্রভোস্ট ও বাসাভাড়া সংক্রান্ত কমিটির সদস্য সচিব শেখ ফায়েকুজ্জামান টিটো নবীনবাগ এলাকার মিটিং অগ্রগতির ব্যাপারে আরো বলেন, "আমরা শুনেছি গতকাল (২জুন) নবীনবাগের বাড়িওয়ালাদের নিয়ে একটা কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় কমিশনার ও কয়েকজন বাড়িওয়ালাকে নিয়ে আমরা বসার চিন্তাভাবনা করছি।"

একই কথা বলেন শিক্ষক সমিতি ও বাসাভাড়া সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ড. হাসিবুর রহমান। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, "নবীনবাগের করোনা পরিস্থিতি তেমন ভালোনা। এইজন্য আমরা নবীনবাগ বাসা ভাড়া সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল হকের সঙ্গে মিটিং এর তারিখ দিলে তাদেরসহ অন্যান্য কয়েকজন বাড়িওয়ালাকে নিয়ে বসব"।

এর আগে গত ১৪ ই মে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে গোবরা এলাকার বাড়িমালিকদের কাছ থেকে বাসাভাড়া ৪০ শতাংশ কম নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়। ঈদের পরে নবীনবাগ এলাকার মালিকদের সাথে মিটিং করার পরিকল্পনা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক কাজী মসিউর রহমান বলেন, আবাসন সমস্যা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা।

এদিকে নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমাতে হবে। আমরা পরিকল্পনা করছি পরবর্তী বছর থেকে প্রথম বর্ষে প্রতিটি বিভাগে আসন সংখ্যা ৪০ এ কমিয়ে আনতে। বাড়ি ভাড়া কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে উচ্চ বাড়ি ভাড়া সমস্যার সমাধান হিসেবে আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুবিধাজনক বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের চেষ্টা করব।

ঢাকা, ০৩ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।