মসজিদুল হারামের খুতবা: মৃত্যুকালীন অবস্থা ও ভাবনা


Published: 2019-03-03 21:59:13 BdST, Updated: 2019-09-17 17:01:40 BdST

শাইখ সালিহ বিন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ: প্রশংসা মহান আল্লাহর। তিনি আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি উত্তম অভিভাবক। আমি আমার নিজকে এবং আপনাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। সততাকে আঁকড়ে ধরুন।

একজন ব্যক্তি সততাকে আঁকড়ে ধরবে, সততার সন্ধান করবে, আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে সিদ্দীক তথা অতি-সত্যবাদী হিসাবে লিখে নিবেন। অপর দিকে একজন মিথ্যা বলবে, মিথ্যার পিছনে চলবে, আল্লাহ তাকে তাঁর কাছে মিথ্যাবাদী হিসাবে লিপিবদ্ধ করবেন।

অন্তরের প্রশান্তি জানড়বাতী লোকদের জন্য একটি নিয়ামত। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের অন্তরের বিদ্বেষভাব আমি দূর করে দিয়েছি। তারা পরস্পর ভাই-ভাই হিসাবে সামনা-সামনি বসবে।’ (আল-হিজর: ৪৭)

হে মুসলিম সমাজ! বান্দার ওপর আল্লাহর বড় একটি অনুগ্রহ হলো একটি জীবন্ত আত্মা। যে আত্মা ব্যক্তির জীবনের বিভিনড়ব অবস্থা ও পরিবর্তনকে স্মরণে রাখে। বিশেষ বিশেষ অবস্থাকে জাগ্রত রাখে। জীবন তো পরিবর্তিত অবস্থার নাম। জীবনের এ পরিবর্তিত অবস্থা ও অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ। মানুষের জীবনে যে পরিবর্তন আসে তা একটি আরেকটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে মধ্যে একটি পরিবর্তন আরেকটি পরিবর্তনকে ভুলিয়ে দেয়।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ অবস্থান হলো মৃত্যুকালীন সময়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহি.) বলেন, মানুষের যখন মৃত্যুর সময় আসে তখন তার মধ্যে এমন সতর্কভাব সৃষ্টি হয় যা বর্ণনা করার মতো নয়। সে তার অতীতকে স্মরণ করে। সে ভাবে তাকে যদি সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে না করা সবগুলো কাজ যথাযথভাবে করবে। এখন মৃত্যু যেমন তার সামনে নিশ্চিত, সে এভাবে সততা ও নিশ্চয়তা নিয়ে আল্লাহর কাছে তাওবা করবে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মৃত্যুকালীন সময়ে যে এমনটি ঘটবে এ বিষয়ের ভাবনা মানুষকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত রাখে। পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সাথে কাজের উদ্যোগ সৃষ্টি করে। কর্মের সংশোধন করে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মৃত্যুকালীন সময় হচ্ছে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। এ সময়টিতে মানুষ নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, তাকে মরতেই হচ্ছে। এটিই সত্যি, এতে কোনো মিথ্যা নেই। মৃত্যু থেকে পালানোর সুযোগ নেই। সে সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে যে, তার পরকালীন জীবনের সূচনা হলো। দুনিয়ার জীবনের যবনিকাপাত ঘটলো। সে এমন কিছু দেখতে পাবে যা অতীতে কখনো দেখেনি।

বন্ধুগণ! মৃত্যুকালীন সময়টি জীবনাবসানের সময়। এটি হতাশা ও অক্ষমতার সময়। দুনিয়ার জীবন এমন একটি সময় যেখানে রয়েছে সুস্থতা, সচ্ছলতা, সম্মান ও মর্যাদা। রয়েছে দিগন্তহীন আকাক্সক্ষা ও পরিকল্পনা। এ অবস্থায় যখনি মৃত্যুর সময় এসে যায়, তখনি নেমে আসে হতাশা ও অক্ষমতা।

ভাবে কী চেয়েছিল, আর ঘটলো কী? লোকজন তার চারপাশ থেকে সরে যায়। স্বার্থপরায়ণ লোকরা দূরে চলে যায়। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কাজে আসে প্রশান্ত হৃদয়, ভাল কর্ম, উত্তম ইবাদাত, সচ্চরিত্র, মানুষের জন্য কল্যাণকর কাজ। ইবরাহীম (আ.)-এর ভাষায় ‘হে রব! পুনরুত্থান দিবসে আমাকে লাঞ্ছিত করো না, যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না।

তবে যে আমার কাছে আসবে সুস্থ অন্তর নিয়ে।’ (আশ-শু‘আরা: ৮৭-৮৯) মৃত্যুকালে একজন ভাববে তার হিংসা-বিদ্বেষের কথা। ভাববে কেন এ কাজটি আগে করেছে, কেন এ কাজটি পরে করেছে। কেন বা এ কাজটিতে অবহেলা করেছে, কেন সে এ বিষয়টি উপেক্ষা করেছে।

কেন সে পরিবার-সন্তানদের প্রশিক্ষণ ও সংশোধনে অবহেলা করেছে। মৃত্যুর সময় সকল আশা-আকাক্সক্ষার অবসান ঘটবে। মৃত্যুর সময় সে অনুধাবন করবে, সে যে বিষয় তীব্রভাবে চেয়েছিল, তার পূর্ববর্তীরাও তা চেয়েছিল। দুনিয়ার জীবনে তারা যেমন করেছে, সেও তা-ই করেছে। অতঃপর মৃত্যু তাদের অন্তরগুলো ছিনিয়ে নিয়েছে। তাদের সকল আশা-আকাক্সক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।

তারা সম্পদ সঞ্চয় করেছিল, তা আজ উত্তরাধিকারীদের সম্পদ হয়েছে। ঘর-বাড়ি বানিয়েছিল, যা আজ তাদের স্মরণীয় বিষয় হিসাবে টিকে আছে। আখিরাতকে অবহেলা করেছিল, সে আখিরাত তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। দুনিয়ার প্রতি তারা অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়েছিল, সে দুনিয়া তাদের পিছনে চলে গিয়েছে। তারা নগদ প্রাপ্তি তথা দুনিয়াকে ভালবেসেছে, আখিরাতকে নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুর সময় অতীত স্মরণ করার সময়। আত্ম-পর্যালোচনার সময়।

তখন বলবে আমি যদি দুনিয়া ও আখিরাত নিয়ে যথাযথভাবে ভাবতাম, তাহলে এ বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হতো যে, নিষ্ঠা, উত্তম আমল, মানুষের কল্যাণে কাজই সঠিক পথ। আল্লাহর ক্সনকট্য লাভ ও নিষ্ঠার সাথে তাঁর ইবাদাত করার মধ্যেই প্রকৃত মর্যাদা। পৃথিবীতে যে যত মর্যাদার অধিকারীই হোক, যে যত সম্পদশালীই হোক, মৃত্যুর সময় সব শেষ হয়ে যাবে। সকল আশা-আকাক্সক্ষার অবসান ঘটবে। তাদের কেউ বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে আরেকবার পৃথিবীতে ফেরত পাঠাও।’ (আল-মু’মিনূন: ৯৯) আবার কেউ বলবে, ‘হে আমার রব! তুমি যদি আমাকে আরো কিছু কালের অবকাশ দিতে, তাহলে আমি তোমার পথে দান করতাম এবং আমি তোমার নেক বান্দাদের দলে শামিল হয়ে যেতাম।’ (মুনাফিকুন: ১০)

আবার কেউ বলবে, ‘হায় আফসোস! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্য পালনে আমি দারুণ ক্সশথিল্য প্রদর্শন করেছি।’ (যুমার: ৫১) তাদের সবার উদ্দেশ্যে একই জবাব দেয়া হবে, ‘আমি কি তোমাদেরকে দুনিয়ায় এক দীর্ঘ জীবন দান করিনি। সাবধান হতে চাইলে কেউ কি সাবধান হতে পারতো না? তা ছাড়া তোমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিলো। সুতরাং এখন তোমাদের আযাবের মজা উপভোগ করো। মূলতঃ যালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (ফাতির: ৩৭) বিপরীত দিকে কতই না সৌভাগ্যবান তারা, যাদের বিষয়ে বলা হয়েছে ‘মৃত্যুর সময় তাদের কাছে ফেরেশতা অবতরণ করবে এবং তাদের বলবে, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না; তোমাদের কাছে যে জানড়বাতের ওয়াদা করা হয়েছিলো, এখন তোমরা তার সুসংবাদ গ্রহণ করো।

আমরা ফেরেশতারা দুনিয়ার জীবনেও তোমাদের বন্ধু ছিলাম, আর আখিরাতেও তোমাদের বন্ধু থাকবো। সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে তা-ই তোমাদের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর যা তোমরা চাইবে তা-ই পাবে। পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য থাকবে মেহমানদারী।’ (হা-মীম সাজদাহ: ৩২) হে আল্লাহ! আমাদের সকল বিষয়ের পরিসমাপ্তিকে সুন্দর করে দাও। আমাদেরকে দুনিয়ার অপমান ও আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করো, যারা তোমার সাথে সাক্ষাতে সন্তুষ্ট। আমাদেরকে তোমার দল ও বন্ধুদের মধ্যে শামিল করো। হে আল্লাহ! মৃত্যুকালীন যন্ত্রণায় আমাদের সাহায্য করো। হে আল্লাহ! আমাদেরকে এ অবস্থায় মৃত্যু দাও যে, তুমি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! হে বন্ধুগণ! হে জীবিতগণ! কবরবাসীগণ যা পারে না, তা আপনারা পারেন। হিসাবের দিনের আগে সুস্থতা ও অবসরকে গুরুত্ব দিন। আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন মূল্যবান। আগামী মুহূর্তগুলোতে যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাঁর অতীতের অপরাধ ক্ষমা করে দিবেন।

যে তার সুস্থতা ও অবসরকে আল্লাহর ইবাদাতে কাজে লাগাবে, সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। মনে রাখতে হবে, অবসরের পর ব্যস্ততা আসবে। সুস্থতার পর অসুস্থতা আসবে। আমি যা বললাম, আপনারা তা শুনলেন। আমি আমার, আপনাদের ও সকল মুসলিমের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আপনারাও আপনাদের অপরাধের জন্য ক্ষমা চান। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল। হে মুসলিমগণ! উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ কথা অনুধাবন করা যে কর্মের বিবেচনা হয় তার শেষটা দিয়ে।

সৌভাগ্যবান তো সে, যে অন্যকে দেখে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে। মনে রাখতে হবে, সকল উপভোগ্য বিষয়ের সমাপ্তি ঘটায় মৃত্যু। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি চিন্তা করে দেখেছো কি, যদি আমি তাদের অনেক দিন ধরে পার্থিব ভোগ-বিলাস করতেও দিই, তার পর যে আযাব সম্পর্কে তাদের ওয়াদা করা হয়েছিল তা যদি সত্যি তাদের কাছে এসে পড়ে, তাহলে যে ক্সবষয়িক বিলাস তারা ভোগ করেছিল, তা সব কি কোনো কাজে লাগবে?’ (আশ-শুয়ারা: ২০৫-২০৭) উপদেশ গ্রহণের আরেকটি বিষয় হলো একজন ব্যক্তিকে ভাবতে হবে যে, জীবনের দিনগুলো হলো গচ্ছিত সম্পদ।

এর থেকে যা চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহি.) বলেছেন, যে জীবনে আল্লাহ, তাঁর স্মরণ, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর আনুগত্যে ব্যস্ত থাকবে, সে এর প্রতিদান অতি সঙ্কটময় মুহূর্তে পাবে। আর সে সময়টি হলো রূহ বের হওয়ার সময়। আর যে জীবনে এসব বাদ দিয়ে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, মৃত্যুর সময় আল্লাহকে স্মরণ করা তার জন্য কঠিন হবে। আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যের ওপর তারাই প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে যারা সত্যবাদী, ক্সধর্য্যশীল। মৃত্যুকালে তাদের অন্তর হবে না। শয়তান তাদের কাছে ঘেঁষতে পারবে না।

অনুবাদ: অধ্যাপক আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ
শাইখ সালিহ বিন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ
ঈমাম
মসজিদে হারাম
মক্কা মুকাররামা

 


ঢাকা, ০৩ মার্চ (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।