''কৃত্রিমতা পরিহার, প্রকৃত অবস্থায় সন্তুষ্টি''


Published: 2019-05-03 19:33:35 BdST, Updated: 2019-09-17 17:08:36 BdST

শাইখ ড. সউদ বিন ইবরাহীম আল শুরাইম, খতিব, মসজিদুল হারামঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর, যার প্রশংসা করে শেষ করা যায় না। তিনি আদেশ করেছেন তাঁকে মেনে চলতে। নিষেধ করেছেন তাঁর অবাধ্য হতে। সকল অবস্থায়ই তাঁর প্রশংসা। সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কিতাব, সর্বোত্তম পথ-নির্দেশনা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ-নির্দেশনা।

নিকৃষ্টতম বিষয় হলো দীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়। দীনের মধ্যে উদ্ভাবিত প্রতিটি বিষয়ই বিদ‘আত, প্রতিটি বিদ‘আতই ভ্রান্ত। আমাদের দায়িত্ব হলো প্রকাশ্যে, গোপনে, সন্তোষজনক অবস্থায়, ক্রোধের অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা। হে জ্ঞান ও বোধসম্পন্ন লোকজন, আল্লাহকে ভয় করে চলুন। আশা করা যায়, আপনারা সফল হবেন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! এমন ব্যক্তিই তো সফল যার মধ্যে আত্ম-সন্তোষ ও পরিতৃপ্তি রয়েছে। যে মানুষের সামনে নিজকে তুলে ধরে তার প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী। যার মধ্যে কোনো ধরনের কৃত্রিমতা নেই। যার মধ্যে বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রকাশ নেই। মানুষ তাকে মূল্যায়নের আগে নিজের অবস্থা নিজে জানে। যার মধ্যে রয়েছে সহজ-সরল অকৃত্রিম চাল-চলন। তার কাছে যা নেই, তা থাকার প্রবণতা দেখায় না।

যা আছে তা আবার আড়াল করে রাখে না। সে এমন নয় যে, অভাব আছে কিন্তু ভাব দেখায় সে ধনী। কৃত্রিমতা হলো বাস্তবতার বিপরীত ভাব দেখানো। অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের প্রকাশ। যে ব্যক্তি তার বাস্তব অবস্থায় তৃপ্ত নয়, পৃথিবীর সবকিছু তার হস্তগত হলেও তার মধ্যে আত্মতৃপ্তি আসবে না। ইমাম ইবনুল মুনযির (রাহি.) বলেন, কৃত্রিমতার ধরন তিনটি। কোনো ব্যক্তির তার উপরের মর্যাদায় অবস্থানকারী ব্যক্তিকে তার অবস্থান থেকে নিচে নামানোর চেষ্টা। তার কাছে যা নেই, তা দেয়ার ভাব দেখানো।

যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়েও কথা বলা। হে আল্লাহর বান্দাগণ! কৃত্রিমতা হলো স্বাভাবিকতার পরিপন্থী একটি স্বভাব। অহেতুক কোনো কষ্টকর বিষয় অর্জনের চেষ্টা। আয়ত্তে নেই এমন বিষয় পাওয়ার আকাক্সক্ষা। এটি সুস্পষ্টভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও শিষ্টাচার বিরোধী। মধ্যমপন্থী দর্শন-বিরোধী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সর্বোত্তম বান্দা। তিনি সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন,
সবচেয়ে দানশীল। তিনি কখনো তার কর্ম ও আচরণে কৃত্রিমতার আশ্রয় নেননি। তার রব তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি বলো, আমি এ কাজের জন্য তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক দাবি করি না, আমি লে․কিকতাকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই। (সোয়াদ: ৮৬)
২ তিনি তো প্রেরিত হয়েছেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসাবে।

তিনি মানুষের কাছে আল্লাহর বার্তা যথাযথ পেঁ․ছিয়ে দিয়েছেন। সাধ্যের বাইরে কারো ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি। সামর্থ্যের বাইরে কাউকে কষ্ট দেননি। বরং তিনি ছিলেন তাদের জন্য রাহমাত ও কল্যাণ স্বরূপ। তিনি তাদের জন্য হালাল ও ক্সবধ করেছিলেন যা তাদের জন্য উত্তম। আর হারাম ও অ‣বধ করেছেন যা মন্দ। তাদের ওপর থেকে ভারী বোঝা সরিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে করেছেন শৃঙ্খলমুক্ত।

কৃত্রিমতা যে কোনো বিষয়কে নিন্দিত করে। আর কৃত্রিমতামুক্ত বিষয় হয় প্রশংসিত। যে কৃত্রিমতা ও লে․কিকতাহীন জীবন যাপন করে, তার জীবন হয় সুন্দর ও সাবলীল। সে থাকে অল্পেতুষ্ট। আল্লাহর ফয়সালায় থাকে সন্তুষ্ট। কৃত্রিমতা ও লে․কিকতায় লাভ কী? এতে না মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, না বয়স বাড়ে। বরং কখনো এটি অপচয় ও ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিপরীতে অল্পেতুষ্টি মানুষকে পরিতৃপ্ত রাখে। বিনয়ী বানায়।

নিজ রবের প্রতি বিনয় এবং আত্মবিশ্বাস ও নির্ভরতা মানুষকে মর্যাদা সম্পন্ন করে তোলে। সে
কৃত্রিমতার খোলস থেকে মুক্ত থাকে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! সহজ-সরল কৃত্রিমতামুক্ত জীবন সামাজিক জীবনের স্থিতিশীলতার একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে, সমাজে এমন কিছু লোক আছে যারা এতো বেশি লে․কিকতার আশ্রয় নেয় যা বিবেক ও যুক্তিগ্রাহ্য নয়। এটি কখনো করে লোকলজ্জার ভয়ে, কখনো দম্ভ অহংকার প্রকাশার্থে, আবার কখনো অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।

এলে․কিকতার ক্ষেত্র হয় কখনো দান-অনুদানে, কখনো আনন্দ-উৎসবে, এমনকি কখনো দুঃখ ও কষ্টে। এ ধরনের অভ্যাস কতো লোককেই না ঋণের জালে জড়িয়ে দেয়, অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়, পারিবারিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। সন্তান-সম্পদের বরকত নষ্ট করে দেয়। কাছের লোককে দূরে ঠেলে দেয়। সম্মানিত ব্যক্তিকে অসম্মান ও অপমানের শিকার হতে হয়।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলাম দানশীলতায় উৎসাহ দিয়েছে, তবে এক্ষেত্রে লে․কিকতাকে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম সে․ন্দর্য চর্চা পছন্দ করে, তবে এক্ষেত্রে কৃত্রিমতাকে অপছন্দ করে। একজন সচেতন মুসলিম কখনো কৃত্রিমতার আশ্রয় নিতে পারে না।

কেননা কৃত্রিমতা ও লে․কিকতা নিজের কাছে যা আছে তা নিয়ে তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট থাকার বিরোধী স্বভাব। আত্মতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি মানুষের মর্যাদা ও সম্মান দেয়। কতোই না উত্তম কথা বলা হয়েছে আত্মতৃপ্তি অবলম্বন করো, তাহলে রাজার মতো জীবন চালাতে পারবে।
মূলকথা হলো, সহজ ও সাবলীল জীবন যাপন হলো কৃত্রিমতা আর অবহেলার মাঝামাঝি অবস্থান।

যারা কৃত্রিমতার আশ্রয় নেয়, তারা তো মুখোশধারীর মতো। মুখে সবসময় মুখোশ রাখা যায় না। একসময় তা মুখ থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়। তখন আসল চেহারা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। কৃত্রিমতার চেয়ে আসল অবস্থা বেশি টেকসই। যে কৃত্রিমতার আশ্রয় নেয়, সে তো নিজেই নিজের ওপর আস্থাশীল নয়। অন্যরা তার ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? কৃত্রিমতার আশ্রয় এমন লোকই নেয় যে হীনমন্যতায় ভোগে। নিজের প্রকৃত অবস্থা অন্যদের সামনে প্রকাশিত হওয়াকে ভয় করে।

৩ অভ্যাসে, আচরণে, চলাফেরায় যদি লে․কিকতা ও কৃত্রিমতা দোষণীয় ও নিন্দনীয় হয়, তাহলে ইবাদাতের ক্ষেত্রে এটি আরো বেশি নিন্দনীয়। এক ব্যক্তি এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো, শরী‘আতের বিধি-বিধানের ব্যাপকতা বেড়ে গিয়েছে, আমাকে সংক্ষেপে করার মতো বিষয়ে নির্দেশনা দিন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর যিক্র বা স্ম
রণে সর্বদা জিহবাকে সিক্ত রাখো।’ (তিরমিযী)

লক্ষ্য করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে তার জন্য উপযোগী, তার পক্ষে পালনকরা সম্ভব বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তার পক্ষে পালন করা কষ্টকর এমন কিছু করার জন্য তাকে বলেননি। আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আল-আস (রা. আনহুমা) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেউ জানালো যে, আমি বলেছি যে, যতদিন বেঁচে থাকি আমি দিনে রোযা রাখবো, আর রাত জেগে সালাত আদায় করবো।

তিনি আমাকে ডেকে বললেন, তুমি এমনটি বলেছো? আমি বললাম, হ্যাঁ, বলেছি। তিনি বললেন, এমনটি তুমি করতে সক্ষম হবে না। রোযা রাখবে, আবার রাখবে না। রাতে ঘুমাবে, সালাতও পড়বে। মাসে তিনটি রোযা রাখবে। কল্যাণ দশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তিন দিন রোযা মানে পুরো মাস রোযা রাখা। আমি বললাম, আমি তো এর চেয়ে বেশি পারবো।

বললেন, তাহলে দু’দিন রোযা রাখবে, আবার দু’দিন রাখবে না। আমি বললাম, আমি তার
চেয়ে বেশি পারবো। তিনি বললেন, তাহলে একদিন পর একদিন রোযা রাখো। এটি আল্লাহর নবী দাউদ (আ.)-এর রোযা, এটিই ভারসাম্যপূর্ণ রোযা রাখার পদ্ধতি। আমি বললাম, আমি তো তার চেয়েও ভালোটা করতে চাই। তিনি বললেন, এর চেয়ে ভাল ও উত্তম কিছু নেই। বয়োবৃদ্ধ হওয়ার পর আবদুল্লাহ (রা.) বলতেন, কতোই না ভালো হতো আমি যদি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা মতো মাসে তিন দিনের রোযার প্রস্তাব গ্রহণ করতাম! (সহীহ মুসলিম)

আল্লাহ যথার্থ বলেছেন, ‘আল্লাহ চান তোমাদের বোঝা লাঘব করতে। মানুষকে তো সৃষ্টি করা
হয়েছে দুর্বল করে।’ (নিসা: ২৮) আমি আমার কথাগুলো বললাম। আমি আমার নিজের ও আপনাদের সকল অপরাধ ও বিচ্যুতি থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আপনারাও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান ও তাওবা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। জেনে নিন যে, সবচেয়ে জঘন্য ও নিকৃষ্ট কৃত্রিমতা হলো আকীদা বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ে কৃত্রিমতা, যা মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে সরিয়ে দেয়। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত সত্য আকীদা থেকে নাস্তিকতার দিকে নিয়ে যায়। কখনো ঠেলে দেয় দীনের মধ্যে অতি বাড়াবাড়ির দিকে, যার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ধ্বংস হোক ওইসব লোকরা, যারা দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করে। (মুসলিম) এখানে দুটি ভয়াবহ বিষয় ফুটে উঠেছে। একটি হলো অভিশাপ আর অপরটি হলো ধ্বংসাত্মক পরিণতি।

৪ দীনের মধ্যে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির নিকৃষ্টতম বিষয় হলো অন্যকে কাফির বলা, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তায় আঘাত হানাকে ক্সবধ মনে করা। আর এটি হলো মানুষের মে․লিক পাঁচটি প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। সকল ধর্মবিশ্বাসই এই পাঁচটি প্রয়োজন সংরক্ষণে ঐকমত্য পোষণ করে। দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি এক শ্রেণীর লোককে এমন চরম পর্যায়ে পেঁ․ছায় যে, তারা বিপরীত মতের লোকদের কাফির বলে, আর এ কারণে নিরপরাধ লোকদের রক্তপাতকে ক্সবধ মনে করে।

আর এভাবে তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করে। অথচ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না। এদেরকে ছোট-বড় সবাই ঘৃণা করে। হেদায়াত প্রাপ্তির পর পথভ্রষ্টতা থেকে আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই। আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.আনহুমা) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মাতের মধ্য থেকে এমন একটি সম্প্রদায় বের হবে, তারা মন্দ আমল করবে; তারা কুরআন পড়বে তবে তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তাদের আমলের তুলনায় তোমরা নিজেদের আমলকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা মুসলিমদের হত্যা করবে।

এমন সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটলে তোমরা তাদের হত্যা করবে। সুসংবাদ তাদের জন্য যারা তাদেরকে হত্যা করবে। সুসংবাদ তাদের জন্য যারা তাদেরকে হত্যা করবে।’
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাগুলো বিশবার বা তার চেয়েও বেশি বলেছেন।
(মুসনাদে আহমাদ)

অনুবাদ: অধ্যাপক আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ

ঢাকা, ০৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।