''যে বই হৃদয়ে স্পন্দন সৃস্টি করে''


Published: 2019-05-07 21:00:47 BdST, Updated: 2019-11-15 00:44:37 BdST
 
যা মানুষকে তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় স্পস্ট করে। হৃদয়ে সৃস্টি করে একটা অনুভূতি। একটি কম্পন। স্পন্দন। আর সেটাই হলো তার ধর্মীয় বিশ্বাস। যা সব কিছুকে মাড়িয়ে তার পরিচয়কে আলাদা করে দেয়। ফুটিয়ে তুলে বেহেস্তি আভা। জান্নাতী ছোঁয়া। আর এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক সচিব ও ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ্ আব্দুল হান্নান নতুন এক চিন্তার ফসল জন্ম দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন "আধুনিক সেকুলার মতবাদ ও ইসলাম" নামের একটি বই। বাংলাভাষা ভাষীদের সুবিধার্থে আমরা এই বইটির ব্যাপারে একটি রিভিউ তুলে ধরেছি মাত্র।

শাহ্ আব্দুল হান্নানঃ পাশ্চাত্য সভ্যতার গর্ভ থেকে চারটি অত্যন্ত ক্ষতিকর মতবাদের জন্ম হয়েছে- ফ্যাসিজম, কমিউনিজম, ক্যাপিটালিজম ও সেকুলারিজম। এখানে শুধু সেকুলারিজম সম্পর্কে আলোকপাত করছি।

সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সম্পর্কে দ্বিধা আছে, যা মূলত ধর্মহীনতা। এর ক্রমবিকাশ এবং স্বরূপ নিম্নে তুলে ধরা হলো।আঠারো শতকে পাশ্চাত্যে ‘মুক্তবুদ্ধি’র আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং এর প্রভাবে আধুনিক সেকুলার মতবাদ পাশ্চাত্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শিক্ষা থেকে ধর্ম আলাদা করা হলো। এভাবে যে স্কুলব্যবস্থা গড়ে উঠল, তাতে মানুষ নিতান্ত স্বার্থপর হয়ে গড়ে উঠতে থাকে। তারা ভোগবাদী হয়ে পড়ে। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে গেল। যে ধর্মের দ্বারা কোনো কাজ হয় না, তার প্রতি শ্রদ্ধাও কমে গেল।

নীতিবোধের যে শ্রেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য, তাও লোপ পেল। নীতিহীনতা ও স্বার্থপরতা নিয়ে মানুষ গড়ে উঠল। ওই স্কুলে জেনারেলরা গড়ে উঠলেন, পলিটিশিয়ান ও চিন্তাবিদেরা তৈরি হলেন। তাদের মনের গভীরে এই মনোভাব স্থায়ী হলো যে, সমাজের জন্য ধর্মের কোনো প্রয়োজন নেই; চাই সেটা পার্লামেন্ট, মার্কেট, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংক যা-ই হোক না কেন। এই যে এক ধরনের ব্যক্তিগত মনমানসিকতা গড়ে ওঠে, এর ভিত্তিতে তাদের সামাজিক আচরণও তৈরি হলো।

এর ফলে সব ক্ষেত্রে তার প্রভাব কার্যকর হলো। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সোস্যাল ডারউইনিজম প্রবেশ করে। অর্থাৎ Survival of the Fittest-কে মূলমন্ত্র করে নেয়া হলো। অর্থাৎ কেবল ‘যোগ্যতম’ই টিকে থাকবে। এর মানে, যারা যোগ্যতম নয় তারা ধ্বংস হোক, এতে কিছু আসে-যায় না। মনোভাবটা এমন, প্রাকৃতিক ক্রিয়াকে আমরা বাধা দেবো কেন?

‘কোনো জাতি যদি এ উপমহাদেশের লোক কিংবা আফ্রিকা বা চীনের লোক হয়ে প্রতিযোগিতায় যোগ্যতম প্রমাণিত না হয় বা টিকতে না পারে, তবে তারা হেরে যাবে। এখানে কোনো নীতিবোধ ও দয়ামায়ার প্রয়োজন নেই। এটাই বরং যুক্তিযুক্ত যে, যোগ্যতমকে আমরা এগিয়ে দিলাম।’ এটাই ছিল সোস্যাল ডারউইনিজম, যা ছিল খ্রিষ্টান ধর্মের বিরোধী, ইসলামের পরিপন্থী।

কিন্তু পুঁজিবাদ যখন সেকুলারিজমের (যার প্রকৃত অর্থ রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্ম বর্জনবাদ) সঙ্গী হলো, তখন ইউরোপে শ্রমিককে এমনভাবে শোষণ করা হলো যে, তাদের শুধু বেঁচে থাকার অবস্থায় রেখে দেয়া হয়; তাও শুধু উৎপাদনের স্বার্থে। পরে এর প্রতিক্রিয়াতেই কমিউনিজমের জন্ম হলো, সমাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধির মতবাদ বা সেকুলারিজম আরোপের ফল হলো, অর্থনীতিতে অমানবিকতা ও নীতিহীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

আরো বলা হলো- ‘এটা হচ্ছে পজিটিভ সায়েন্স। অর্থনীতি একটি অবিমিশ্র বিজ্ঞান, এর মধ্যে নীতিবোধ থাকবে না, নীতি থাকবে না। যেমন- বাতাস বা পানির জন্য আমরা কোনো নীতি দেই না, তেমনি অর্থনীতিরও কোনো নীতি থাকবে না। এটা নিজের গতিতে চলবে।’ 
এগুলোর পরিণাম অর্থনৈতিক সঙ্কট। এটা হয়েছে অতি লোভ এবং অতি লোভের আকাক্সক্ষা থেকে। রিবা (সুদ) এটাকে সাহায্য করেছে। সুদ না থাকলে এটা কখনোই হতো না।

একই সাথে, সেকুলার শিক্ষায় শিক্ষিত সন্তানেরা দুনিয়া বিজয়ে বের হয়ে গেল। ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডস প্রায় সমগ্র দুনিয়া দখল করে নেয়। দুই আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আফ্রিকার প্রায় ১০০ শতাংশ এবং এশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয়া হলো। তা করতে গিয়ে এরা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলো এবং ওইসব দেশের স্থানীয়দের সাথে পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘মুক্তবুদ্ধি’র অনুসারীরা সমগ্র দুনিয়া জয় করেছিল। তাদের নীতিহীনতা এই বিজয় এনে দিলো। কেননা, কোনো নীতিবাদী সমাজ এভাবে পররাজ্য আক্রমণ করতে পারে না; দখল করতে পারে না। তারা লুট করেছে বিশ্বকে। আফ্রিকার মতো একটি সমৃদ্ধ মহাদেশকে বিরান করে ফেলে। লোহাসহ নানা ধরনের খনিজ সম্পদ, স্বর্ণ, হীরা- সবই তারা লুট করে নিয়ে যায়। দক্ষিণ আমেরিকাকে স্পেনীয়রা লুট করল। ব্রিটিশরা আমাদের সমৃদ্ধ বাংলাকে লুট করল, যেমন আফ্রিকাকে করা হয়েছে। লুটতরাজ ছিল এদের আসল কাজ।

স্রষ্টাকে যারা কোনো স্থান দিতে রাজি নয়, তারা পরিবার ও জেন্ডার ইস্যুতে পশুর মতো হয়ে গেল। তারা মনে করেছে, ‘পরিবারের গুরুত্ব নেই এবং এটি হলো নারীদের দাবিয়ে রাখা একটি প্রতিষ্ঠান, তাদের দাস বানানোর জন্য।’ তারা বরং পশুর মতো থাকাই ভালো মনে করল। পরিবার গঠন করার নাকি প্রয়োজন নেই। যদি কেউ পরিবার গঠন করেও, তবে এটা হবে নিছক সন্তান জন্মদানের জন্য। অর্থাৎ তারা পশুর মতোই হবে। এমনও হতে পারে, একটা কমিউন হবে, সেই কমিউনে ১০০ পুরুষ ও ১০০ নারী থাকবে। কোনটি কার শিশু, কেউ জানবে না। সবাই মিলে শিশুদের পালন করবে। তারা এমন একটা ধারণাও নিয়ে এলো যে, তত দিন পর্যন্ত একটা পশু তার বাচ্চা লালন করে থাকে, যত দিন সে নিজের খাবার নিজে খেতে না পারে।

তত দিন পর্যন্ত বাঘও পালে; কুকুরও পালন করে যত দিন বাচ্চা নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে। মানুষকেও তাই করতে হবে। অর্থাৎ, মনোভাব এমন- ‘কেন ৩০ বছর পর্যন্ত খাটব? কেন ত্যাগ স্বীকার করব? সন্তান জন্ম নিয়েছে এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সে বড় হয়েছে। সে নিজেই নিজের কাজ করে বেড়াক। ওর ব্যাপারে আমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই। আমার স্বার্থ কেন ত্যাগ করব? আমি কেন আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাদ দেবো?’ সুতরাং পরিবারব্যবস্থার যে বর্তমান দুর্দশা, সেটা অনেকটা সেকুলার মতাদর্শের পরিণামেই।

এর সমাধান কী? আমাদের জানা মতে, দুইভাবে এর সমাধান হতে পারে। একটা হলো, মুসলিম হিসেবে আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে, তাঁর নির্দেশনার দিকে যাই বা নিজেদের সোপর্দ করি। তাঁকেই সব সময় অবলম্বন করতে হবে। তাঁর ওপর আস্থা রেখেই জীবনযাপন করতে হবে। তাঁর কাছে আমরা সব দিক দিয়েই আবদ্ধ ও দায়বদ্ধ। তাঁকে বাদ দেয়া চলবে না কিছুতেই। এটি হলো মুসলিম হিসেবে আমাদের বক্তব্য। হিন্দু হিসেবে যদি কেউ বলেন, তাহলে বলতে হবে স্রষ্টার দিকে যাওয়া, নৈতিকতার দিকে যাওয়া, ধর্মের দিকে ফিরে যাওয়া। তাই সমাধান হিসেবে বলছি, যেভাবেই হোক, মানুষকে নৈতিক শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নৈতিক শিক্ষার জন্য ধর্ম ছাড়া আর কোনো ভিত্তি নেই।

মুসলিম দেশে ইসলামকে ভিত্তি করতে হবে এবং অমুসলিমদের জন্য বিকল্প থাকবে। অমুসলিমদের দেশে তাদের ধর্মকে কেন্দ্র করে, তাদের নৈতিকতার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সেখানে মুসলিমদের জন্য বিকল্প থাকবে বলেই আশা করি। এভাবে যদি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তবে আশা করা যায়, ভালো মানুষ তৈরি হওয়া শুরু হবে। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবার- সব ক্ষেত্রেই ভালো লোক তৈরি হবে। ভালো লোক তৈরি হলে সব ক্ষেত্রে ভালো ফল আসবে। কেবল থিওরি দিলে কিছুই হবে না; মানবতা পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ তো শুরু করতে হবেই। সেখানে ‘অসম্ভব’ বলে কিছু নেই।

সার্বিকভাবে মানবজাতি ছিল মূলত ধার্মিক, সেটাকে সেকুলাররা সেকুলারমনা করে দিয়েছে। মানুষকে আবার ধার্মিকমনা করতে হবে; ইসলামমনা করতে হবে। ধার্মিক মন ও সেকুলার মনের পার্থক্য কী? ইসলামী মন হচ্ছে সেই মন- কোনো সমস্যা হলে যা এর সমাধান খোঁজে কুরআন ও সুন্নাহতে।

তারপর অন্য দিকে। অপর দিকে, সেকুলার মন চিন্তা করে না আল্লাহর কিতাবে কী আছে? সে ভাবে, আমাদের ‘যুক্তিবাদী’ পণ্ডিতেরা কী বলেছেন, রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা কী বলেছেন, কিংবা রাশিয়া, চীন, আমেরিকা, কানাডা কী করেছে। তারা দুনিয়াকে ধার্মিক মন থেকে সেকুলার মনের দিকে নিয়ে গেছে। তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, সমগ্র দুনিয়াকে একটি নৈতিক ছকে নিয়ে আসা; ধার্মিক মন ফিরিয়ে আনা। 

লেখক : সাবেক সচিব

ঢাকা, ০৭ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।