ক্যাম্পাসে প্রথম দেখায় প্রেম


Published: 2019-02-15 12:29:31 BdST, Updated: 2019-11-13 03:31:53 BdST

শুভেন্দু বসে আছে লাল চেয়ারে। পয়লা বসন্ত তাই পাশের চেয়ারটাও খালি থাকার কথা নয়, নেইও। চেয়ারটাও লাল, সেই লাল চেয়ারের উপর লাল শাড়ি পড়ে বসে আছে তাহি। শুভেন্দুর একাধিকবার বারণ সত্যেও তাহি বেলীফুলের সুবাস ছড়ানো মাথাটি তার কাঁধে রেখে পরম অজানা এক তৃপ্তি নিয়ে চোখ মেলে অস্ফুট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
শুভেন্দু বিরক্ত হচ্ছে না কারণ, মেয়েটা এমনিতেই একটু আলতো স্বভাবের। ও যদি বিরক্তি প্রকাশ করে তবে মেয়েটি এখনই উঠে যাবে, দাঁড়িয়ে ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকবে অনন্য এক অভিমানী দৃষ্টি দিয়ে, তারপর? যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে হাঁটা শুরু করবে, পিছনে ফিরে একবারও তাকিয়ে দেখবে না কেউ তার রাগ ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে উঠল বা বসেই রইল কি না। এমনই তো করে সবসময়। ছোটবেলায় বইমেলায় গিয়ে বাবা একটা বই কিনে না দেয়ায় শুভেন্দু এমনই করেছিল একবার।

তাহির সাথে শুভেন্দুর পরিচয় রবীন্দ্র সরোবরে কোনো ২১শে ফেব্রুয়ারির বিকেলে। সরোবরে নোটিশ ছাড়াই গিয়েছিল শুভেন্দু তার বন্ধুদের ফোনে। সেখানে গিয়ে বেগুনী শাড়ির এক ললনা তার পাশ থেকে যখন যাচ্ছিল তখন কেন যেন সে তার দিকে দ্বিতীয়বারের মত পিছন ফিরে তাকিয়েছিল, সেই প্রথমবার দুজনের চোখে চোখ পড়ে যায়। শুভেন্দু জানে না কেন সে তাহির পিছু নিয়েছিল সেই বিকেলের উপচে পড়া ভিড় ঠেলে। তবে সে শেষ পর্যন্ত বেগুনী শাড়ির আঁচল আর দেখতে পায়নি। সন্ধ্যার টিমটিমে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়েছিল সেদিন। আর মন বসেনি আড্ডায়। দেখা হওয়াটা এভাবেই হাজারো দেখা-অদেখার ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারত, কিন্তু তা যায়নি। সেবারই ২৬শে মার্চে আরও একবার কাকতালীয়ভাবে সরোবরের ব্রিজেই তাদের দেখা হয়ে যায়, এবারও চোখে চোখ পড়ে যায় তাদের। শুভেন্দু আর সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়নি। তাহিকে একা পেয়ে সে তার কাছে গিয়ে প্রথম যে বাক্যটা তাকে বলেছিল তা হল, "আবার তাহলে চোখে চোখ পড়েই গেল?"

তাহি আচমকা এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও ছলে বলে একদম এড়িয়েও যায়নি। সে বলেছিল, "চোখ যখন আছে আগ্রহে, তখন চোখ তো সেখানেই পড়বে যেখানে পড়া উচিত।" শুভেন্দু তার উত্তর পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়েছিল। মেয়েটা তাকিয়ে ছিল তার মুখের দিকে। তখন তাহির পুলকিত মুখটি বিকেলের আঁচহীন সোনালী রোদ পড়ে কেমন লাগছিল তা শুভেন্দু দেখেনি তবে অনুভব করেছিল বাঙালি ললনার মুখে বৈকালী রোদ কেমন মানায়। কল্পনায় সে সেদিনের যে মুখটি দেখে তাতে সে একবার নয় বারবার তাহির প্রেমে পড়ে। এভাবেই প্রেমের শুরু...

এরপর কেটে গেছে কয়েক বসন্ত। বসন্ত আসে, বসন্ত যায় তবু তারা সেই প্রথম দিনের সাজেই প্রতি বসন্তে সরোবরের একই জায়গাতে এসে বসে। শুভেন্দু প্রতি বসন্তে একটাই নীল পাঞ্জাবী পড়ে যা তাহি তাকে গত তিন বসন্ত আগে দিয়েছিল। পাঞ্জাবীটা ততটা দামী নয়, তবু সে খুব যত্ন করে সেটা ব্যবহার করছে এই তিনটি বছর। তাহির ব্যপারটা একটু আলাদা। সে প্রতি বসন্তে বান্ধবী সমেত নতুন নতুন শাড়ি কিনবে যদিও প্রতিবারই তার শাড়িতে বেগুনী একটা অংশ থাকবেই। এর কারণটা খুবই সাধারণ। শুভেন্দু আজ পর্যন্ত একটা টিউশনিও টিকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিবারই ১২-১৫ দিন পর পর টিউশনি বন্ধ করার জন্য গার্ডিয়ানরা নোটিশ জারি করে দেয়। কোনোরকম একমাস পড়িয়েই বিদায়। তাই শুভেন্দু কোনো বসন্তেই তাহিকে একটা শাড়ি উপহার দিতে পারেনি। এই নিয়ে তাহির অবশ্য কোনো মাথাব্যথা নেই, মেয়েটা যেন শুভেন্দুর কাছে অজস্র ভালবাসাই চায় যে ভালবাসায় সে সিক্ত হয়ে থাকতে পারবে জীবনের শেষ বিকেল পর্যন্ত। এই সাধারণ চাওয়াতেই তাহি খুব সন্তুষ্ট।

শুভেন্দুর বন্ধুরা তাহির সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। শুভেন্দুর কোনো প্রশ্ন না থাকলেও তার বন্ধুদের প্রশ্নের অন্ত নেই। তাহির সম্বন্ধে অনেক বন্ধু অনেক বাজে কথা বলে, ওসব সয়ে গেছে এ কয়েক বছরে। তাদের প্রধান সমস্যা তাহির পারিবারিক বন্ধন নিয়ে। তাহির বাবা ছোটবেলায় তার মায়ের সাথে বিবাহবিচ্ছেদ করে তার মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তাহির জন্ম হয় নানাবাড়িতে। তাহির বয়স যখন ৩ বছর মাত্র তখন তার মা নতুন জীবনসঙ্গী নিয়ে আবার সংসার শুরু করেন। তাহির সুদিন আর আসেনি। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটি একা। কয়েকবছর যেতেই একদিন তার মা তাকে নানার বাড়িতে রেখে আসেন। পরে শোনা যায় তিনি তার স্বামীর সাথে স্কটল্যান্ড প্রবাসী হয়েছেন। তাহিকে কোলেপিঠে মানুষ করার কেউ ছিল না। তাই যেন মেয়েটি খুব আলতো স্বভাবের। শুভেন্দুর কাছে তাহিকে বেশি ভাল লাগার কারণও মনে হয় এটি। যার কেউ নেই তার সে আছে ভাবতেই যেন আরও ভাল লাগে মেয়েটিকে। বন্ধুরা কিছু বললে বলে, "আমি অনেক ভালবাসি রে মেয়েটিকে।"

গত বছর এক আষাঢ়ের সন্ধ্যায় একটা ফোন এসেছিল শুভেন্দুর কাছে। তখন সে বিছানায় কাঁথা মুরি দিয়ে টিনের চালে বৃষ্টির অসাধারন ধ্বনি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কেউ একজন বলছিল তাহি রাস্তায় ম্যানহোলে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। অচেতন অবস্থায় তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুিরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য ভর্তি করতে একজন গার্ডিয়ান লাগবে।

শুভেন্দু সে অবস্থাতেই দৌঁড়ে বাসে উঠেছিল। তার মনে আছে সেদিন বৃষ্টির পানি জমেছিল মীরপুরের রাস্তায়। জ্যামে তার আড়াই ঘন্টা সময় লেগেছিল হাসপাতালে পৌঁছাতে। তবে তার জন্য অচেতন তাহিকে আর অপেক্ষা করতে হয়নি। তাহির মামা এসে তাকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। শুভেন্দু আর ভেতরে যেতে পারেনি। একটিবারের জন্যেও তার অচেতন প্রিয়তমাকে সে একপলক দেখতে পায়নি, জানতে পারেনি সে কেমন আছে। সেদিন সে বুঝেছিল মেয়েটিকে সে আসলে কতটা ভালবাসে। এ কেবল ভালোবাসাই ছিল না, ছিল অজস্র অনুভূতির এক অপরিমেয় সংগ্রহ। সে অনুভূতি ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না কেবল বিশেষ মুহূর্তে সংগ্রহের বিশালতা অনুভব করা যায়।

তাহি সেদিন তার ডান পা ভেঙেছিল কিন্তু সে জানে না শুভেন্দু হারিয়েছিল তার হৃদপিন্ডের কোনো এক অজানা ধারা। সে ধারার অক্ষমতা কেবলমাত্র তাহির দুঃখের দিনেই শুভেন্দু বুঝতে পারে। তখন কেমন করে যে সেই ধারা তার অক্ষমতাকে প্রকাশ করে তা শুভেন্দু ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই শুভেন্দু তাহিকে সবসময় আগলে রাখতে চায়। তার মনে হয় মেয়েটিকে সে তার বুকে জড়িয়ে রাখে যতক্ষণ না তার ধারায় শেষ আঘাতটি আসে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে চারপাশ জুড়ে।

আজ তাদের বিকেলটা সুন্দরভাবে কাটানোর কথা ছিল, কথা ছিল তাহিকে প্রতিবারের মত শীতের শেষের আইস্ক্রিমের উপোষটা ভেঙে দেবার। কিন্তু মনে হচ্ছে এসব কিছুই হবে না আজ। আজ শুধু দুজনে বসে থাকবে অপলক দৃষ্টিতে যেদিকে দুচোখ হারায়। শুভেন্দু কিছুই বলছে না তাহিকে, তাই তাহিও এই সুযোগে তার মাথা শুভেন্দুর কাঁধে রেখে দৃষ্টিহারার মত চেয়ে আছে অজানা কোনো বস্তুকে লক্ষ্য করে।

তাহি কিছু বলছে না, তার কি কিছু বলা উচিত? কেন যে তার মন থেকে কোনো কথাই আসছে না তা বুঝতে পারছে না। শুভেন্দুটা চলে যাবে, চলে যাবে যেখানে গেলে তার সাথে সামনের তিন চার বসন্ত আর এভাবে বসা হবে না সরোবরের ব্রিজে। সে কার কাঁধে এমন সুগন্ধ চুল ছড়িয়ে মাথা রাখবে? রাখা তো সম্ভবও নয়! তবু সে ভাবে, সবই যা তার একদিন ছিল তাকে একা করে চলে যায়। এটা শুরু হয়েছে তার জন্মের আগ থেকেই। তার জন্মই হয়েছে এমনভাবে প্রিয়মানুষদের চলে যাওয়া নীরবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে। আজ নাহয় আরও একটা প্রিয়জন চলে যাবে। এ আর এমন কি বিষয়! যে চলে যাবে যাক না।

শুভেন্দু আগামী সপ্তাহে বেলজিয়াম চলে যাচ্ছে। হুট করেই তার স্কলারশিপটা কনফার্ম হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারেনি এভাবে তার বন্ধনগুলো ছিঁড়ে যাবার ছিল। গতকাল নানা-নানীর কাছে গিয়েছিল বিদায় জানাতে। আজ সে কিভাবে তার প্রিয়তমাকে বিদায় দিয়ে একটু পরে রিক্সায় তুলে দেবে তা তার জানা নেই। সে শুধু মেয়েটির কথা ভাবছে। সে ভাবছে মেয়েটি এত বিদায় এ আলতো কোমল মনে কীভাবে দিয়ে এসেছে, আজ সে কী তাকে বিদায় দিয়ে বাসায় একা একা যেতে পারবে? সে কী হাসিমুখে বিদায় দিয়ে একটিবারের জন্যেও রিক্সার হুডের নিচে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে না? সে কেমন করে একা একা কান্না করবে! নাকি সে পক্ষাঘাতে অচেতন হবে মাঝ পথে! কি হবে তাহির যদি আমার অবর্তমানে কোনো অজানা পুরুষের হাতে তাকে তার পরিবার জোর করে তুলে দেয়, সে কি সুখী হবে তার সাথে? সে কি তার বেলীফুলের সুবাস ভরা চুল নিয়ে সেই পুরুষের কাঁধে নিশ্চিন্ত মনে চোখ বুজবে যেমন এখন পরম প্রশান্তিতে সে চোখ বুজে গেছে?

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। চারদিকের রঙগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। সরোবরের একপাশে কোনো এক নির্মাতা তার নির্মাণ জনসম্মুখে দেখানোর জন্যে বড় পর্দায় শেষ মুহূর্তের আলোকসম্পাত করতে ব্যস্ত। এত কিছুর পরেও তাহি-শুভেন্দু বসন্তের উদাস হাওয়ায় অপলক তাকিয়ে আছে যেদিকে দৃষ্টি হারায় সন্ধ্যার আবছা আলোতে।

লেখক : মাহমুদুল হাসান শুভ,
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//সিএস

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।