"মোজাল"


Published: 2020-05-06 13:07:46 BdST, Updated: 2020-08-14 11:10:26 BdST

আব্দুল হান্নান: লিখিরাম হঠাৎ করেই বলে উঠল,আরে তুমি! পুরো ক্লাসই নিস্তব্ধ হয়ে গেল তার আচমকা এক গাম্ভীর্য কথায়। কিছু না বুঝেই থেঁতো ভাষায় বলে উঠলাম ক,,,, ক,,,, ক,,,, কে,,,, কে,,,, কী হয়েছে। মনের এক কোন থেকেই আন্দাজ হচ্ছিল নিশ্চিত এলাকায় কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে। কে জানত ঘটনাটা এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আমার ছোটগল্প নামক এক পৃথিবী সৃষ্টি করবে। ক্লাসে তখন একটি পিঁপড়া হাটলেও তার শব্দ নিশ্চিন্তপুর পর্যন্ত চলে যেত।মাইক্রোফোনের ভো ভো শব্দ আর জানালার পাশের আমগাছটির মাঝডালে কাঠুরে পাখির নিখুঁত কাজ করার অস্পষ্ট শব্দটুকুও আসছিল।

ইতিহাস স্যারের হাজার বছর পূর্বের ঘটনা বর্ণনা করাটাও থেমে গিয়েছিল। যার বাচনভঙ্গির কারণে সবাই পেচুলে আর দূর্বার বলেই সম্বোধন করে থাকে। এরই মধ্যে লিখিরাম বলে উঠল ডংকোর মা মারা গিয়েছে। ডংকো বলতে সবাই চিনত না। কেবল হাফপ্যান্টওয়ালা কালের বন্ধুরাই চিনে। হবে আর আরকি ছয় অথবা সাত জনেই ডংকোকে চিনে। যার ক্লাস ফাঁকি কিংবা কোন অজুহাতের দোহাই মানত না,তার ক্লাস উপেক্ষা করে সোজা হোস্টেলের ৩০১৩ নাম্বার চলে আসলাম। কলেজের সকল নিয়ম শৃঙ্খল ভেঙ্গে বাড়ির পথে রওনা হলাম। কড়া রোদে অটোভ্যানে আমি সাথে মধ্যবয়সী ভূয়সী কালো চেহারার দামড়া দুজন লোক ছিল।

পৃথিবী টা শূণ্যপুরে অস্তমিত হচ্ছে। মগজে বেজে চলেছে ক্লাসের মাইক্রোফোনের ভো ভো শব্দ। অটো থেকে নেমে পঁচিশ মিনিট হাটার পথই আমার বাড়ি। এক কদম দু কদম তের কদমের মাথায়ই বড় শেওড়া গাছটির মগডাল থেকে চিলদের উড়াউড়ি। অরণ্যপুরী গ্রামটি মনে হয় পরিবর্তিত হয়েছে বিভীষিকাময় কালরূপে। মনে হয় জহির রায়হানের "ওলা" রোগ এসেছে গ্রামে। লাল মাটি আর পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ভয়ে গা শিউরে উঠত। আজ অস্থিরতায় আমি ঘেমে যাচ্ছি।

নীরবে নিস্তব্ধে কেঁদে যাওয়া আমার বক্ষটা আলাফ নামক ডংকো ছেলেটির ঝাপটানির ভাবটা বুঝতে পেরে ভেতরটা চঞ্চল হয়ে যায়। ডংকোই তো আলাফ। তার সাথে আমার নেংটো কালের বন্ধুত্ব। শার্ট ছেঁড়া, ঘুঘু ধরা নিয়ে প্রতিযোগীতা, গোল্লাছুটে তার কাছে বার বার হেরে যাওয়া,হাইস্কুলের বদনা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে মসজিদের ডাব চুরিটাও তার সাথেই করেছিলাম। কী কারণে যে আলাফের নাম ডংকো দিয়েছিলাম তা অজান্তেই। আলাফের বাবার বারো ভাতারির কারণে তার পড়াশুনাটা মাধ্যমিক পাশের আগেই নিশ্চিন্তপুরে চলে গিয়েছিল। আলাফের সাথে যখন শান্তির হাটে শাপলা বিক্রি করতে যেতাম তখন তার মায়ের গল্প গুলো শুনতাম। কে জানত কড়া রোদের রোদনে তার মায়ের শেষ কাজটা সম্পন্ন করতে হবে।

অন্তিমের অন্তিমদশাকালে আমি হাজির। সকলের আহাজারি তেমন শুনতে পেলাম না। নিস্তব্ধ পরিবেশে জানাযা সম্পন্ন। দোয়া শেষে সবাই চলে গেলেও ডংকোর পাশে সান্ত্বনা দিতে আমি হাজির। আমাকে দেখেই ডংকো বলে উঠল,যা হবার হয়েছে,আল্লাহর বান্দা আল্লাহ নিয়েছেন এতে আমাদের কারো কেন হাত নেই,ভেঙ্গে পড়িস না, চিন্তা করিস না আমরা তো আছি।এগুলোই তো বলবি? এর জন্যই তো এসেছিস? এই বলেই আমার বুকে মাথা ঠেকিয়ে ধুকুরে ধুকুরে কান্নার শুরু। এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কান্না। কিছু বললাম না। কাদুক কাদুক। চোখের সব জল শেষ হোক। তবুও যদি একটু হালকা হয়।

এক দুই ঠিক নয় দিন পর আমার হোস্টেলে ডংকোর প্রবেশ। প্রায় তেপ্পান্ন মিনিট চলে গেল কোন কথা না বলে। হঠাৎ করে বলল, কী করব রে? এক কথায় সব বুঝেই ফেললাম। পরামর্শ দেওয়ার মতো বুদ্ধি তখন কতটুকু হয়েছিল জানি না। তবুও বললাম তোরটা বাদ দে,মোজালকে ভালোভাবে পড়াশুনা করা। ডংকো কথায় সায় দিয়েই চলে গেল। তাকে পিছু ফেরার সাধ্য আমার ছিল না। ঠিক সাড়ে চার বছর পর মোজাল জেএসসিতে ঢাকা বোর্ডে প্রথম হয়। আমার মতোই কিছু নগণ্য মানুষের পরামর্শে ডংকো তাকে ঢাকায় নিয়ে যায় পড়াশোনা করাতে। ভালোভাবেই কাটছিল দিনগুলি।

নয় হাজার টাকার মায়নে পায় ডংকো। সারাদিন গার্মেন্টেসে খাটুনির পরও ছোট ভাই এর তদবির করতে বিন্দু পরিমানও ভুলে না। সপ্তাহে একদিন স্কুলের হেডমাস্টারের সাথে দেখা করে এক পক্কের হিসেব কষে নিতেও ভুলে না। সাধ্যের মধ্যে মোজালকে সখের তুলা করে রাখাটাই ডংকোর আনন্দ। বাবার সাথে সম্পর্ক তো চার বছর আগেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে যখন মোজালকে কোন ওয়ার্কশপে না দিয়ে ফুফুর বাসায় রেখে পড়তে দেওয়া হয়েছিল। বাবা তো দিব্যি ভালো আছেন নতুন বউয়ের সাথে পাওয়া দুই মেয়েকে নিয়ে। বিন্নি খই উড়ানোর গল্প গুলো না হয় শান্তির হাটের গল্পে নাই লিখলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে তখন আমি। ঈদুল আযহার ছুটিতে বাড়ি এসেছি। ডংকো আর মোজালও তাদের রোদনে আসতে ভুলে নি। সোমবারই তো ঈদ। গ্রামে চড়ে বসেছে হরেক রকমের কেনাকাটার ভীড়। প্রতিদিন বিকেলে গরুর হাটে যেতে ভুলি না।

কল্পনার সেই মোজাম

 

মসজিদের এক কোনায় বাদামী রঙ্গের গরুটার মাথায় হাত বুলাচ্ছিল মোজাল।আমাকে দেখেই বলল ভাই কেমন আছেন?অনেক দিন পর আপনার সাথে দেখা।খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক মতো করেন না। অনেকটা শুকিয়েছেন।তার বড় ভাই ডংকোর সাথে শান্তির হাটের গল্প দেখা হলেই হয়।তার সাথে তো আর তা করা যায় না।তার কথায় শুধু সায় দিয়ে বললাম আর স্বাস্থ্য,,,,,,,,! তোর কি অবস্থা। পড়াশোনা কেমন চলছে। হঠাৎ করেই চোখের কোণে জল। আদো আদো কণ্ঠে বলল। আলাফ ভাই এর কষ্ট টা আর সহ্য হয় না। আমি তার পিঠে চড় দিয়ে বললাম। আরে ব্যাটা ডংকোর কথা ছেড়ে দে।এমন বড়দের মতো কথা বলছিস কেন। এসব এখন ভাবিস না। পড়াশোনা করে বড় হয়ে নে। তখন না হয় বাঙ্গালকে বাঙ্গালী করিস। শুদ্র মামার দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনে দিয়ে সরু রাস্তাটায় মোজালকে বিদায় করে দিলাম। তারপর দিন শনিবার ডংকোর সাথে আড্ডা নিমতলায় বসে।

কিছুক্ষণ পাতার বাঁশি বাজালাম। শান্তির হাটের গল্প গুলোও হাসতে হাসতে বললাম। মোজাল সম্পর্কেও কম কথা হয় নি। স্কুলের ভালো রেজাল্ট, তেরো বার কোরআন খতম, টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে শহরের বুকে ভাসমান ছেলে মেয়েদের খাবার কিনে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। দিনক্ষণ ক্রমেই চলে যাচ্ছে ভাড়ি হচ্ছে কেবল নিশিন্তপুরের গল্পগুলো। পরদিন রবিবার,ইসলাম ভাই এর কাপড়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি সবাই। ভরদুপুর হতে চলেছে। এ দুপুর যেন কাল দুপুর। কোন এক মাঘের বাঘ যেন আসছে।আগ বেলায় মোজাল ও তার বন্ধু আবু বকর ধু ধু মাঠের শেষ প্রান্তে শেওড়া গাছটির নিচে বসে গল্প করছিল। দোকানের সামনে থেকে দূর দক্ষিণের মাঠের কোণায় তাদেরকে ঝাপসা দেখা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে অলিক বলে উঠল অনেক গরম আর অনেক রোদ চল পুকুরে যাই সবাই। আহ্! কারো এ প্রস্তাব থামানোর সাধ্য নেই।  

সবাই যেন এক পলকের হলকে শৈশবে হামাগুড়ি দিলাম। সকলের পুকুরের পথে হাটছি। শেওড়া গাছটির পরেই হরিশবাবুর নতুন পুকুর। গায়ের জামা খুলে লুঙ্গি কাছা দিয়ে উচ্ছসিত উৎকন্ঠা নিয়ে সবাই হিরিক জমাচ্ছি পানিতে। যে নামছে না তাকে কাঁদা দিয়ে ছুঁড়াছুঁড়ি।নামতে তো বাধ্যই। ভালো লাগা আর অবুঝ দিনের গল্প গুলো এখানেই সীমাহীন। ডুব প্রতিযোগীতার বাজিমাত চলছে। কে কতক্ষণ পানিতে ডুব দিয়ে থাকতে পারে। মোবাইলে স্টপ ওয়াচ চালু করা হচ্ছে। বিকেলে বাজিমাতের টাকা দিয়ে পিয়াজু খাওয়ার কথাটাও হচ্ছে। হঠাৎ করেই আবার এক পুরোনো আচমচা কণ্ঠে, এবার আমাকে নয় বন্ধু হরিশের ছেলে ডংকোকে বলছে, ডংকো কাকা! ডংকো কাকা! মোজাল কাকাকে এই মাত্রই পানিতে দেখেছিলাম এখন তো আর দেখছি না। কেউ জানে না মোজাল পানিতে নেমেছে।

আবু বকর জানে, হরিশের ছেলে জানে, আমি জানি। ডংকোও জানে বটে। আমরা একজন এক ঝলক দেখেছি। কেউ অতটা খেয়াল করে কথা বলেনি। আমরা সবাই বাজিমাতে ভারিক্কি ব্যস্ত ছিলাম। আবু বকর আমাকে বলছিল,ভাই তোমরা এসেছ? তাহলে আমি এক দৌড়ে লুঙ্গি পাল্টিয়ে সর্ট প্যান্ট পরে আসি। আমিও তোমাদের সাথে সাঁতার প্রতিযোগীতা দেব। তখনই মোজালকে দেখেছিলাম লুঙ্গি ফুলিয়ে পানিতে ভাসতে। কথা হয় নি একটুও। দু তিন মিনিট আগেই মোজালকে পানির উপড় ফানুশের মত উড়তে দেখেছি । এরই মধ্যে হরিশের ছেলের আহাজারি। কিছু বুঝে না বুঝেই পানির নিচে খোজাখুজির হিরিক। ডংকো তো সাঁতার জানে না।হাটু পানি থেকেই ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে বলছে।

মোজাল ভাই তুই কই, মোজাল ভাই তুই কই, মোজাল ভাই তুই কই, মোজাল ভাই তুই কই । বিশ্বাস কর হান্নান মোজাল সাঁতার জানে না। ততক্ষণে অলিক, হোসাইন, রুবেল আর আমাদের ইসলাম ভাই পুকুরের মাঝখানে পা দিয়ে দিয়ে খুঁজছে। কেউ কেউ উপর থেকে বাঁশ নিয়ে এসেছে মোজালকে তোলার জন্য। কয়েক বাড়ির মানুষের আহাজারি শুনছি। মস্তিষ্ক নিস্তেজ হয়ে আসছে । পানিতে আমি এক বরফ পিন্ড হয়ে যাচ্ছি। হয়ত সকলে ধরেই নিয়েছে মোজাল এখন নিশ্চিন্তপুরে ডাল-ভাত খাচ্ছে । আমিও এগোচ্ছি । এক পা দু পা করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাটিতে খুজছি । স্বচ্ছ পানি আমার মুখে যায় আর আসে। এখন তো পানিরই খেলা! মগজে তো একটি শব্দই চড়ে বসেছে মোজাল ভাই তুই কই, মোজাল ভাই তুই কই, মোজাল ভাই তুই কই,মোজাল ভাই তুই কই। বিশ্বাস কর হান্নান মোজাল সাঁতার জানে না।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা, ০৬ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।