“জিপিএ ৫ নয় আলোকিত মানুষ চাই’’


Published: 2020-09-27 02:55:34 BdST, Updated: 2020-11-01 06:40:42 BdST

মুহতাসিম আলম মারুফ: শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করা এবং মনুষ্যত্ববোধ অর্জন করা। বর্তমানে আমাদের তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু মানুষ শিক্ষাকে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের দ্বারা সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তার মধ্যে একটি হলো জিপিএ ৫। আমাদের দেশের অভিভাবকরা মনে করেন তার সন্তানকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে অন্যথায় সে দেশ ও দশের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সফলতা অর্জনের জন্য আসলে কি জিপিএ-৫ পাওয়া খুবই প্রয়োজন? আমি বলব না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে অধিকাংশ লোক জিপিএ-৫ না পেয়েও সফল হয়েছেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথাই বলা যাক, যিনি ছোটবেলা থেকে দুখুমিয়া হিসেবে পরিচিত ছিল। ছোটবেলা থেকে তার দুঃখের শেষ ছিল না?। পড়াশোনা তো দূরে থাক জীবিকার তাগিদে তিনি চায়ের দোকানে রুটি বানিয়েছেন। কারণ তিনি পডশোনা করার তে টাকা পয়সা ছিল না।

বিদ্যালয় কি জিনিস তিনি চোখে দেখেননি। কিন্তু তিনি আজ আমাদের মাঝে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। কারণ তিনি ব্যর্থ হয়ে থেমে থাকেনি। তিনি নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে কখনো গান কখনো কবিতা কখনো গল্প নিজের মতো করে নিজের ভাব প্রকাশ করেছেন, যা অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেও সে কাজটি করতে পারেনি।

শুধু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ খান এর কথাই বলা যাক, তিনি ছোটবেলা থেকে রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন এবং পাশাপাশি পড়াশোনা করেছিল। কিন্তু তিনি পড়াশোনা ভালো করে করতেন না বলে অনেকবার ফেলও করেছেন কিন্তু তিনি হার মানেননি, কখনো নকলও করেননি। তিনি বার বার পরীক্ষা দিয়ে গেছেন এবং সফলতা অর্জন করেছেন।

বিশ্বের যত বড় মানুষের ছিলেন, এরিস্টটল প্লেটো থেকে আমাদের দেশের বিজ্ঞানী সত্যেন বসু, জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, কুদরতই খুদা, জায়র ইকবালসহ কত শত গুণীজন রয়েছে তারা কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন? কিন্তু এইসব মণীষীদের জীবনকথা পাঠ্যপুস্তকে সেভাবে স্থাপন করা হয় না।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় মনে করা হয় জিপিএ-৫ পাওয়াই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। জিপিএ ৫ না পেলে একজন শিক্ষার্থীকে সমাজের চোখে ছোট করে দেখা হয়। এ রেজাল্ট পেতে তার মা-বাবা থেকে শুরু করে ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সবাই শিক্ষার্থীর উপর চাপ প্রয়োগ করে। আসলেই জিপিএ-৫ কি সবকিছু? এটা পেলে হয়তো একজন শিক্ষার্থী সাময়িকভাবে অনেক প্রশংসিত হন, কিন্তু আদৌ কি জিপিএ-৫ জীবনের উন্নতিতে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?

জীবনে উন্নতি করতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে অবশ্যই নিজ দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজের জীবনের লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই কিন্তু দক্ষতার পরিচয় দেওয়া না। তবে এটি শিক্ষাজীবনের একটা প্রাপ্তি এবং সাফল্যের একটি ছোট্ট ধাপ।
চারদিকে জিপিএ-৫-এর বন্যা দেখে আপাতদৃষ্টিতে হয়তো মনে হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আসলে দিনকে দিন আমরা পিছিয়েই পড়ছি। এখন শিক্ষার্থীরা যতটা না শিখতে চায়, তার থেকে বেশি চায় জিততে। এখানে দোষ যতটা না শিক্ষার্থীর, তার চেয়ে বেশি আমাদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার। জিপিএ-৫ পেতে হবে, কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতে হবে—এসব ‘হবে’র ভিড়ে ‘জানতে হবে এবং বুঝে পড়তে হবে’ কথাটা হারিয়ে যাচ্ছে! তবে এখনো পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে।

অভিভাবকরা কিংবা শিক্ষকরা শুধু জিপিএ-৫ বা প্রথমের পেছনে না ছুটে যদি তাদের সন্তানরা বা শিক্ষার্থীরা কী শিখল, কতটুকু শিখল, কী কী ঘাটতি আছে, কতটুকু শিখানো দরকার- এই বিষয়ে গুরুত্ব দেন তাহলে সেই সন্তান প্রকৃত দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হবে। তাই আসুন আমরা শিশুদের দিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া বা প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় না গিয়ে তাদের প্রকৃত মানুষ বানানোর ব্রতে মনোনিবেশ করি, তাতেই সমাজ তথা দেশের মঙ্গল হবে।

লেখক: দ্বাদশ শ্রেণী, সুসং সরকারি মহাবিদ্যালয়।

ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।