পাহাড়পুরে একদিন


Published: 2019-04-15 21:35:09 BdST, Updated: 2019-12-05 20:33:14 BdST

লাইভ প্রতিবেদক: একদিন হঠাৎ করে এসে ১৬তম ব্যাচের সিনিয়র ভাইরা বললো, সবাইমিলে ঘুরতে যাবে। আমরাও তাদের ডাকে সাড়া দিলাম।তারপর যেই প্লান সেই কাজ। সকল ব্যাচের ভাইদের নিয়ে শুরু হল মিটিং। সকলে মিলে নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুরের ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহার দেখতে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলো।

পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে ইইই বিভাগের বিভাগীয় চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর মোঃ ফারুক কিবরিয়া স্যারের সাথে কথা হলে স্যারও সম্মতি জানালেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর মোঃ মিজানুর রহমান স্যারের সাথে কথা হলে তিনিও রাজি হয়ে যান এবং স্যারের বাসা ঐতিহাসিক স্থান হতে ১.৫ কি.মি দূরে হওয়ায় সকল প্রকার সাহায্য করার কথা জানান।
কথা অনুযায়ী দিন তারিখ ঠিক করা হলো।

এরপর সকল ব্যাচের টাকা তোলা আরম্ভ করা হলো।টাকা তোলার কাজও শেষ। ক্যাম্পাসের বাস রিকুইজিশন নেওয়া হল। দেখতে দেখতে কাঙ্খিত ৪ তারিখ দিনটি ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। এদিকে সবার উৎসাহ উদ্দীপনাও বাড়তে থাকে। পুরো বনভোজন আয়োজনের দায়িত্ব ছিল ১৬তম ব্যাচের ভাই-আপুদের।

দেখতে দেখতে চার তারিখ চলে আসলো।যাওয়ার সময় ঠিক করা হয়েছে সকাল ৭টায়। সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আসছে। আমার যাওয়ার কথা সকাল ৭টায়। কিন্তু সকল ব্যাচের ভাই- আপুরা আসেন নি, স্যার কড়া ভাষায় জানিয়ে দিলেন ৭.৩০ মিনিটে বাস ছেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে আমার বন্ধু ফাহিমকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফোন দিলে ফাহিম বললো আমি যাব না। আমি বললাম গাড়ি ছাড়তে ১০ মিনিট সময় আছে তাড়াতাড়ি আয়।

ও বলল যাব না। তোরা যা। স্যার আসলেন, সকলকে নাস্তা দিতে বললেন। আমরা সহ ১৬তম ব্যাচের ভাইদের নিয়ে নাস্তা দিলাম। বাস ছাড়ছে সকলে একযোগে বলে উঠল বক্স কই?? একজন বলল শহর থেকে নিবে। ইতিমধ্যে ফাহিম দৌড় দিয়ে গাড়িতে। কিরে ফাহিম যাবি না বলে?? আগে ডাকবিনা?? বাস মিস হয়ে যেত। বাস চলছে গন্তব্যপানে।

১৫ ব্যাচের ভাই-আপুরা আমাদের বাসে। শুরু হলো সুরেলা বেসুরেলা কণ্ঠে গানের তালে হাত-পা ছুড়ে নাচ। কখন যে দেখতে দেখতে ১১২ কি.মি রাস্তা শেষ হয়েছে বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ স্যার বলে উঠলো ঐ যে পাহাড়পুর দেখা যায়। আমরাও দেখলাম সেই ঐতিহাসিক বিহার।

পথিমধ্যে ক্লান্ত শরীরে ঘুমন্ত রবি, সানা জেগে উঠছে। ওরাই দুজন যারা এতশব্দেও ৩০ মিনিট ঘুমিয়েছে। একটু পরে স্যার বলে উঠলেন ঐ যে প্রাইমারী স্কুল ওটা থেকে আমি পড়াশোনা করছি। বাস বৌদ্ধ বিহারের গেটে এসে থামল। পূর্বেই সকল কিছুর আয়োজন থাকায় সমস্যা ছাড়া সকলে ভিতরে প্রবেশ করলাম।

দেখেই চোখ উপরে উঠল, এতবড় বিহার? ইতিহাস জানার ইচ্ছে জাগল, ভিতরে ঢুকতেই ইতিহাস লেখা বোর্ড চোখে পড়ল। ইতিহাস হতে জানা যায় মহাবিহার পাল বংশীয় দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল ৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বৌদ্ধ বিহারটি হিমালয়ের দক্ষিণ অবস্থিত সবচেয়ে বড় বিহার যা পূর্বে সোমপুর মহাবিহার নামে পরিচিত ছিল।

১৯২৩-১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে বিহার খননকাজ চালানো হয় ফলে বিহারের উন্মুক্ত আঙ্গিনার চারপাশে ১৭৭টি ভিক্ষুক কক্ষ আবিস্কৃত হয়। বিহারের অন্তর্বর্তী স্থানের উন্মুক্ত চত্বরের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ধ্বংশাবশেষ যা ২১মি উঁচু হলেও মূল মন্দিরটি কমপক্ষে ৩০ মি উঁচু ছিল।

বিহারের মধ্যবর্তী উন্মুক্ত অঙ্গনে আরও কিছু ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। অঙ্গনের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ভোজনশালা ও রন্ধনশালা অবস্থিত। এ দুটি স্থাপনার মাঝে ৪৬মি দীর্ঘ ইট বাঁধানো একটি নর্দমা আছে এবং এর কাছে এক সারিতে তিনটি কূপ আছে। এছাড়াও রয়েছে কিছু নিবেদন স্তূপ, প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় মন্দিরের প্রতিকৃতি ইত্যাদি।

স্তূপ সংলগ্ন স্থানে রয়েছে একটি পাকা কূপ। অন্যান্য নিবেদন স্তূপগুলো বিক্ষিপ্তভাবে নির্মিত। চত্বরের উত্তর-পূর্বাংশের ইমারতগুলো সম্ভবত প্রশাসনিক এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হত।এছাড়াও গয়েশ্বরী মন্দির, স্নানঘাট চোখে পড়ে। দেখতে দেখতে দুপুর ১টা।

এবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠিত ষাটের দশকের জাদুঘরটি পরিদর্শন করি যা ১৯৯৪ সালে পুরাতন জাদুঘরের পরিবর্তে নতুন জাদুঘর ভবন তৈরি করা হয় । বিহার ও এর সংলগ্ন অঞ্চল হতে সংগৃহীত প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহীত করে এই জাদুঘরে রাখা হয় যা চার গ্যালারি বিশিষ্ট।

এ জাদুঘরে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিদর্শন হলোঃ একটি মাঝারি আকারের ব্রোঞ্চের তৈরি বৌদ্ধের আবক্ষ অংশ, পোড়ামাটির ফলক, অলংকৃত ইট, পাথরের মূর্তি, পোড়ামাটির তৈজসপত্র ইত্যাদি এছাড়াও লিপি, প্রস্তর ও বোঞ্জ ভাস্কর্য, ধাতব দ্রবাদি, মুদ্রা,বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে।

দুপুর ২টায় জাদুঘর পরিদর্শন শেষে নিদিষ্ট স্থানে ফিরে গরম পোলাও, রোস্ট, সবজি,ডাউল,কোমলপানীয় দিয়ে দুপুরের খাবার গ্রহন।খাবারসময় রবি বেশি খাওয়ার জন্য আপুদের পাশে বসে। খাওয়া শেষে একটু বিশ্রাম নিয়েই শুরু হয় খেলাধুলা। মোরগলড়াই, বাস্কেটবল, সু্ঁই সুতা,বালিশখেলা উল্লেখযোগ্য।

সুঁইসুতা খেলায় দৌড়ে আসতে গিয়ে ৭/৮ মাটিতে পড়ে যায়। খেলাশেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেখানে অংশগ্রহন করে সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ১৯ ব্যাচের পক্ষ থেকে ইইই থিম সং, সকল ব্যাচ নিয়ে মনোমুগ্ধকর সং, নেপালি ভাইদের নেপালি নাচ, বিদেশ, সেতু সহ অন্যদের নাচ, এছাড়াও দেবাশীষ দা অভি ভাইয়ের কৌতুক উল্লেখ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঝে লটারি করা হয়। শেষে পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান করা হয়। সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। বাসে উঠেই গানের তালে তালে সকল ভাই আপুদের সাথে নাচ। দেখতে দেখতে শহরে পৌঁছালাম। একে একে সবাই নেমে যেতে লাগল।ইচ্ছে হচ্ছে আর একবার যাই। সেদিনের অপেক্ষায়!!

ঢাকা, ১৫ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমআই

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।