'ইচ্ছা ও অদম্য শক্তিই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মূল প্রেরণা'


Published: 2020-07-19 13:11:42 BdST, Updated: 2020-08-14 20:37:55 BdST

এম. খায়রুল ইসলামঃ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর ওয়ার্ল্ডর‌্যাংকিং নিয়ে অনেক বির্তক আছে। পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজও পর্যন্ত একটা সম্মানজনক জায়গায় যেতে পারেনি। এর মধ্যেই দেশে অনেক নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্টা হচ্ছে। পাবলিকেশনস, রির্সাচ কোলাবেরশন, ফরেন ফ্যাকাল্টি মেম্বার, পিএইচডিধারী শিক্ষক, ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত ইত্যাদি বিষয়ের উপর এই র‌্যাংকিং নির্ভর করে। তো নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটা সম্মানজনক জায়গায় যেতে পাবলিকেশন ও রির্সাচ কোলাবেরশন ইত্যাদির বিকল্প নেই।

আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪০০ ছাত্র-ছাত্রীদের বিপরীতে আছে ৩৪-৩৫ জন শিক্ষক। এদের মধ্যে পিএইচডিধারী শিক্ষক হচ্ছেন ৮-১০ জনের মত। শ্রেণীকক্ষ ও ব্যবহারিক ক্লাশের সুবিধা মোটামুটি মানের। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে এর অবকাঠামো মাত্র তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে জিনোম সেন্টার হয়ত হবে যেখানে পুরো একটি প্রাণীর জিনোম সিকুয়েন্স করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে অনলাইন ক্লাশে এই বিশ্ববিদ্যালয লিডিং পর্যায়ে আছে।

গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকের নিউজ ফিডে ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষক ড. মাহমুদুল হাছানের একটি পাবলিকেশনের নিউজ ঘুরাফিরা করছিল। তনি প্রথম বর্ষে কমিউনিকেটিব ইংলিশ ও এমব্রায়োলজি অফ অকুযাটিক এনিম্যলস পড়াতেন। নিয়মিত ক্লাশে সাবলিল ভাষায় ইংরেজিতে লেকচার দিতেন।

প্রথম দিকে ইংরেজি বুঝতে একটু অসুবিধা হলেও, পরবর্তিতে মানিয়ে নিয়েছি আমরা। তখন থেকেই ওই শিক্ষকের প্রতি আলাদা একটি শ্রদ্ধা কাজ করত। তারপর মনে হলো যে স্যার সর্ম্পকে আরও একটু জানতে। গুগলে দিলাম সার্চ। পেয়ে গেলাম স্যারের ওয়েবসাইট http://www.mhasanbd.com। সেখানে স্যারের পাবলিকেশন থেকে শুরু করে অসংখ্য তথ্য দেয়া আছে। স্যারের মোট পাবলিকেশনের সংখ্যা ২৪ টি এবং গুগল স্কলার সাইটেশন রিপোর্ট ২১০ অধিক।

মেধা পাচারের মাধ্যমে যারা দেশের অর্জিত সম্পদকে ব্যবহার করে বিদেশে আত্মনিয়োগ করেছেন এমনি তার বিপরীত চিত্রে ব্যতিক্রমি একটি গল্পের নাম ড.মাহমুদুল হাছান যিনি তার নিরলস পরিশ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শুধু দেশের গবেষনাকে কাজে লাগাতে দেশের মানুষকে কিছু উপহার দিতেন, জাপান ছেড়ে প্রত্যাবর্তন করেন স্বদেশ পানে। তাই তো জামালপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে গবেষনা করে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেন গবেষনা পত্র।

বলছিলাম অক্লান্ত পরিশ্রমি স্বার্থক গবেষক যিনি মনোহরদী উপজেলার হাতিরদিয়া এলাকার চঙ্গ ভাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. মাহমুদুল হাছান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ থেকে ফিশারিজে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে মনোবুশো স্কলার্সশিপ নিয়ে পারি দেন জাপানে। জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট এবং পোস্ট ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে বছর খানেক শিক্ষকতাও করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে জামালপুর জেলায় অবস্থিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপনার পশাপাশি গবেষনা কাজে নিয়োজিত আছেন।

বাংলাদেশের ১০৭টি ব্যাংক নিয়ে মলিকুলার পদ্ধতিতে ডি এন এ বারকুডিং এনালাইসিস করে ৮টি ক্রিপ্টিক প্রজাতির ব্যাংক আবিস্কার সহ ৩টি নতুন বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেন। তার মধ্যে প্রথম ৩টি নামকরণ করেন (Hoplobatracius Litoralis) কারণ এটাকে উপক’লে খুজে পান দ্বিতীয়টি হচ্ছে শ্রদ্ধেয় স্যার, মৎস বিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়াত অধ্যাপক ড. মোখলেছুর রহমান খানের নামে (Microhyla Mukhlesuri) এবং তৃতীয়টি (Microhyla Mymensinghensis) কারণ এটাকে ময়মনসিংহ বাকৃবি ক্যাম্পাসে খোঁজে পান।

এ সকল কাজে কখনও কখনও তারঁ অন্য সহকর্মীরাও সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়াও বর্তমানে দুমোখু সাপ (Blind Snake) এর জিন গবেষনা এবং স্বাদু পানি মাছের জীববৈচিত্রের রহস্য সহ বেশ কয়েকটি গবেষনা জাপান সরকার এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চলমান আছে। উনি ইতি পূর্বে, ভিসি স্যারের নির্দেশ ও তত্তাবধানে হ্যান্ড সেনিটাইজার তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশের এলাকায় বিতরণ করেছেন।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্যার বলেন এখানে ইলেকট্রিসিটি সব সময় থাকে না। আবার ইন্টারনেট ফ্যসিলিটিও নেই। অনুপ্রেরণার খুব অভাব। তারপরও আমি যেহেতু গবেষণাকে ভালবাসি, তাই দিন-রাত এটা নিয়েই পড়ে থাকি। পেপারটি শুরু থেকে পাবলিশ হতে ৬ বছরও অধিক লেগেছে। এটার মূল কৃতিত্ব রাশিয়ার মি. নিক এবং তারঁ পিএইচডি ছাত্র মি. গুরিনের। আমি তাদেরকে এক্সপিরিমেন্ট ডিজাইন, ডাটা সরবরাহ, এনালাসিস ও পেপার রিভিউ করতে সহযোগিতা করেছি।

ইন্টারন্যশনাল কোলাবেরশনের ক্ষেত্রে স্যারের পরামর্শ: ১) নিয়মিত ধৈর্য্য ধরে ল্যবের কাজ চালিয়ে যেতে হবে, ২) ইন্টারন্যশনাল গবেষকরা কোন ডাটা/হেল্প চাইলে কৃপনতা করা যাবে না, ৩) ইমেইল আসলে যতদ্রুত সম্ভব উত্তর দিয়ে দিতে হবে, ৪) সিনসিয়ারিটির মাধ্যমে তাদের পেপার কিংবা প্রজেক্টের কাজে সর্ব্বোচ কন্ট্রিবিউশন রাখতে হবে ও ৫) সব সময় সৎ ও রির্সাচ ইথিক্স নিয়ে চলতে হবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, বশেফমুবিপ্রবিকে গবেষনা ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্ঠা করব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ড.মাহমুদুল হাছানের গবেষনা পত্র আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় একটি এচিভমেন্ট।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিরেক্টর প্রফেসর ড. মো: তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ হচ্ছে-জ্ঞানকে সৃজন করা, গবেষনার অবকাঠামো তৈরী করা, সমাজের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গবেষনা করা, জ্ঞান নির্ভর অর্থনীতি তৈরী করা। কিন্তু গবেষনায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা, কালচারাল ক্রাইসিস, গবেষকদের সামাজিক স্বীকৃতি না দেয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমান গবেষনা না করা ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংএ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।

ড.মাহমুদুল হাছানকে অভিনন্দন জানাচ্ছি কারণ তার গবেষনা পত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে, মানে বিশ্বজ্ঞান ভান্ডারে নতুন কিছু সংযোজিত হলো যা আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কর্ম বিভাগের চেয়ারম্যন ও অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ড.মাহবুবুর রহমান  বলেন- ফিসারিজ বিভাগের ড.মাহমুদুল হাছান স্যার এর কাজকে আমরা Appreciate করি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার এই গবেষনা বাড়তি একটি সংযোজন হিসেবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটি যখনই কোন মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে, তখনই গবেষকরা তার প্রতিষেধক বের করে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। আজও যখন করোনা ভাইরাস দ্বারা সারা পৃথিবী আক্রান্ত, তখনই গবেষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তার ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে। বাংলাদেশের মত একটি ছোট আয়তনের বিশাল জনগোষ্ঠির দেশের গবেষকরাই পারেন তাদেরঁ আবিষ্কৃত নতুন নতুন জ্ঞান দিয়ে এদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

আমাদের বৈশ্বিক পরিচিতির জন্য যেমন ভাল ক্রিকেটার, ভাল ফুটবলার, ভাল গায়ক কিংবা বিনোদনের জন্য চিত্র নায়িকা দরকার তেমনি দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে দরকার আমাদের দেশীয় বিজ্ঞানীদেরকে কাজে লাগিয়ে দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া। কারণ, দিন শেষে আমরা মেসি, নেইমার, বিসিএস ক্যডার এসপি, ডিসি কিংবা পরিমনি কিংবা আলিয়া ভাটের মত চিত্র নায়িকার চেয়েও বেশী দরকার ড. বিজন কুমার শীল বা গ্লোব ফার্মার ড. আসিফ মাহমুদের মত লোকদের।

তাই আসুন, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পড়ে থাকা বিজ্ঞানীদেরকে খুজেঁ বের করি এবং তাদেরঁকে সামাজিক ভাবে মূল্যায়ন করি।

আমাদের প্রচলিত প্রথার বাহিরে গিয়ে গবেষণা মনস্ক শিক্ষকদেরকে সামনের কাতারে নিয়ে আসা উচিত। কারণ,সাধারণদের ভীড়ে অসাধারণদেরকে খুজেঁ পাওয়া দুষ্কর। তাঁদেরকে যথাযথ সন্মান ও মূল্যায়ন করা উচিত। তাঁদের কাজে সহযোগিতা করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ হচ্ছে গবেষণা করা এরং নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা।

সেজন্য নবীন শিক্ষকরা স্যারের এই পরামর্শগুলো কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেওর্য়াল্ড র‌্যাংকিং এ জায়গা করে দিতে সক্ষম হবে বলে আমি মনে করি। জয় হোক দেশের সকল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের, জয় হোক হাছান স্যারের মত নির্লোভ ও নিরাংকারী মানুষদের।


বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জামালপুর

ঢাকা, ১৯ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।