নববর্ষে নব উদ্যমে জেগে উঠবে তারুণ্য


Published: 2021-04-14 12:48:08 BdST, Updated: 2021-05-09 02:13:25 BdST

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় উৎসবের দিন। বাংলা নববর্ষ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে শুভ নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। তবে করোনা মহামারীতে দিনটি যেভাবে উদযাপন হওয়ার কথা তা এ বছর সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও প্রত্যেক বাঙালি তার হৃদয়ে পহেলা বৈশাখকে অনুভব করবে। একটি বছরের বিদায়ে আরেকটি নতুন বছরের আগমন। দিনপঞ্জিকার পাতায় ১৪২৭ কে বিদায় জানিয়ে ১৪২৮ এর আগমন।

নতুনের আগমনে সবার মনে আছে নানা কল্পনা-পরিকল্পনা। পুরোনো বছরের দুঃখ আর জরাজীর্ণতা ভুলে নতুন বছরে নব উদ্যমে পথ চলতে চায় সবাই। যা কিছু অসত্য, অসুন্দর, অশুভ আর অমঙ্গলজনক সে সবকে ঝেড়ে ফেলে সত্য, সুন্দর, ভালো আর মঙ্গলের জন্য অপেক্ষমাণ সবাই। নতুন বছরে তরুণ প্রজন্মের রয়েছে নানা কল্পনা-পরিকল্পনা আর আশা-প্রত্যাশা, আছে নানা চিন্তা-ভাবনা। দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভাবনার বিকাশে বাংলা নববর্ষ কেমন তা তুলে ধরেছেন আমাদের ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম প্রতিনিধি 'আর এস মাহমুদ হাসান'।

"বাঙালির চেতনায় নববর্ষ ও বৈশাখ বন্দনা"
জান্নাতুল ফেরদৌস তন্বী, লোক প্রশাসন বিভাগ: আমাদের দেশের কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সব কাজে বাংলা সন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বাংলা সাহিত্যে ইতিহাসের অনেক উপকরন বিস্তৃত রয়েছে। তাই প্রথমেই সাহিত্যের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। আগে, অগ্রহায়ণ মাসে নববর্ষ শুরুর প্রচলন ছিলো। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কবিতার বর্ণনায় আমরা অগ্রহায়ণ খুঁজে পায়। তবে এ বন্দনা থেকে কি এমন ধারণা করা চলে যে ষোড়শ শতকের আগে এদেশে বাংলা সন চালু হয়নি? আবার অষ্টাদশ শতকের কবি ভারতচন্দ্রের বর্ণনায় আমরা অগ্রহায়ণ নয় বরং বৈশাখের বর্ণনা পাই। তবে এক্ষেত্রে, এই বৈশাখ বন্দনা থেকে আমরা একটা ধারণা পায়, যে তখন বাংলা সন চালু হয়ে গেছে। তবে বাংলা সন যেভাবেই চালু হোক না কেন বেশিরভাগ পন্ডিত সম্রাট আকবরকেই বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন।

আমাদের বাঙালীর সমাজজীবনে নববর্ষের গুরুত্ব অন্যরকম। নববর্ষকে ঘিরে এই যে বিশাল বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞ, তাতে এদেশের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করে। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে কোনো ধর্মীয় বিভাজন চলে না। মূলত বর্ষবরনও আমাদের বাঙালীদের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। আর এই নববর্ষে রয়েছে শতভাগ বাঙালিয়ানার ছাপ। নগরজুড়ে এই বাংলা বর্ষবরণকে ঘিরে চলে উৎসবমুখোর পরিবেশ। তবে এর শিকড় কিন্তু গ্রামে। গ্রামে নববর্ষের প্রথম এবং প্রধান আকর্ষণই হচ্ছে বৈশাখি মেলা। ধারণা করা হয় যে, এদেশে বৈশাখি মেলার বয়স ১৫০-৬০০ বছর পুরনো। বৈশাখ উপলক্ষে মেলা বসে ৩০০-৩৫০ টি।

জান্নাতুল ফেরদৌস তন্বী

 

আবার গ্রামের পহেলা বৈশাখ মানেই হালখাতা। তবে বর্তমানে নানা করণে সেই পুরনো মেলা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। অধিকাংশ শহরে বেশ পরিকল্পিতভাবে বৈশাখি মেলা আয়োজন করা হলেও বেশিরভাগই গ্রামকেন্দ্রিক। এই নগর সভ্যতা আমাদের দৌড়কে গতিময় করে তুললেও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেনি। আবার ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে দিয়ে পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। নগরে বর্ষবরণ অনেকটা এভাবেই আমাদের শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাষ্ট্রীয় আদর্শের সাথে নববর্ষের উদযাপন অনেক গুরুত্বপূর্ণ যা আমাদের চিন্তা চেতনা আর ভাবনার বিকাশে এক বিরাট প্রভাব ফেলে। এভাবেই বাংলা বর্ষবরণ আরও বিকশিত, অর্থপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী হোক এই আশা করি।

"নববর্ষে হোক নতুন অঙ্গীকার"
মিশন দাস, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ: হাজার বছরের কৃষি সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক সমাজের জীবনযাত্রা, ক্ষুদ্র থেকে বড় ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক ব্যাবস্থাকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয় আমাদের বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ শুধু একটি উৎসব হিসেবে পরিচিত থাকলেও এর সঙ্গে মিশে আছে বাঙালি জাতির সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে 'ছায়ানটের' বর্ষবরণ উৎসবের মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক পহেলা বৈশাখ রূপ নেয় নাগরিক পহেলা বৈশাখে।

মিশন দাস

 

নব্বইয়ের দশকে স্বৈর-শাসক ও সাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে নববর্ষের নতুন রূপ 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিকৃৎ হয়ে ওঠে। নববর্ষ আমাদের লোকজ সংস্কৃতির উৎসব, অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসব, সাহিত্যের উৎসব, বাঙালি জাতির আত্মানুসন্ধানের উৎসব। কোন জাতি তার নিজস্ব শিল্প,সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ছাড়া সভ্য হতে পারে না। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে, এই নববর্ষে বাঙালির সকল সংকট দূর হোক, গড়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িকতা, ভরে উঠুক সম্প্রীতি, সমাজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, উৎসবগুলো জন্ম নিক আনন্দ রূপে।

''নববর্ষ: নতুন এক সূর্যোদয়''
সুমনা ইসলাম, ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ: পহেলা বৈশাখ, অপেক্ষা একটি রাত্রিশেষের। আকাঙ্খা নতুন এক সূর্যোদয়ের। পহেলা বৈশাখ বাঙালির ব্যাক্তি জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়, জাতির অস্তিত্বের উৎসব। বাঙালির আবেগের বিরাট এক অংশ জুড়ে রয়েছে এই পহেলা বৈশাখ। প্রকৃতি যখন তার প্রখরতা আর তীব্রতার লড়াইয়ে ব্যাস্ত থাকে, তখন বৈশাখ প্রকৃতিকে সজীবতা আর প্রশান্তি দান করে, প্রকৃতি ফিরে পায় তার আপন সত্তা।

সুমনা ইসলাম

 

টিকে থাকার লড়াইয়ে বৈশাখ আসে এক নতুন রুপে। সেই রুপ দৃশ্যমান হয় গাছের শেকড় থেকে পাতায় পাতায়। গাছের সবুজ পাতা যেনো শিখিয়ে দেয় চৈত্রের গ্লানি মুছে নিজেকে নতুন করে সাজানোর কৌশল। বৈশাখের আগমন থেকে শিক্ষা নিয়ে বাঙালির সত্তা ও সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করে রাখাই হবে পহেলা বৈশাখের স্বার্থকতা। জীবনে চলার পথে প্রতিটি প্রতিকূলতাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হোক পহেলা বৈশাখের শিক্ষা৷ পহেলা বৈশাখ থেকেই শুরু হোক বৈশ্বিক মহামারির সাথে আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

"প্রার্থনায় কাটুক এবারের নববর্ষ"
জয়নাল আবেদীন জিহান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ: প্রতিবছর নববর্ষ আসলে জাতির মঙ্গল কামনায় থাকে ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি মিশ্রিত নানা আয়োজন। নববর্ষ শব্দটা উচ্চারণ করলেই মানসপটে সবার আগে ভেসে উঠে হাজারো সংস্কৃতিমনা বাঙালির অংশগ্রহণে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'র ছবি। কোভিড-১৯ আসার আগ পর্যন্ত হিসেব করলে দেখা যায়, আগের চেয়ে নববর্ষ উদযাপন ধীরে ধীরে ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে।

জয়নাল আবেদীন জিহান

 

বাঙালির ভাবনায় নববর্ষ গেঁথে গিয়েছে ওতপ্রোতভাবে। কিন্ত বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রকোপে পাল্টে গেছে চিত্র। মানুষ এক অনির্দিষ্ট ভয়ঙ্কর সময় পার করছে। তারপরও প্রত্যেক বাঙালি তার হৃদয়ে পহেলা বৈশাখের মাধুর্য অনুভব করবে নিশ্চয়ই। আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন না থাকুক তবে নববর্ষের যে মূল প্রতিপাদ্য জাতির মঙ্গল কামনা, সেটা ঘরে বসেই হোক নিরব প্রার্থনায়।

"নতুন বছরে সঞ্চিত হোক নতুন প্রাণশক্তি"
রেহেনুমা সেহেলী কবির, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ: যে সকল উৎসব বাঙালির ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ মানেই হচ্ছে বাঙালির চিরায়ত উৎসব ও মেলবন্ধনের দিন। কিন্তু মহামারী করোনার করাল গ্রাসে থমকে আছে সবকিছু। সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ও তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই কালের অতলে হারিয়ে গেলো আরেকটি বছর। কাল পরিক্রমায় এলো নতুন বছর।

রেহেনুমা সেহেলী কবির

 

করোনা মহামারিতে যে গভীর আঁধার গ্রাস করেছে এই পৃথিবীকে সে আঁধার ভেদ করে হোক নতুন সূর্যোদয়।নতুন ভোরের প্রথম আলোয় উদ্ভাসিত হোক নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনা। সুস্থ হয়ে উঠুক এই ধরণী। অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, স্বৈরাচারিতা, অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠুক তরুণ প্রজন্ম।পুরনো বছরের সকল ব্যর্থতা, নৈরাশ্য ও জরা-জীর্ণতা ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই সুস্থ ও সুখময় জীবন প্রাপ্তির প্রত্যাশায়।

"কৃষিনির্ভর বাঙ্গালির জীবনে নববর্ষ আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে"
মোঃ ফাজল রাব্বি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ: গ্রীষ্মের প্রচন্ড খরতাপে প্রকৃতি যখন হাহাকার করে, ঠিক তখনই ফসল ফলানোর জন্য বৃষ্টির খুব প্রয়োজন। আর সেই বৃষ্টির আহবানের সঙ্গে আসে নববর্ষ। কৃষিনির্ভর বাঙ্গালির জীবনে নববর্ষ আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে, মুছে দেয় পূর্বের বছরের সব ব্যর্থতা, গ্লানি অনুপ্রেরণা জোগায় নতুন করে বাঁচার। নববর্ষ বাংলার প্রতিটি মানুষকে স্বপ্ন দেখায় নব উদ্যমে কাজ করার এবং আশা জোগায় নতুন জীবনের সফলতার।

মোঃ ফাজল রাব্বি

 

বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি বাংলা নববর্ষ। এ দিন বৈশাখী মেলা, হালখাতা, পুণ্যাহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়, যেগুলো নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাঙালির সর্বজনীন অনুষ্ঠান। বাঙ্গালির চিন্তা-চেতনা ও ভাবনার বিকাশে নববর্ষের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাংলা নববর্ষ উৎসব আরো বিকশিত হোক, হয়ে উঠুক অর্থপূর্ণ ও তাৎপর্যময়।

ঢাকা, ১৪ এপ্রিল (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।