রাবির সেই ভিসির নিয়োগে ৪ সাংবাদিক নেতা ও সাংবাদিকের বোন


Published: 2021-05-08 13:56:54 BdST, Updated: 2021-06-20 21:12:37 BdST

উমর ফারুক,রাবি থেকে: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভিসির নানান কর্মকাণ্ডের নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে প্রতিদিন। ছাত্রলীগ, শিক্ষক তার পর সাংবাদিকদের দৌরাত্ন ছিলো ভিসির দপ্তরে। তিনি অনেককেই দেখভাল করতেন। তার নানামুখি বিতর্কিত কর্মকান্ড ডাকতে তিনি এসব করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। তিনি ৪ সাংবাদিক নেতাকে চাকরি দিয়েছিলেন। একই সাথে কয়জন সাংবাদিকের বোনকে চাকরি দিয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকদের নিয়োগের বিষয়ে জানতে নিয়োগপ্রাপ্ত দুজনের সাথে যোগাযোগের জন্য ক্ষুদে বার্তা দেয়া হলে তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্য আরেক জনের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

এদিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক তদন্ত প্রতিবেদনে ভিসি আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল ধরনের নিয়োগ পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছিলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে বিদায়ের আগ মুহূর্তে নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরপর পরই ক্যাম্পাসের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে নানা অভিযোগ আর বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন তিনি।

ভিসি বহনকারী গাড়ি বাসভবনের সীমানা অতিক্রম না করতেই দলে দলে বাসভবনে প্রবেশ করতে থাকেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। সেখানে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বেলাল হোসাইন জানান, বাসভবনের ভেতরে আগে থেকেই ভিসির স্বাক্ষরকৃত নিয়োগ তালিকা তৈরি করা ছিল। ইস্যু করা ছিল নিয়োগ আদেশের চিঠি। নিয়োগ তালিকা ধরে ইস্যুকৃত চিঠিগুলো বিলি করছিলেন তারিকুল নামের একজন। চিঠিগুলো নিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফা, টি-টেবিল এবং মেঝে যে যেখানে পেরেছেন চিঠিতে স্বাক্ষর করতে শুরু করেন। এরপর জমা দিচ্ছিলেন মামুন অর রশীদ নামের একজনের কাছে।

তবুও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নানা বির্তকের মাঝে ১৩৭ জনকে অ্যাডহকে নিয়োগ দিয়েছেন বিদায়ী ভিসি প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান। বুধবার (৫ মে) স্বাক্ষরিত নিয়োগ তালিকা থেকে বিষয়টি জানা গেছে। নিয়োগ সংক্রান্ত তালিকায় থেকে জানা গেছে, শিক্ষক পদে ৯ জন, কর্মকর্তা পদে ১৯ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদে ৮৫ জন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে ২৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে চারজন সাংবাদিক নেতাও এক সাংবাদিকের ছোট বোনেরও নিয়োগ হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিয়োগ পাওয়া সাংবাদিক নেতারা:
শেষ সময়ের এই নিয়োগে অধ্যাপক আবদুস সোবহান বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন সাংবাদিকের নিয়োগপত্রেও সই করেছেন। তাদের মধ্যে দুজন সাংবাদিক নেতা। রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) নির্বাহী সদস্য আনিসুজ্জামানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের সহকারী রেজিস্ট্রার পদে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি, রাজশাহী মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) প্রাক্তন নির্বাহী সদস্য। বর্তমানে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে রাজশাহীতে কর্মরত।

বৃহস্পতিবার ভিসির সইয়ে নিয়োগ পেয়ে কাজে যোগ দিয়েছেন মেহেদী হাসান শ্যামল নামের আরেক সাংবাদিক নেতা। তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সেকশন অফিসার হিসেবে। তিনি রাজশাহী টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আরটিজেএ) সভাপতি। কাজ করেন মোহনা টেলিভিশনে।

সেকশন অফিসার হিসেবে আরও নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিক এনায়েত করিম ও আমজাদ হোসেন শিমুল। এনায়েত করিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (রাবিসাস) সাবেক সভাপতি। বর্তমানে তিনি উত্তরা প্রতিদিন নামের একটি স্থানীয় দৈনিকে কাজ করেন। আমজাদ হোসেন শিমুল রাবিসাস-এর সাবেক সহসভাপতি। বর্তমানে তিনি রাজশাহীতে দৈনিক আমাদের সময়ে কাজ করেন।

নিয়োগ পেয়েছেন সাংবাদিকের বোন:
১৩৭ জনের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সোনিয়া তাসনিম। তিনি ডিবিসি টিভি ও দৈনিক সমকাল পত্রিকার রাজশাহী প্রতিনিধি সৌরভ হাবিবের ছোট বোন। তার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়ায়।

এদিন সকালে নিয়োগের জন্য ইস্যুকৃত চিঠিতে স্বাক্ষরের জন্য রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালামকে উপাচার্য বাসভবনে ডাকা হয়। তার জন্য গাড়ি পাঠানোর প্রস্তাব করেন স্বয়ং উপাচার্য। তখন অবৈধ নিয়োগের বিষয়টি টের পেয়ে অজানা স্থানে চলে যান বলে জানান অধ্যাপক সালাম এবং চিঠিগুলোতে স্বাক্ষরে অস্বীকৃতি জানান।

এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবৈধ এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব কিছু প্রস্তুত করা হয়েছে আগেই। অবৈধ নিয়োগ কার্যক্রম ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত হতে চাইনি, তাই (উপাচার্য) ডাকলেও সেখানে উপস্থিত হইনি। নিজ বাসা থেকে বের হয়ে অজ্ঞাত জায়গায় চলে যাই।

এদিকে, বিদায়ী ভিসি প্রফেসর এম আব্দুস সোবহানের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষে বিভিন্ন হল-দপ্তরে ১৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবৈধ নিয়োগের বৈধতার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতদসংক্রান্ত বিষয়ে নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়ম হয়েছে কি না,তা তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গত বৃহস্পতিবার (৬ মে) সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের স্বাক্ষরিত এক তথ্যবিবরণীতে এ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর মুহাম্মদ আলমগীরের নেতৃত্বে তদন্ত করা হবে। তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন ইউজিসি সদস্য প্রফেসর আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মো. জাকির হোসেন আখন্দ এবং ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান। কমিটিকে আগামী সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ঢাকা, ৮ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)// এআইটি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।