সেশনজটের যাতাকলে নষ্ট হচ্ছে হাবিপ্রবি’র হাজারও শিক্ষার্থীর স্বপ্ন


Published: 2021-05-23 13:18:52 BdST, Updated: 2021-07-27 20:13:30 BdST

মোঃ আবু সাহেব, হাবিপ্রবি: বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ভয়াবহ মহামারীর থাবার নাম হলো করোনা ভাইরাস। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে জনজীবনসহ সকল পর্যায়ের কর্মব্যস্ততা। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে দূর্বিষহে জীবন যাপন করছে সকল স্তরের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ১ বছর ২ মাস পেরোলেও এখনো স্বাভাবিকভাবে চলছে না ক্লাস-পরীক্ষা প্রেজেন্টেশন-ভাইভা। অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন ছেড়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছুটে চলছে জীবিকা উপার্জনে। এরই ব্যতিক্রম নয় হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন।

একদিকে যেমন সেশনজট নামক অভিশাপের হতাশা, অন্যদিকে হাজারো শিক্ষার্থী চিন্তায় রয়েছে উচ্চশিক্ষা পরবর্তী ভবিষ্যৎ জীবনের চাকরি নামক সেই সোনার হরিণের। এমন হতশায় প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এই পরিস্থিতিতে সেশনজট বিভিন্ন সমস্যায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে নেমে এসেছে যেমন হতাশা আর দুশ্চিন্তা তেমনি সামাজিকভাবেও নেমে এসেছে চরম দুর্দশা।

সেশনজটের কারনে বর্তমান শিক্ষা জীবন, সামাজিক এবং ভবিষ্যত জীবনে এর প্রভাব কেমন হতে পারে জানতে চাওয়া হলে হতাশা আর দুশ্চিন্তায় নিয়ে হৃদয়ের কষ্টের আহাজারি জানিয়েছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা।

কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শেষবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল কবির ক্যাম্পাসলাইভকে জানান‚ “করোনা মহামারির কারনে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। প্রায় ১ বছর ২ মাস হলো দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যেতে পারছেনা, তাদের পরীক্ষাগুলোও নেওয়া হচ্ছে না। যার কারনে তাদের বড় সেশনজটের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। তাদের জীবনের মুল্যবান সময়গুলো নষ্ট হচ্ছে। তাদের চাকুরীর বয়সও কমে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দিকে তাদের গোটা পরিবার তাকিয়ে থাকে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এখন মনে হচ্ছে সেই শিক্ষার্থীই নিজের পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। যার কারনে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে সেই শিক্ষার্থী হতাশায় জীবন যাপন করে। এই হতাশা থেকে বাচতে এমনকি বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পরে। যা সমাজ ও দেশের জন্য ক্ষতিকর।

রাসেল কবির

 

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পরীক্ষা থেমে থাকলেও থেমে নেই চাকুরির বিজ্ঞপ্তি। বিসিএস সহ অনেক ভালো ভালো সরকারি চাকুরির বিজ্ঞপ্তি এখন দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অনেক চাকুরির পরীক্ষাও নেওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবেদন না করতে পেরে। এই দীর্ঘ সময় গ্যাপ থাকার কারনে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনা থেকেও অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে।তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন আপনারা দ্রুত অফলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে এই সমস্যার সমাধান করুন। কারণ যেখানে সবকিছু ঠিকভাবে চলছে সেখানে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে কেনো?”

শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে নেমে এসেছে হতাশার এক কালো ছায় যা সেশনজট নামক অভিশাপ আরো তা ঘনীভূত করছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মনিরা আক্তার তানিয়া। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন, “মাঝে মাঝে মনে হয় এই মহামারীতে বেঁচে আছি, এটাই তো অনেক। কিন্তু ২ দিন পরেই জীবন থমকে যায় আর মনে হয়, বেঁচে থাকাটাই কি জীবন! বরং কি ভাবে বেঁচে আছি, সেটাই ভাবার বিষয়! ডিজিটালাইজেশনের এই যুগেও পদার্পন করে শুধুমাত্র ঘর থেকে বের হতে পারব না বলেই কি রণে ভঙ্গ দিয়ে ঘরে দোড় আটকিয়ে বসে থাকতে হবে! ২০২০ সালের মার্চের ১৭ তারিখে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে ছাত্র জীবন স্থবির হয়ে পড়ে, স্কুল -কলেজ লেভেলে আস্যাইনমেন্ট, অনলাইনে ক্লাস টেস্ট, অটো-পাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ সরকার নিলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সরকার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহ সকলের উদাসীনতা ও গড়িমসি লক্ষণীয়।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আটকে আছি অনলাইন ক্লাসের মধ্যেই। এর ফলে যারা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়েন, তাদের থাকছে না ল্যাবের সাথে কোন ধরনের সরাসরি সম্পর্ক! আবার সেই অনলাইন ক্লাসও শুরু হয় নভেম্বর মাসে(নতুন সেমিস্টারের)। তবে নানা প্রতিকূলতার জন্যই অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়া টাও বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীই সমথর্ন করেছে না। যায় মধ্যে অন্যতম হল আমাদের দেশের নেটওয়ার্ক এর স্পীড! এই স্পীড নিয়ে পরীক্ষা দিতে বসে আমরা যে আমাদের প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে পরিক্ষা দিব নাকি কেবলেই ভাগ্য আর আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে পরীক্ষা দিব তা নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না। এছাড়াও অনেক শিক্ষার্থীই আছে যাদের বাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে নেটওয়ার্কের অবস্থা সর্বদাই খারাপ হওয়ার কারনে তারা প্রতিনিয়ত অনলাইন ক্লাসেই অংশগ্রহণ করতে পারে না, তাদের জন্য অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়াও রীতিমত আতংকের বিষয়। এমতাবস্থায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন এক হতাশার নাম ছাড়া কিছুই না। পড়াশোনা মাঝপথে এসে বন্ধ হয়ে গেলেও মানুষ কর্মজীবনে প্রবেশ করে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি প্লাটফর্মে এসে শিক্ষার্থীরা না পাড়ছে পড়াশোনা ছাড়তে আর না পাড়ছে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে!

মনিরা আক্তার তানিয়া

 

এই মহামারীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষার্থী মারা যান নি তবে হতাশা গ্রস্থ হয়ে আত্নহত্যা করেছেন ২ জন! সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে এই পরিস্থিতি কতখানি হতাশার জন্ম দিয়েছে। পরিবার এবং সমাজেও এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে।শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এমতাবস্থায় একদমই অনিশ্চিত। সবকিছু থেমে থাকলেও বয়স এবং পারিবারিক চাহিদা তো থেমে নেই! শিক্ষা জীবন শেষ করে কাঙ্ক্ষিত কর্ম লাভ এই স্বল্প সময়ে হবে কিনা, এ প্রশ্ন মনে এলে তা জন্ম দেয় নতুন আরেক হতাশার। যদি এমন হত আমরা অনলাইনেই ক্লাস গুলো চালিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট সেশন অনুসারে পর্যায়ক্রমে ক্যাম্পাসে গিয়ে মেসে থেকে গতানুগতিক ভাবে পরীক্ষা গুলো দিয়ে আসতাম, আর তারপর আবার নতুন সেমিস্টারের ক্লাস অনলাইনে চালিয়ে নেওয়া যেত, তাহলে হয়ত সকলেই স্বস্তি পাওয়া যেত।তবে এমন টা কি আদৌ বাস্তবিক রূপ লাভ করবে! ভবিষ্যতে সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এমন শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্তের প্রতাশায় আছে আমাদের মত অসংখ্য শিক্ষার্থী”।

কৃষি অনুষদের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকা আখিঁ ক্যাম্পাসলাইভকে বলেন‚ “মহামারী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১৪ মাস যাবত বন্ধ আছে। এ অবস্থায় আমাদের অনলাইন ক্লাস চালু রাখলেও নেটওয়ার্কজনিত সমস্যার কারণে অনেকের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনলাইনে ক্লাসে যুক্ত হতে পারি না। আমাদের পরীক্ষা দেওয়ার কোন সুযোগ না থাকার কারণে বড় ধরনের সেশন জটের সম্মুখীন হয়ে পড়েছি । দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে আমরা যারা শিক্ষার্থী আছি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছি, অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের কথা ভেবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী তাদের পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য যোগ দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ সব কাজকর্মে, পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা সচল রাখতে। এছাড়াও শিক্ষার্থীরা অনেকদিন পড়াশোনা সাথে সম্পৃক্ত না থাকার কারণে বলতে গেলে পড়াশোনা বাদ দিয়েই দিয়েছে যা পরবর্তীতে তাদের শিক্ষাজীবনে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করবে।

আয়েশা সিদ্দিকা আখিঁ

 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নবৃত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান । এ সকল পরিবার সন্তানের উপর একটু বেশি আশা নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু সেশন জটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে মধ্য শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে না পারার কারণে বাড়তি মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে এসকল শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে।

একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবন নির্ভর করে তার বর্তমান পড়াশোনা ও কাজকর্মের উপর। তারা ভবিষ্যৎ জীবনে কি করবে, কি হবে তা তাদের বর্তমান শিক্ষাজীবনই বলে দিবে। কিন্তু বর্তমান সেশন জট শিক্ষার্থীদের যে বাড়তি চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে তা হয়তো অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের লক্ষ্য পূরনে অনেক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে বলে মনে করি। এসব বাড়তি চিন্তার কারণে আমরা সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় মধ্যে সময় পার করছি”।

কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেন ক্যাম্পাসলাইভকে জানান‚ “বছরখানেক আগেও আমাদের এই পৃথিবী ছিল ব্যস্ত ও প্রাণচঞ্চল। প্রতিদিনের সকাল শুরু হতো ব্যস্ততা দিয়ে। এমন জীবনে অভ্যস্ত আমরা তখন পর্যন্ত ভাবতেও পারিনি। কোভিড-১৯ এর আক্রমণে শতা ব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ এ দুর্যোগে পুরো পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষ গৃহবন্দী জীবনযাপন করছে। সাময়িকভাবে বন্ধ হয় গেছে প্রায় সকল ধরনের খাতসমূহ। করোনাভাইরাসের প্রভাবে পুরো দুনিয়া জুড়ে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে তা থেকে রেহাই পায়নি শিক্ষাব্যবস্থাও।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘটে গেছে ভয়াবহ সেশনজট। যা জাতীয় জীবনে সবেচেয়ে বড় বিপর্যয় বলেই মনে করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এতবড় বিপর্যয় আর কখনো আসেনি। এতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মানসিক, সামাজিক এবং ভবিষৎ জীবনের অপূরনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমরা আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে সত্যিই উদ্বিগ্ন। আমরা যখন স্নাতকোত্তর শেষ করব তখন অনেক চাকরির বয়সসীমা শেষ হয়ে যেতে পারে। আমাদের বাবা-মাও আমাদের ভবিষ্যতের বিষয়েও সমানভাবে উদ্বিগ্ন। আমাদের আসলে স্বপ্নগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। এ থেকে বের হতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগটা এখনও গৌণ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

আলমগীর হোসেন

 

অবশ্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের মোটেই সমান্তরাল মনে করা ঠিক হবে না বরং সহায়ক মনে করাই যুক্তিযুক্ত। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস পরিক্ষা চালু করাই এ জাতীয় সমস্যার সমাধান করা উচিত। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি বছরে ২ সেমিস্টারের জায়গায় ৩ সেমিস্টার চালু করে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে সহায়ক হিসেবে অনলাইনে অতিরিক্ত ক্লাস গ্রহণ করা হয় তাহলে এ অবস্থা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ হবে বলে মনে করি”।

ভবিষ্যতে সেশনজট শিক্ষার্থীদের কাছে মহামারির মতো আকার ধারন করতে পারে বলে ধারণা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড এন্ড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সুলতানা। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান‚ “বর্তমানে আমরা সবাই একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে পার করছি। করোনা নামক এই ভয়ংকর মহামারী আমাদের জাতীয় জীবন কে করেছে বিপর্যস্ত। আর এই মহামারীর কারণে আমাদের সবথেকে যে দিকটা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন সেটা হলো শিক্ষাব্যবস্থা। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসে আছি। প্রায় সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চললেও চলছে না কোন স্কুল,কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সেশনজট। এই সেশনজট মহামারীতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে আরো দীর্ঘতর হচ্ছে।

সুমাইয়া সুলতানা

 

যার ফলে শিক্ষার্থীরা এক বড়সড় সেশনজটের আশঙ্কায় দিন পার করছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর এখন পর্যন্ত কোন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা এখন পর্যন্ত আমাদের খুব একটা সহায়ক হয়ে উঠেনি। যার ফলে শিক্ষার্থীদের মন মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসে গেছে, এভাবে বাড়িতে বসে থেকে শিক্ষার্থীদের মনে যে একঘেয়েমি চলে এসেছে সেটা বলার অপেক্ষায় রাখেনা। মানসিকভাবে আমরা হয়ে পড়ছি দুর্বল। কবে হবে পরীক্ষা? কবে হবে পড়ালেখা শেষ? এসব ভেবেই এখন শিক্ষার্থীদের দিন পার হচ্ছে। এই বড় আকারের সেশনজট থেকে উত্তরণ না হতে পারলে ভবিষ্যতে আমাদের অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে”।

দীর্ঘ দিন সেশনজটে থাকার ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা প্রায় অনিশ্চিত বলে মনে করছেন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী তানিয়া আক্তার। তিনি ক্যাম্পাসলাইভকে জানান‚ “বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষার আগে রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে পড়াশুনা করতাম একটা স্বপ্নের জোড়েই। আর তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব, ভালো একটা চাকরি করব, একটা ভালো জীবন পাবো। অনেকের কাঁধে আবার পরিবারের হাল ধরার দায়িত্ব। কিন্তু এই স্বপ্নকে চরমভাবে গলা চেপে ধরছে সেশনজট নামক মারাত্মক ব্যাধি। যেখানে স্নাতক পাশের নির্দিষ্ট সময় দীর্ঘায়িত হলেও বাড়ছে না সরকারি ও সুনির্দিষ্ট বেসরকারি চাকরিতে যোগদানের সময়সীমা।

এর ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত জীবনে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে। বেকারত্ব চোখ রাঙাচ্ছে প্রতিনিয়ত যা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় গুলোর মধ্যে একটা। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘসময় ধরে পড়াশুনার ব্যয় ভার বহন করা কষ্টসাধ্য। এই অনিশ্চয়তায় অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে পড়াশুনার সুযোগ না দিয়ে। দীর্ঘদিন একই বর্ষে থাকার মানসিক ও সামাজিক চাপসহ সার্বিক দিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীরা চরম হতাশায় পর্যবসিত হচ্ছে। সেই সাথে একাডেমিক কর্মতৎপরতা না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ চাঞ্চল্য কমে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে যা আশংকাজনক। এভাবে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা বিলীন হওয়ার মুখে। হারিয়ে হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন।

তানিয়া আক্তার

 

ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন দুর্বিষহ ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নির্দিষ্ট সময়ে সুসম্পন্ন না হওয়ায় তারা ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে করে মানব সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার সুনিশ্চিত হচ্ছে না। এভাবে দীর্ঘদিন যুবসমাজের অসক্রিয়তা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও অগ্রযাত্রার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াচ্ছে যার বিরুপ প্রতিক্রিয়া সুদুরপ্রসারি। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী হলে সেশনজটের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা খুব বেশি কষ্টসাধ্য হয়তো হতো না। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল একটা দেশের জন্য উদ্ভুত এই সমস্যাগুলো আদৌ কতটুকু মোকাবিলা করা সম্ভব তা সত্যিই ভাববার বিষয়”।

ঢাকা, ২৩ মে (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।