যেমন কাটলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ


Published: 2021-07-30 14:54:15 BdST, Updated: 2021-10-21 10:42:32 BdST

করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার মাঝেই কেটে গেলো সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জীবনে অন্যতম একটি ধর্মীয় উৎসব ‘ঈদ-উল আজহা’। করোনা পরিস্থিতিতে এবারও ব্যতিক্রমভাবেই উদযাপিত হয়েছে এই ঈদ। ঈদের আনন্দ কিছুটা উপভোগ করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে যার মতো করে চেষ্টা করেছে। এবারের অনেকের ঈদ উদযাপন আর ঈদের আনন্দ বরাবরের মতোই বড্ডো পানসে। আনন্দ উৎসবমূখরতার মাঝে কেমন যেন একটা ঘাটতি। প্রাণের অভাব। এটা হতে পারে পেশা, বয়স কিংবা অন্য কোন কারণে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের ঈদ উদযাপন, ঈদের আনন্দ-বেদনা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি তুলে ধরেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ।

আতংকে কেটেছে ত্যাগের ঈদ

মুঈন খান, শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ: করোনা পরিস্থিতির নাজেহাল অবস্থার মাঝেই কেটে গেলো আরেমটি ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে প্রচুর ঘোরাঘুরি আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা। কিন্তু এবারের ঈদ মানে ছিল ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। করোনার আতংকে দেশ যখন তটস্থ তখনই এল ঈদ। সেমাই এর গন্ধে ঘুম ভাঙ্গলেও নামাজটা পরা হয়নি সবার সাথে। আম্মু আগের মতোই রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বাকিদের ঈদটা কেটেছে অনলাইনে। সেদিক থেকে এবারের ঈদটাকে অনলাইন ঈদ বললেও কোথাও ভুল হবে না বোধ হয়। অন্যবারের মতো এবারের ঘোরাঘুরিটা কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে নয় বরং অনলাইনেই হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করে ঘরে শুয়ে শুয়ে কেটেছে ঈদ। ঈদের আনন্দ যেন বিষাদময় ছিল।

মুঈন খান

 

তবে সবার সাথে বসে জমিয়ে খাওয়াটা মিস করি নাই। বিশেষ করে এবারের ঈদে উৎসবের আনন্দের চেয়ে আতংক যেন আরো বেশি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তাই ঈদের আমেজেও যেন ভাটা পড়েছে। ঈদের নামাজ, কুরবানি, আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া- সব কিছুতেই শুধু ভাইরাসের সংক্রমণের দুশ্চিন্তা। তবে ভালো দিক হলো, সবার মাঝে সচেতনতা কিছুটা হলেও বেড়েছে। নামাযে, কুরবানির মাংস বিতরণে সবখানেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার একটা প্রবণতা দেখা গেছে মানুষের মধ্যে। সব মিলিয়ে ঈদটা ভিন্ন এক আঙ্গিকে কাটিয়েছি। বুঝেছি বন্দী হয়ে বাঁচার কষ্টটুকুও।

গ্রাম ছেড়ে শহরে কাটানো প্রথম ঈদ

ইকরা ফুরকান ড্যাফোডিল, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ: করোনায় যেমন সব কিছু থমকে গিয়েছে ঠিক সেরকমই ঈদের মজাটাও শৈশবের স্মৃতিতে আটকে গেছে। দিন দিন যত বড় হচ্ছি ঈদের আনন্দ ততোই কমে যাচ্ছে। আগের মত আর সালামি নিতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া হয় না, টিভি ছেড়ে নতুন জামা জুতা পরে ঈদের গান, নাটক দেখা হয় না, মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ানো ও আর হয় না। সব কিছু যেন একদম থমকে গিয়েছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে ঈদের সেই চিরচেনা আমেজ। প্রতি মুহূর্তে নতুন সংক্রমণ, নতুন মৃত্যুর খবরে সবাই যেন আতঙ্কিত। চারদিক যেনো করোনা আক্রান্ত ও বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের হাহাকারে ঘেরা।

ইকরা ফুরকান ড্যাফোডিল

 

এমন অসুস্থ পৃথিবীতে যে ঈদ পালন করতে হবে তা কখনো ভাবিনি। করোনা আতংকে সব মিলিয়ে এবারের ঈদ আমার কাছে বর্ণহীন ফ্যাকাসে মনে হয়েছে। ঈদের আমেজ যেন বজায় থাকে সেজন্য মা হরেক রকমের রান্না করেছে, পরিবারের কিছু সদস্যদের দাওয়াত দিয়েছে। করোনার কারণে অনেকেই আসতে পারেনি। যারা এসেছে তাদের সবাই একসাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম, ছবি তুললাম। তাও যেন আগের মত আর ঈদের আমেজ টা পেলাম না। কিন্তু কি আর করার না চাইলেও এর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নিতে বাধ্য হলাম।

করোনা ভয়াবহতায় মলিন ঈদ আনন্দ

আয়শা আক্তার নিঝুম, শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগ: আবারও বছর ঘুরে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব ঈদুল আজহা উদযাপিত হলো। ঈদ আনন্দ বলতে শৈশব-কৈশোরে ফেলা আসা সেই স্মৃতিমাখা সময়টাকেই বুঝি। সময়ের পরিক্রমায় প্রতি বছর ঈদ আসলেও ফিরে আসে না ফেলে আসা সুনালী শৈশবের ঈদ। তার উপর দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তান্ডব চালানো করোনা আরো মলিন করে দিয়েছে ঈদ আনন্দ। আশেপাশে স্বজন হারানোর আর্তচিৎকার, হাসপাতালে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া মানুষের করুণ আকুতি উপেক্ষা করে মোটামুটি খাপ ছাড়া ভাবে উদযাপিত হলো মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা।

আয়শা আক্তার নিঝুম

 

বিগত তৃতীয় বারের মতো এবারও অনেকটা গৃহবন্দী হয়ে পালন করলাম ঈদুল আজহা। আত্নীয় স্বজন ছাড়া আর করোনা আতংকেই কাটলো এবারের ঈদ। কেমন যেন ছন্দপতন বিশ্বজুড়ে তবুও এই মহাক্ষণে বিশ্বের কোটি প্রাণের একটাই চাওয়া ধরনী ফিরে পাক তার আপন রুপে। মহামারীহীন এক রঙিন পৃথিবীতে প্রাণের মেলবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে উদযাপিত হোক সকল ধর্মীয় উৎসব এমনটাই কাম্য।

অপূর্ণতায় কেটেছে আরো একটি ঈদ

হিরা সুলতানা, শিক্ষার্থী, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ: ঈদ মানেই অন্যরকম আনন্দ। ঈদ এক আলোকিত মুহূর্ত নিয়ে আসে আমাদের জন্য। আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে চারপাশ। তবে গতবার থেকে এই আনন্দ উৎসবে ভাটা জমেছে। এবারের কোরবানির ঈদটিও অনেকটাই চার দেয়ালের মাঝে কেটেছে। লকডাউন ও করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিবারের প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকায় একত্র হতে পারি নি। তাই এই ঈদে অতীতের স্মৃতিগুলো বার বার মণিকোঠায় উঁকি দিয়েছে।

হিরা সুলতানা

 

সেই গ্রামের বাড়ি আর দাদীর হাতের রান্নার কথা স্মরণ হলেই চোখ ভিজে উঠেছে। তবে এবারও কাছের ছোট্ট ভাই-বোনেদের হাতে মেহেদি পড়িয়েছি। এবং এই ঈদের অন্যতম আকর্ষণ কোরবানিতেও সামিল হয়েছি। যথাযথ শারীরিক দুরুত্ব বজায় রেখেই প্রতিবেশীদের মাঝে মাংস বিলিয়েছি, তাদের খোঁজখবর নিয়েছি। পাশাপাশি দিন শেষে এলাকার বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডাও দিয়েছি। আর ভার্চুয়ালি সবার সাথে ঈদ আনন্দে মেতে ওঠার চেষ্টা করেছি। তবে তা প্রত্যেকবারের মতো প্রাণবন্ত ও সুখকর ছিল না।

এবারও পরিবারের সঙ্গে কেটেছে ঈদ

নিশাত তাহসিন অপি, শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ: বিগত কয়েকটি ঈদের মতো এবারও করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এসেছে ঈদুল আজহা। দীর্ঘ বিরতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে বাড়ি ফিরে তাই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই কেটেছে এবারের ঈদ। সবাইকে নিয়ে একসাথে সেমাই খাওয়া, লুডু খেলা, বিকালে একটু সাজুগুজু করা সবার সাথে সেলফি তুলা, সবার সাথে ফোন আলাপ, সন্ধ্যায় হালকা নাস্তার আড্ডা, রাতে পরিবারের সাথে ঈদ আয়োজনের টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার মধ্য দিয়েই ঈদের দিনটি কেটে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যথারীতি সবার সাথে দিনভর ভিডিও কলে আলাপন, আড্ডা।

নিশাত তাহসিন অপি

 

এইতো এইভাবেই কেটে গেল ঈদের সময়টুকু। আমাদেরকে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পরিবারের সাথে আনন্দটা খুঁজে নিয়েছি। এলাকার মধ্যে সংক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি হলেও আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া হয়নি৷ তবে কুরবানী, মাংস কাটা, পরিমাপ, বিতরণ, এসবের মাঝে আনন্দ ছিল অপরিসীম। আপনজনের মাঝেই রয়েছে ঈদের প্রকৃত আনন্দ। দ্রুতই পৃথিবী আগের মত সুস্থ হয়ে উঠবে এবং আগের মত সবার কাছে ঈদ আনন্দ ফিরে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা রইলো।

শঙ্কাময় ঈদ কেটেছে উৎসবমুখর পরিবেশে

মোঃ শাহিন হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ: প্রতিটি মুসলিমের জন্য ঈদ অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন। কিন্তু করোনা মহামারির কারনে গত বছরের ন্যয় এ বছরও কমে গেছে ঈদের আমেজ। তবে ব্যাপক সংক্রমণ, চারদিকে মৃত্যু মিছিল, আতঙ্ক ও হতাশায় বিধ্বস্থ জনজীবনে ঈদের আগমণ যেন টুকরো প্রফুল্লতা বয়ে এনেছে। ফজরের সালাত শেষ করেই অপেক্ষায় ছিলাম মসজিদের মাইক গুলোতে কখন বেজে উঠবে 'ঈদ মোবারক' ধ্বনি। আনুষঙ্গিক কিছু কাজ শেষ করে বাবা আর আমি প্রস্তুত হয়ে নিলাম নামাজে যাওয়ার জন্য। ইতিমধ্যেই বন্ধুরা কয়েক জন চলে এসেছে একসাথে ঈদের নামাজ পরব তাই। সব থেকে ভালো লাগার বিষয় ছিলো একসাথে জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করা ও দোয়া করা। যেটা অনেকের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় নি।

মোঃ শাহিন হোসেন

 

স্বাস্থবিধি মেনে নামাজ সম্পন্ন হলো। অতঃপর বাসায় ফিরে খাওয়া দাওয়া শেষে গরু কাটাকাটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। স্বাস্থবিধি মেনেই মাংস বিতরণ সহ সকল কর্মকান্ড সম্পন্ন হলো। বিকেলে কয়েকজন বন্ধু মিলে কিছু সময় আড্ডা ও ঘুরাফেরা হলো। যারা দূরে ছিলো তাদের সাথে ভিডিও কলে খোঁজ খবর ও মতবিনিময় করা হলো। রাতে ফোন করে আত্নীয় স্বজনদের ঈদ উদযাপন সম্পর্কে জানলাম। অতপর পরিবারের সকলে মিলে গল্প গুজব, খাওয়া-দাওয়া এবং কোরবানি ও ইসলামের সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা হলো। সর্বপরি মোটামুটি আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ কাটালেও বিগত বছর গুলোর মতো আনন্দ মোটেও ছিলো না। দ্রুত সুস্থ হোক পৃথিবী, পুনরায় ঈদ হয়ে উঠুক সর্বজনীন আনন্দের এটাই প্রত্যাশা।

ঢাকা, ৩০ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।