বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা


Published: 2021-06-05 16:44:53 BdST, Updated: 2021-06-22 17:40:56 BdST

 

মোঃ শাকিলুর জামান শাকিল: পরিবেশ দূষণ রোধ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এর উদ্যোগে ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন পালন করা হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। চলতি বছর পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য “Ecosystem Restoration বা বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার”। বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ২০২১-২০৩০ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ দশক হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাস্তুতন্ত্র হলো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের উদ্ভিদ-প্রাণী, জীব-জড়, জৈব-অজৈববস্তু সমস্ত কিছুর পারস্পারিক মিথোস্ক্রিয়ায় তৈরি একটি শৃঙ্খল, যা বিনষ্ট হলে পরিবেশের ভারসাম্য থাকেনা এবং ধীরে ধীরে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে।

সুতরাং পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ নিজেদের স্বার্থে নির্বিচারে ধ্বংস করছে বাস্তুতন্ত্রকে। ক্ষতিগ্রস্থ কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘ এই প্রতিপাদ্য বেছে নিয়েছে। বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য বৃক্ষরোপণ, শহরের সবুজায়ন, বাগান তৈরি, ডায়েট পরিবর্তন, নদী ও উপকূল পরিষ্কার করা প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে এই প্রজন্ম প্রকৃতির সাথে শান্তি স্থাপন করতে পারে।

আমাদের চারপাশের উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি, বায়ু, জড়বস্তু, জৈব-অজৈব পদার্থ সমস্ত কিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। আমাদের জানামতে এখন পর্যন্ত একমাত্র পৃথিবীতেই মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু মানুষের নির্বিচার কর্মকাণ্ডের জন্য ক্রমশই পৃথিবীর পরিবেশ দূষিত হয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কল-কারখানা ও যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার, বনাঞ্চল নিধন, জৈব বর্জ্যের পচন প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ১০০ বছরে তাপমাত্রা যদি আরো ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায় তাহলে পৃথিবীতে বড় ধরণের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। এছাড়া বাতাসে ধোঁয়া, ধুলোবালি, ড্রপলেট, বিষাক্ত সীসা, বস্তুকণা বা পার্টিকুলেট মেটার ও বিষাক্ত গ্যাসের পরিমান বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে, যার ফলে শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ, ক্যান্সারসহ নানাবিধ ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বায়ু দূষণের কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ জন এবং গোটা বিশ্বে এই সংখ্যা ৬৭ লাখ।

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক সংস্থা আইকিউএয়ার এর তালিকা মতে ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ বাংলাদেশ , দ্বিতীয় পাকিস্তান এবং তৃতীয় ভারত। ল্যানসেটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয় পরিবেশগত দূষণে। বর্তমানে কিছু গবেষণা বলছে, বায়ু দূষণের ফলে কোভিড-১৯ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এবং কোভিড আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে পারস্পারিক সম্ভাব্য সংযোগের কথা প্রকাশ করা হয়েছে।

শিল্পকারখানার বর্জ্য, মিউনিসিপাল বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত কীটনাশক প্রভৃতি নদী, খাল-বিলের পানিকে দূষিত করে তুলছে। দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়গুলি। এর ফলে পৃথিবীর জলজ পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে; ধ্বংস হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীরা আক্রান্ত হচ্ছে নানা জটিল ও কঠিন রোগে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট অনেক তীব্র হয়েছে। এছাড়া মাটি দূষণ, শব্দ দূষণ, তেজস্ক্রিয়তা প্রভৃতি ক্রমাগত পৃথিবীর পরিবেশকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ইতোমধ্যে মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ মর্মান্তিক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছে। ভূপাল দুর্ঘটনা, চেরনোবিল দুর্ঘটনাসহ নানা রাসায়নিক দুর্ঘটনায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশ থেকে চীনের লংমার্চ ফাইভবি রকেটের ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীতে পড়া নিয়ে সারা বিশ্বে গভীর উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। বিবিসি’র এক খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে ২০০ স্যটেলাইট আবর্জনায় পরিণত হয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে, যা যেকোন সময় টাইমবোমার মত বিস্ফোরিত হতে পারে বা অন্য কোন স্যাটেলাইটের উপর আছড়ে পড়ে ভয়ংকর কিছু ঘটাতে পারে। সুতরাং রকেট বা স্যাটেলাইটের ন্যায় এইসব মহাকাশ বর্জ্য পৃথিবীতে ভয়ংকর কোন বিপর্যয় ডেকে আনার আগেই এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

জীবাশ্ম জ্বালানীর বিকল্প ব্যবহার, কার্বন নির্গমন হ্রাস, পানি দূষণ রোধ, বিশুদ্ধ পানীয় জলের পর্যাপ্ত সরবরাহ, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকের বিকল্প ব্যবহার, পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার, পারমাণবিক অস্ত্র ও জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা বর্তমানে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ একার পক্ষে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গিকারই হোক বিশ্ব পরিবেশ দিবসের চেতনা।

লেখকঃ গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

ঢাকা, ৫ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//বিএসসি

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।