কোরবানি সমাচার: দেশের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার অন্যতম অঙ্গীকার


Published: 2021-07-18 21:22:38 BdST, Updated: 2021-07-25 00:27:06 BdST

তোফায়েল আহমেদ: পবিত্র ইদ-উল-আজহাকে ঘিরে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার হাতবদল ঘটে। গবাদিপশু কেনাবেচা, চামড়া বিক্রি, পশুখাদ্যের বিক্রি বৃদ্ধি, গবাদিপশু নিয়ে হাটে যাতায়াত, ছুরি-দা-বটি'র বাজার, মশলার পসরা সাজিয়ে বসা দোকানদার, রেফ্রিজারেটর ব্যবসা থেকে শুরু করে চাটাই-বাঁশ বিক্রির সুবাদেও সকলের হাতে হাতে টাকার আদান প্রদান ঘটে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, আর অধিকাংশ গবাদিপশু বিক্রেতা প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র খামারিরা; যার ফলে তাদের হাতেও অর্থের যোগান হয়। ফলে গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতির চাকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এর সহযোগিতা ও দিক নির্দেশনায় দেশের ভেটেরিনারি ডাক্তারদের পরামর্শ আর নিরলস পরিশ্রমের দরুন অপার সম্ভাবণার দুয়ার খুলেছে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত। আগত কোরবানি ইদ উপলক্ষে দেশেই প্রস্তুত হচ্ছে কোরবানি উপযোগী প্রায় এক কোটি উনিশ লাখ গবাদিপশু, দেশের বাইরে থেকে আমদানি করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। দেশের জিডিপির আমূল পরিবর্তন ঘটে কোরবানির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে। চলুন কোরবানি সম্পর্কিত সকল তথ্য বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

কোরবানির তাৎপর্যঃ-
কোরবানি দেওয়া কাদের জন্য ওয়াজিব?
সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন প্রাপ্তবয়স্ক কোনক মুসলিম যদি ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তবে তাঁদের পক্ষ থেকে একটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। নিসাব হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা ও ব্যবসার পণ্য বা সম্পদ। জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ ইদের নামাজ শেষের সময় হতে পরবর্তী তিন দিন (১৩ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) পর্যন্ত কোরবানি করা ওয়াজিব।

কোন কোন পশু কোরবানি করা যাবে?
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা- এই ছয় ধরনের গৃহপালিত পশু কোরবানি দেওয়া জায়েজ। এর বাইরে কোনো বন্যপ্রাণী কোরবানি দেওয়া জায়েজ নয়। কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে উটের বয়স হতে হবে কমপক্ষে ৫ বছর, গরু ও মহিষের ২ বছর এবং ছাগল-ভেড়া-দুম্বার বয়স হতে হবে ১ বছর। তবে ৬ মাস বয়সের ভেড়া ও দুম্বার শারীরিক গঠন যদি ১ বছর বয়সীদের মতো হয়, তাহলে তা দিয়েও কোরবানি দেওয়া যাবে। ছাগলে, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে একটি পশু একজন'ই কোরবানি দিতে পারবে। গরু, মহিষ আর উট সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি মিলে কোরবানি দিতে পারবে৷

কোরবানি মাংস বন্টনঃ-
কোরবানির মাংস সমান তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ গরীব-দুঃখীদের মাঝে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনের মাঝে এবং বাকি এক ভাগ নিজেদের জন্য রাখা বাধ্যতামূলক নয়, এমনটাই জানিয়েছেন আলেমরা। চাইলে পুরো মাংস নিজের জন্য রাখলেও ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু, সকলের মাঝে উৎসব মুখর পরিবেশে মাংস বণ্টন করা ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ করে, মেলবন্ধন দৃঢ় ও প্রতিজ্ঞ হয়, সবার মাঝে ইদের আনন্দ ছড়িয়ে পরে। গরীব-দুঃখী ও নিকট আত্মীয়ের মাঝে বণ্টন করা রাসূল (স.) এর সুন্নত। কোরবানি পশুর চামড়ার ওপর দরিদ্র-অসহায় মানুষের হক রয়েছে।

অবশ্যই খেয়াল রাখুনঃ-
কোরবানির পশু হতে হবে দোষত্রুটি মুক্ত, রোগ-বালাই মুক্ত, সুস্থ-সবল ও হৃষ্টপুষ্ট গড়নের। দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি না থাকলে, এতটাই খোড়া যে কোরবানির স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম, অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ ও দুর্বল, শিং গোড়া থেকে উপড়ে যাওয়া, লেজের অধিকাংশ অংশ কাটা বা ঘোরতর আঘাতপ্রাপ্ত, জন্মগত কানের অনুপস্থিতি বা অধিকাংশ অংশ কাটা, গর্ভবতী গাভী, অধিক বয়সের পশু যার অধিকাংশ দাঁত পরে গেছে, অতি অল্প বয়সের বাচ্চা পশু, উন্মাদ - পাগল পশু যা ঠিকঠাক খাদ্য ও পানি গ্রহণ করতে অক্ষমতা প্রকাশ করছে, আঘাতপ্রাপ্ত, মৃত্যুপথ-যাত্রী গবাদিপশু যতক্ষণ অব্দি শঙ্কামুক্ত না হয় এমন পশু কোরবানি করা নাজায়েজ।

সুস্থ-সবল, হৃষ্টপুষ্ট পশু চেনার উপায়ঃ-
কোরবানির ক্ষেত্রে আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজ পছন্দের সবচেয়ে সুন্দর, আকর্ষণীয় ও সুস্থ পশু কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করবেন। নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে পারেন-

১. সবসময় লেজ নাড়িয়ে মশা-মাছি তাড়াতে ব্যস্ত থাকবে। স্টেরয়েড প্রয়োগকৃত অতিরিক্ত ওজনের গবাদিপশু ক্লান্ত দেখাবে, ঝিমাবে ; স্বাভাবিক হাটা চলা করতে অপারগ হবে।
২. নাকের নিচের কালো অংশ (মাজল) ভেজা থাকবে, মনে হবে যেনো শিশিরবিন্দু জমে আছে। বিপরীতে অসুস্থ গবাদিপশুর মাজল হবে একদম খটখটে শুকনো।
৩. চামড়া হবে ঢিলেঢালা, মাংসে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ক্ষনিকের মধ্যেই আবার আগের জায়গায় ফেরত আসবে।
৪. স্বাভাবিক ভাবে খাদ্য ও পানি গ্রহণ করবে। চটপটে স্বভাবের হবে।
৫. শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। অসুস্থ, স্টেরয়েড প্রয়োগকৃত ও দীর্ঘ যাত্রাপথ অতিক্রম করে আসা ক্লান্ত গবাদিপশুর শ্বাসপ্রশ্বাসে অস্বাভাবিকতা লক্ষনীয়ভাবে ফুটে উঠবে। এমনকি মুখ দিয়ে অনবরত লালা নিঃসরণ হতে পারে।
৬. পিঠের কুজ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছে কিনা তাও লক্ষ্য করতে হবে, কুজ হবে টানটান-মোটাসোটা ও আঘাত মুক্ত - দাগ মুক্ত।
৭. শরীরের কোথাও এমন ক্ষত আছে কিনা যা মাংস নষ্ট করে দেয় বা পশুর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে এমন পশু কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. লেজ, শিং, দাত এবং খুর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৯. পশুর বয়স জানা জরুরি, নির্দিষ্ট বয়সের চেয়ে কম হলে কোরবানি কবুল হবে না।
১০. সুস্থ পশুর পাজরের হাড়গুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হবে।
১১. পায়ের মাংস শক্ত ও পেশিবহুল হবে, নরম থলথলে হলে বুঝতে হবে পশু কে খাদ্যের সাথে রাসায়নিক দ্রব্য খাওয়ানো হয়েছিলো।
১২. দেশীয় গবাদিপশু কেনার চেষ্টা করুন।

পরিশেষে বলতে চাই...
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানুষের মাঝে ভালোবাসা আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সকলের প্রতি সহনশীলতা প্রকাশ করা উচিৎ। করোনাকালীন এই দুঃসময়ে সামর্থ্যবানের সুখ আর আনন্দ যেনো ছড়িয়ে পরে প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে। তবেই কোরবানির মাহাত্ম্য, সৌন্দর্য অম্লান হবে- আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যাবে৷ প্রত্যক্ষ কোরবানির সাথে সাথে পরোক্ষভাবে মনের সকল অহংকার, দাম্ভিকতাও কোরবানি করে দিন। পরিশুদ্ধ মনে প্রশান্তির মাত্রা হয় সর্বোচ্চ। সবাইকে অগ্রীম ইদ উল আজহা'র শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।

লেখকঃ তোফায়েল আহমেদ
প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

ঢাকা, ১৮ জুলাই (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমএইচ//এমজেড

ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম-এ (campuslive24.com) প্রচারিত/প্রকাশিত যে কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত অপরাধ।