43189

বাবার সাথে দিনলিপি

বাবার সাথে দিনলিপি

2021-06-20 12:40:58

অসীম কুমার পাল: অন্ধকারে ঘেরা খোলা প্রশস্ত মাঠে প্রায় সতের বছর বয়সী তরুণ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে সাইকেল চালানো শিখছিলো। সদ্য কৈশোর পেরুনো ছেলেটির সারা শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। “আজ রাতের মধ্যেই আমাকে সাইকেল চালানো শিখতে হবে, যতই সময় লাগুক না কেন” ছেলেটি বিড়বিড় করে বলছিলো। তার সাথে তার কাকা ছিলো সেই “প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ” দক্ষতা অর্জনের জন্য।

যদিও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছিলো, দেখে মনে হচ্ছিল, সাইকেল চালানো শেখার মোহ অনাগত পরীক্ষায় মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজনীয়তাকে হারিয়ে দিয়েছে। এত দেরিতে সাইকেল শেখার কারন হলো ছেলেটির বাবার ভয় কেননা বাবা ছেলেটির নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় উৎকণ্ঠিত থাকতো। যাই হোক, অবশেষে ছেলেটি দুই দিনের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সাইকেল চালানো শিখতে পারলো!

সেই ছেলেটি আর কেউ নয়, এই আমি যে তার বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সাইকেল চালানো শিখেছিল কেননা এটা আমার জন্য ‘প্রেস্টিজ’-এর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সাইকেল চালানো না জানার দরুণ আমার বন্ধুরা ও সহপাঠীরা সবসময় আমাকে বিরক্ত করতো। এই ‘না পারার’ ব্যাপারটা আসলে আমাকে দমিয়ে দিতো।

আবার যখন আমি সেই ‘না পারার’ ব্যাপারটাকে জয় করে সাইকেল চালানো শিখে ফেললাম, আমার মনটা যেন পরম আনন্দে নেচে উঠলো। কিন্তু আমার সেই অর্জিত দক্ষতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়লো যখন আমি আমাদের বাড়ির সামনের ব্যস্ত মহাসড়কে সাইকেল চালানোর সময় ‘এক্সিডেন্ট’ করে ফেললাম! যদিও এক্সিডেন্টটা যতটা সিরিয়াস হবার কথা ততটা ভয়ংকর ছিল না, তারপরেও আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম।

এর কারণ হলো, আমার বাবা কখনোই আমার সাইকেল চালানো ব্যাপারটা পছন্দ করে নি। যাই হোক, যখন বিকেলবেলা বাবা বাড়িতে ফিরলেন, নরম স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই নাকি এক্সিডেন্ট করেছিস? খুব বেশি আঘাত লাগে নি তো?” আমি ভয়ে ভয়ে আস্তে করে বললাম, “নাহ, অতটা সিরিয়াস কিছু না।” আমি ভাবছিলাম কি যে বকা শুনবো কিন্তু তিনি যখন চুপচাপ চলে গেলেন, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম!

এই হলেন আমার বাবা যিনি কখনো আমাকে আমার ভুলের জন্য বকা দেন নি! এমনকি, তার কোন সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দেন নি। আমি একাডেমিক জীবনে যা পড়তে চেয়েছি, তিনি বাঁধা না দিয়ে বরং উৎসাহ দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে আমি যখন ডাক্তার, প্রকৌশল হবার চিন্তা বাদ দিয়ে ইংরেজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ভয় পাচ্ছিলাম বাবা বুঝি আমার সিদ্ধান্তে রেগে যাবেন, তিরস্কার করবেন। কিন্তু অবাক করার বিষয়, আমার স্বপ্নের পথে তিনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে উৎসাহিত করেছেন।

আবার আমার স্নাতক শেষ করে যখন আরো উচ্চ শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের জন্য ঢাকার পথে পা বাড়ালাম, আমার বাবা-ই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তাতে ছিলেন আমার নিরাপদে ও সুস্থ থাকা বিষয়ে। এমনকি, যখনই আমি ঢাকা থেকে ফিরতাম, সবার প্রথমে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “ঢাকার বাতাস কি আমার সহ্য হচ্ছে?” যদিও আমি ইতিবাচক জবাব দিতাম, তারপরেও আমার উত্তরটা তাকে খুব কমই চিন্তামুক্ত করতে পারত।

এটা তো খুবই সাধারণ বিষয় যে যদি কেউ বাড়ি থেকে দূরে থাকে, এলাকার বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে থাকে, তাহলে যখন বাড়িতে ফিরে আসে, একটু বেশি সময় তাদের সাথে কাটাতে চাইবে, তাই না? এজন্য আমি যখন ঢাকা থেকে বাড়িতে আসতাম, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাড়িতে ফিরতে দেরি হয়ে যেতো। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা আটটা বাজলেই আমার বাবা বারবার আমার মাকে জিজ্ঞেস করতেন আমি ফিরেছি কিনা। কখনো কখনো আবার তিনি আমাকে ফোনে কল দেন এবং আস্তে করে বলতেন, “কই আছিস?” আর এটা বলেই রেখে দিতেন।

মজার বিষয় হলো, আমার মা আমার বিষয়ে তার অনুভূতি যতটা প্রকাশ করে থাকেন, আমার বাবা ঠিক তার উল্টো। তিনি যে আমাকে প্রচন্ড ভালবাসেন, সেটা প্রকাশ করতে একেবারেই চান না। যখন চাকরির জন্য বাইরে থাকতাম, মোবাইল ফোনে আমাদের সর্বোচ্চ এক থেকে দুই মিনিটের কথোপকথন হতো। আর আমার সামনে তো কখনোই আমার কোন অর্জন কিংবা সাফল্য নিয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করেন না। কিন্তু তার বন্ধু ও পরিচিতজনদের কাছে আমার কোন ‘ভাল’ খবরের ব্যাপারে কথা বলতে দ্বিধা করেন না যদিও আমি বারবার মানা করি এসব না বলার জন্য।

প্রথম চাকরি পাবার আগে আমি স্বপ্ন দেখতাম যে প্রথম মাসের বেতনের টাকা দিয়ে আমার পরিবারের সবার জন্য কিছু না কিছু কিনে উপহার দিব এবং মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমার সেই স্বপ্ন খুব সুন্দরভাবে পূরণ হয়েছিলো। যখন আমি বাবাকে তার জন্য আনা উপহার দিলাম, তিনি চুপচাপ সেটি নিলেন এবং কোন মন্তব্য করলেন না। ব্যাপারটা আমাকে আহত করলো কেননা আমি তার অপার আনন্দ দেখতে চেয়েছিলাম। পরের দিন যখন আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলছিলাম, তিনি জানালেন যে আমার বাবা আমার কিনে আনা পোশাক পড়ে বাড়ির কাছের দোকানে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি তার বন্ধু ও পরিচিতজনদের সাথে সময় কাটান। সেখানে তিনি গর্বের সাথে বলেছিলেন, “এই পোশাকটি আমার ছেলে তার প্রথম চাকরির প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কিনে এনেছে!” কথাটা শুনে আমার চোখ বেয়ে জল নামলো।

আমার শৈশবের দিনগুলিতে যখন আমার বাবা দুপুরের খাবারের পর ঘুমাতে যেতেন, আমি তার কাছে রূপকথার গল্প শোনার জন্য যেতাম। তিনি কখনোই আমার আবদারকে অপূর্ণ রাখেন নি। তাছাড়া, এখনো দূর্গাপুজার সেই দিনগুলোর কথা আমার মনে পড়ে যখন আমি বাবার সাথে পুজা দেখতে যেতাম। কিন্তু সেই সোনালি দিনগুলি সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। কেবল স্মৃতির পাতাগুলি আমার জন্য পড়ে আছে।

আমার নিজের সাথে আমার বাবার অন্যতম প্রধান সাদৃশ্য হলো আমার বাবার মত আমিও তার প্রতি আমার আবেগকে প্রকাশ করতে পারি না। আমরা দুজনেই একে অপরের প্রতি যে অগাধ ভালবাসা ও অনুভূতি আছে তা বিনিময় করতে ব্যর্থ হই। যদিও যখনই কোন সাফল্যের রশ্মি আমার জীবনে উঁকি দেয়, আমি তাকে নির্দ্বিধায় জানাই, কিন্তু প্রতি বছর বাবা দিবসে আমার ব্যর্থতাগুলো জানান দেয় যে আমি কখনোই বলতে পারি না যা আমার হৃদয় সবসময় বলতে চায়ঃ “আমি তোমাকে ভালবাসি, বাবা”। আমার এই ব্যর্থতার জন্য আমাকে ক্ষমা করো, বাবা।

লেখক: অসীম কুমার পাল
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, পাবনা।

ঢাকা, ২০ জুন (ক্যাম্পাসলাইভ২৪.কম)//এমজেড

প্রধান সম্পাদক: আজহার মাহমুদ
যোগাযোগ: হাসেম ম্যানসন, লেভেল-১; ৪৮, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, তেজগাঁ, ঢাকা-১২১৫
মোবাইল: ০১৬৮২-৫৬১০২৮; ০১৬১১-০২৯৯৩৩
ইমেইল:[email protected]